রাজনীতি নিয়ে আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য। এবং আজ যে সেটা
কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভালো
কি খারাপ তা
ঠিক জানতাম না। কেউ
বলতো ছাত্রদের আবার রাজনীতি কি? তারা
এখন পড়াশোনায় মন দিক| আবার
কেউ বলতো সর্ব
দেশে সর্বকালে ছাত্রছাত্রীরাই রাজনীতিকে
এগিয়ে নিয়ে গেছে| সূর্যসেন
কি মাস্টারমশাই ছিলেন না? ছাত্রাবস্থায়
নেতাজি কি রাজনীতি করেননি? এসব
যুক্তিরও উত্তর ছিল| “আরে
বাবা সে সমস্ত দিন কি আর আছে? আজকালকার
রাজনীতি অতি নোংরা ”
ইত্যাদি...
কিন্তু যে যাই বলুক, স্কুলে খুব ছোট বয়েসেই আমরা রাজনীতির ধাক্কাটা
বেশ ভালো মতোই খেয়েছিলাম। আর তাই নিয়ে আমরা নিজেদের মতো করে কিছু চিন্তা ভাবনা
করতাম| অবশ্য
আমার ধারণা এই ধাক্কাটা শুধু আমাদের প্রজ্ঞানানন্দ স্কুলের ছাত্ররাই নয়, বাকি সব স্কুলের
ছাত্রছাত্রীরাই অল্প বিস্তর খেয়েছে। ধাক্কাগুলো এসেছিল নানান দিক থেকে। একটু বিস্তারিত বলার চেষ্টা করি||
মাস্টারমশাইদের মধ্যে কারো কারো খুব তীব্র রাজনৈতিক
মতাদর্শ ছিল| একজন
মাস্টার মশাই প্রকাশ্যেই বলতেন “গান্ধীজী জাতির জনক হতে পারেন কিন্তু জাতির
মধ্যে আমার যেটুকু অংশ সেটুকু নিয়ে বলছি উনি আমার জনক নন|” এটা শুনেই আমার মনে হয়েছিল গান্ধীজী আজ
পুত্রহারা হলেন - অন্তত একটা পুত্র মাইনাস হল| আজ গান্ধীজী “জাতি মাইনাস ওয়ানের” জনক| আরেকজন
মাস্টারমশাই রাজনীতির
কথা উঠলেই আমাদের
বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে নেতাজির ধারে কাছে আর কেউ কোনদিন ছিলেন না – তারপরই এসে
যেত নেতাজির দ্বিতীয়বার কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হবার কাহিনী, সেই পট্টভি
সিতারমাইয়া| প্রায়
মুখস্ত হয়ে গেছিল আমার| ওনার
কথাবার্তায় এমন একটা আত্মবিশ্বাস ছিল যে মনে হতো উনি সম্ভবত নেতাজি কে খুব কাছ থেকে দেখেছেন| বলতে বলতে ওনার
চোখে জল আসত না বটে কিন্তু নাকে জল এসে যেত – কারণটা ওনার নস্যি নেবার অভ্যাস| তবু শুনতে ভাল
লাগতো, কারণ
নেতাজি ছিলেন আমাদেরও হিরো| আরেকজন
মাস্টারমশাইয়ের প্রিয় বিষয় ছিল দেশভাগ| দেশভাগের জন্য কে বা কারা দায়ী, কি করে দেশভাগ
বন্ধ করা যেত এ
সমস্ত ব্যাপারে তিনি
ক্লাসের বেশ খানিকটা সময় আমাদের মনের জানলাগুলো খুলে দেবার চেষ্টা করতেন| সেখানেও খানিকটা
গান্ধী বিরোধী মানসিকতার মধ্যে আমরা থাকতাম| এসবের মধ্যে আবার এক উল্টো বিপত্তি হল ক্লাস
সেভেন এ উঠে| আমাদের
সিলেবাসে রয়েছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের “মহাত্মাজীর প্রতি”| সেটা পড়তে গেলে একটু গান্ধীবাদী
হয়ে পড়তে হয়। সে ভারি সমস্যা । এদিকে যাই না ওদিকে যাই?
প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস আর প্রজাতন্ত্র দিবসে স্কুলে পতাকা উত্তোলন
হতো। সেই
অনুষ্ঠানে কোন
কোন ছাত্রকেও বক্তৃতা দিতে হতো। তারা না হয়
কোনরকম ব্যাপারটা ম্যানেজ করে নিত – প্রথমে ইতিহাস বই এর দু
চারটে লাইন শোনাত, তারপর স্বাধীনতা
আন্দোলনের শহীদদের প্রতি প্রকৃত
সম্মান জানাতে হলে আমাদের
কি কি করা উচিত সেগুলো
তারা বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দিত তাদের বক্তৃতায়| শেষে নজরুল বা রবীন্দ্রনাথের কবিতার দু-চার কলি তাক
বুঝে বলতে পারলে তো প্রচুর হাততালি|
কিন্তু গন্ডগোল পাকাতেন আমাদের স্কুলের
গভর্নিং বডির কোন কোন সদস্য| একবার
একজন বললেন যে স্বাধীনতার
পর X বছর
হয়ে গেল কিন্তু
দেশের কোন উন্নতি হয়নি।পরের বছর তিনি বললেন যে স্বাধীনতার পর X +1 বছর হয়ে গেল কিন্তু দেশের
কোন উন্নতি হয়নি। তার পরের বছর X +2.
আমি ভাবতাম বছরের পর বছর দেশটা কেমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে| হয়তো আরো চলত, কিন্তু তিনি
বোধহয় আর স্কুল কমিটি তে ছিলেন না, তাই X +3 অবধি
ব্যাপারটা গড়ায় নি| প্রতি
বছরই তিনি ইঙ্গিতে জানতেন যে আমাদের এত কষ্টের জন্য আমাদের সরকার দায়ী| কিন্তু সত্যি
বলতে কি আমাদের কষ্টগুলো ছিল নেহাত-ই অরাজনৈতিক| পরীক্ষার শক্ত প্রশ্ন, পুজোর ছুটির
পরেই পরীক্ষা হওয়া, গাদা
গুচ্ছের হোম ওয়ার্ক, স্কুলের
মাঠে জল জমে থাকা, মাস্টারমশাইদের
বেতের বাড়ি ইত্যাদি| দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব নিয়ে কেউ
কোনদিন বক্তৃতা দিত না|
আর এক জনের বক্তৃতা আমার কানে আজও লেগে আছে| মাঝে মধ্যেই
হুংকার দিয়ে তিনি বলছিলেন “আজ
সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর|” আমি
লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এখন যদি ঘুরে দাঁড়াই তাহলে অমুক
মাস্টারমশায়ের বেতের বাড়ি পড়বে পেছনে সুতরাং সময় এলেও আমাদের বিশেষ কিছু করার নেই।
পরের বছর আবার সেই হুংকার “আজ সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর|”
এক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনার সময় জিজ্ঞেস করলাম “আচ্ছা, ঘুরে দাঁড়ানোর
সময় তো গত বছর এসেছিল। আবার
এবছর ঘুরে দাঁড়ালে আমরা ফের সামনে ফিরে যাব না?” সে বলল “ধুর, গত বছর ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সময় আর এবছর ছিল
রুখে দাঁড়ানোর সময় – তুই মন দিয়ে শুনিস নি – বোঁদের থালার দিকে তাকিয়ে ছিলি|” বলে রাখা ভাল যে ঐ সমস্ত
অনুষ্ঠানের পর স্কুল থেকে একদম বিনা পয়সায় একমুঠো করে বোঁদে খেতে দেওয়া হত আমাদের
– মাকালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের টাটকা বোঁদে| কিছু ছেলে তো সেই বোঁদের টানেই পতাকা উত্তোলন
দেখতে যেত|
তখন পশ্চিমবাংলার রাজনীতি গরম, আজ বাংলা বনধ তো
কাল ভারত বনধ এসব লেগেই থাকতো| আমাদের
জন্য তার একটাই অর্থ ছিল - ছুটি| আমরা দুপুরবেলা
ক্রিকেট বা ফুটবল খেলে সেই বনধগুলির প্রতি আমাদের সমর্থন জানাতাম। তাছাড়া মাঝে
মধ্যে হত ছাত্র ধর্মঘট| স্কুলে
যাবার আগে থেকেই পাড়ার
বন্ধুবান্ধবরা আমাদের সাবধানবাণী শোনাত “ওরে, আজ স্কুলে কেন যাচ্ছিস? স্কুল ছুটি হয়ে
যাবে। আজ যে ছাত্র ধর্মঘট!” মা শুনত না| বলতো “স্কুলে তো চলে যা, ছুটি হয়ে গেলে
না হয় চলে আসবি|” তাই অতি
অনিচ্ছায় বই
খাতা নিয়ে স্কুলের দিকে রওনা হতাম| প্রথম
পিরিয়ডেই মাস্টারমশাইকে
কে জিজ্ঞেস করতাম “স্যার
আজকে কি ছুটি হয়ে যাবে?” উনি
বলতেন “তোমাদের ধর্মঘট, তোমরা
যা করবে কর!”
বাপরে! আমাদের এত ক্ষমতা! আসলে
মাস্টারমশাইরাও চাইতেন কোনভাবে
ধর্মঘটটা হয়ে যাক - ওনারাও একদিন ছুটি পাবেন। তারপর আমাদের মধ্যে গুজগুজ ফুসফুস - ধর্মঘটটা
কিভাবে সফল করা যায়| মাস্টারমশাই-এর নাকের ডগা দিয়ে
তো ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে যেতে পারি না|
কিছুক্ষণ বাদে কিছু সদ্য গোঁফ গজানো কলেজের ছাত্র আমাদের স্কুলে
এসে হাজির হত| কখনো
বি ই কলেজের ছাত্র তো
কখনো দিনবন্ধু কলেজের| তাদের মধ্যে
একটু নেতা গোছের যে, সে
একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিত - তার
সারমর্ম ছিল, সরকারের
ভুল নীতির ফলে ছাত্রদের
ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে| এসব
ভাল মতন বোঝানোর পর সে
বলতো “তোমরা
যদি আমাদের সমর্থন কর তাহলে
এখন ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে যাও।” কি যে আনন্দ হত! এই দৈববানীটার জন্যই তো অপেক্ষা
করছিলাম এতক্ষণ| বলা
তো সহজ কিন্তু
মাস্টারমশায়ের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাব, এই ব্যাপারটাও বেশ হিম্মতের দাবী রাখে। শেষে
কোন এক সাহসী ছাত্র ব্যাগটা
তুলে দরজার
দিকে এগিয়ে যেত| আর
দেখতে হত না| ভেড়ার
পাল যেমন একজনের পিছনে আরেকজন চলতে থাকে, আমরাও ঠিক সেইভাবে হুড়মুড় করে বেরিয়ে
পড়তাম| কেউ
ভুলেও মাস্টারমশাই-এর দিকে তাকাতাম না| তারপরে যত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাওয়া যায়, অন্যান্য
স্কুলের ছেলেরা যদি আগেই চলে এসে থাকে তাহলে তো খেলা শুরু হয়ে গেছে। দেরি করে গেলে
গোলকিপার খেলতে হবে যে!
প্রতিবছরই অনেকগুলো করে ছাত্র ধর্মঘট হত এবং বেশিরভাগ
সময়ই এই ধর্মঘট বিরোধিতা করত কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধীর নাম প্রায়ই এসে পড়তো এসব
আলোচনায়। এদিকে বাংলাদেশের যুদ্ধের পর আমার আবার ইন্দিরা গান্ধী আর জেনারেল
ম্যানেকশ-এর প্রতি একটু দুর্বলতা ছিল| তবু ধর্মঘটের খাতিরে যে কারো বিরোধিতা করতে
আমরা রাজি ছিলাম|
তারপর একদিন ইন্দিরা গান্ধী গেলেন ভোট-এ হেরে| নতুন সরকার এলো| এলেন নতুন
প্রধানমন্ত্রী| আমাদের
মনে আশঙ্কা - ছাত্র ধর্মঘটগুলো ঠিকঠাক হবে তো এবার? বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না, আবার এক ছাত্র
ধর্মঘট । এবার তাদের টার্গেট মোরারজি
দেশাই| আমরা
তখন একটু উঁচু ক্লাসে উঠেছি| ভাবলাম
বাড়ি ফিরে ক্রিকেট না খেলে এই
ধর্মঘটী দাদাদের সঙ্গে অন্যান্য স্কুলে একটু যাওয়া যাক| সবাই লাইন করে
বড় রাস্তার উপর দিয়ে নানা
রকম স্লোগান দিতে দিতে চললাম অন্য এক স্কুলের
দিকে| চারিদিকে
সতর্ক দৃষ্টি, হঠাৎ
পুলিশ টুলিশ এসে ঠেঙ্গিয়ে না দেয়| এক
বিজ্ঞ বন্ধু বলল, পুলিশের
নাকি আরো কাজ আছে, এসব
ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই| ব্যাস, নিশ্চিন্ত
মনে একটা স্কুলের
ছাত্রদের ছুটি করিয়ে আরো
একটার দিকে চললাম| দেখতে
দেখতে বেলা দেড়টা দুটো বাজতে
চলল| আমাদের
সেই ধর্মঘটী দাদারা ভাবেনি, আমাদের
উৎসাহ এত দূর গড়াবে| তারা
বলল এবার বাড়ি যাও তোমরা| কিন্তু
আমরা বাড়ি যেতে মোটেই
উৎসুক নই। আমরা
আরো একটা স্কুলের ছুটি করাবো প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি| আসলে আমরা তো ভরপেট ভাত ডাল খেয়ে স্কুলে এসেছি, আড়াইটে - তিনটে অবধি অনায়াসে টেনে
দিতে পারি| কিন্তু
ওই দাদারা হয়তো
বাড়ি বা হস্টেলে ফিরে গিয়ে ভাত
খাবে। তাদের
খুব খিদে পেয়েছে। তারা
আমাদের বোঝাতে লাগলো “আজকের
মত যথেষ্ট হয়ে গেছে। আবার
পরে হবে|”
কিন্তু আমাদের তখন যাকে বলে ‘জোশ’ এসে গেছে , নাছোড়বান্দার
মতন তাদের ধরেছি। “না, তোমরা আমাদের
সঙ্গে চলো – মোরারজি দেশাই এর এই অন্যায় আর সহ্য করা যায় না|” দাদারও বেশ
লজ্জায় এবং ফাঁপরে পড়ে গেছে| শেষমেষ
তারা আমাদের বোঝালো যে খুব শিগগিরই আবার একটা ছাত্র ধর্মঘটের ব্যবস্থা তারা করবে এবং তখন আমাদের
নিয়ে বিকেল পর্যন্ত যতগুলো স্কুল ছুটি করানো সম্ভব, সব ছুটি করা হবে। এই কথায় আশ্বস্ত হয়ে সেদিনের মতো আমরা বাড়ির পথ ধরলাম|
যেবার স্কুলে বোমা পড়লো, আমরা প্রাইমারি
সেকশনে| ক্লাস
শুরু হয়নি - হঠাৎ
প্রচন্ড একটা আওয়াজ, তারপরে
জানলা দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া| প্রথমে
ভেবেছিলাম কেউ বুঝি পটকা ফাটিয়েছে কিন্তু
ধোঁয়া দেখেই সবাই বই খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম| আজ ভাবি, ঐ বিপদের মধ্যেও কেউ বই খাতা ভোলে নি| কি নিষ্ঠা রে
বাবা! সব সরস্বতীর বরপুত্র এক এক জন| আমাদের ছিল দোতলায় ক্লাস, দেখি সিঁড়িতে
প্রচন্ড ভীড়| সমস্ত
ছেলেমেয়েরা হৈ হৈ করতে করতে নাবছে| আমাদের
ক্লাসে পড়তো কল্যাণী, তার
দিদি শ্যামলী আমাদের থেকে এক ক্লাস উঁচুতে পড়তো। দেখি সে তিনতলা থেকে একদম হাউ
হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আসছে। জিজ্ঞেস
করলাম কাঁদছিস কেন? সে
বলল বোমা পড়েছে আর “তিনতলাটা তো পুরো একদম কেঁপে উঠেছিল, তোদের আর কি”| আমার ভারী আফসোস
হতে লাগলো - ইস আমাদের দোতলাটা কেন কেঁপে উঠল না? বাড়িতে গিয়ে একটা বলার মতন জিনিস হত!
তারপর নিচে গিয়ে দেখি দিদিমণিরা সব দাঁড়িয়ে
রয়েছেন| বাইরের
থেকে দুই একজন লোক এসে তাদের বোঝাচ্ছেন এক্ষুনি স্কুল ছুটি দিয়ে দিন বাচ্চারা
বাড়ি চলে যাক| এখন
এতগুলো বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে যাবে কে , এই নিয়েও এক সমস্যা । শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল
মনে নেই কিন্তু
আমি বাড়ি চলে গিয়েছিলাম এবং চটপট ছুটি পেয়ে যাওয়াতে, যে অজ্ঞাত ব্যক্তিটি অত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বোমা মারতে এসেছিল তাকে মনে মনে একটা প্রণাম জানিয়েছিলাম|
আসলে সেটা ছিল সত্তর দশকের শুরু| বোমা টোমা
আকছারই পড়ত| লোকের
মুখে শুনতাম ওটা ছিল নকশাল পিরিয়ড। স্কুলে ছিল ইতিহাস পিরিয়ড, ভূগোল পিডিয়ড, অংকের পিরিয়ড - আর স্কুলের
বাইরে নকশাল
পিরিয়ড| আমার
বন্ধু অমিত একবার বলল যে ও টাইম বোমা বানাতে জানে| আমি তো অবাক! ক্লাস সিক্সের ছেলের এত এলেম? আমার মুখে একট
সন্দেহর ছাপ দেখে অমিত বলল “কিচ্ছু না, একটা সাইকেলের চাকা, আর একটা ঘড়ি
হলেই হবে| টাইম
টা সেট করে দিবি, একদম
কাঁটায় কাঁটায় বোমা ফাটবে।” সাইকেলের চাকার যে কি প্রয়োজন ছিল, সেটা আমি আজও
জানি না|
খুন-খারাবি লেগেই থাকতো সেই সময়| শুনেছিলাম
আমাদের এক মাস্টারমশায়ের এক মেধাবী ছেলেকে কারা যেন খুন করে দিয়েছিল| আমার এক বন্ধু
বলেছিল তার পিসেমশাইকে বাজারের মধ্যে কেউ ছুরি মেরে পালিয়েছিল| কে কাকে কেন খুন করত কিছু বুঝতাম
না, কিন্তু
মনে একটা আতঙ্ক থাকতো। বিশেষ
করে যখন অনেক পুলিশকে ঘোরাফেরা করতে দেখতাম| স্কুলের পাশে নিম্বার্ক আশ্রমে বিকেল বেলা একবার খেলছি, হঠাৎ একদল পুলিশ এসে একটি ছেলেকে ধরে
নিয়ে চলে গেল। শুনলাম
সে আমাদের এক বন্ধুরই দাদা এবং সে নাকি নকশাল| নকশাল যে এরকম সাধারণ দেখতে হয়, সেই প্রথম
জানলাম| আমার ধারণা ছিল
নকশাল মানে ইয়া লম্বা চওড়া চেহারা,
পুরু গালপাট্টা,
এক হাত পকেট -এ যেখান থেকে একটা বন্দুকের বাঁট উঁকি দিচ্ছে আর অন্য
হাতে একটা ঝোলা, তাতে
বেশ কিছু বোমা|
শশধরবাবু কোন এক সময় মিলিটারিতে চাকরি করতেন| একদিন ক্লাসে
গল্পচ্ছলে সেই কথাই বলছিলেন| আমরা
জিজ্ঞেস করলাম “স্যার আপনি কোথায় কোথায় যুদ্ধ করতে গেছেন?” উনি ইরাক না
ইরান কোথায় একটা গিয়েছিলেন এছাড়া সিঙ্গাপুরেও গিয়েছিলেন| আমাদের প্রশ্ন “স্যার, আপনি নেতাজিকে দেখেছেন?” শশধরবাবু বললেন “যখন
সিঙ্গাপুরে যাই নেতাজি তখন আর ওখানে নাই”| আমাদের প্রশ্ন “স্যার আপনি কি নেতাজির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছিলেন?” স্যারের উত্তর, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীতে| ফলে জাপানিই হোক
বা আজাদ হিন্দ ফৌজ, সবাই
তখন তাঁর শত্রুপক্ষ| ক্লাসের
মধ্যে কে যেন বলে উঠলো “স্যার
তাহলে তো আপনি দেশদ্রোহী!” উনি
কি যেন ভেবে চশমাটা ঠিক করতে করতে স্বভাবসিদ্ধ বাঙাল উচ্চারণে বললেন “তা তোমরা
বলিতে পারো।” ভারী সোজা সরল ছিলেন মানুষটি| যদিও ওনার বেতখানি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ|
প্রায় ৪০-৫০ টা বছর কেটে গেছে| রাজনীতির নানান
রূপ দেখেছি, এখনো
দেখছি| আজও
বনধ হয়, ছাত্র
ধর্মঘট হয়| কিন্তু
সেগুলো আর সেই
ছোটবেলার মতন আনন্দ দেয় না| বোমা
আজো পড়ে| সেই
সাইকেলের চাকার টাইম বোম নয়, আরো
ভয়ংকর সব জিনিস| কিন্তু
এসব ঘটনাগুলো আজকাল যেন বেশ কষ্ট দেয়। বিপদের মধ্যেও যে একটা আনন্দ ছিল সেটা আজ
হারিয়ে গেছে| রাজনীতি
ছিল অজানা জিনিস| তাই
বোধহয় আমাদের ছিল এক অনাবিল অজানার আনন্দ|