Thursday, December 5, 2019

এবার বার্বার

কেশায়নী ছিল আমার মামাবাড়ির সবচেয়ে কাছের চুল কাটার  দোকান| অবশ্য চুল কাটার দোকান মাত্রকেই   আমরা জানতাম  সেলুন বলে| সেই জ্ঞানটা কতটা প্রগাড় ছিল বলে রাখা ভালো| কলেজ ছাড়ার কিছুদিন পর কোন উপলক্ষে আমাদের  দু-তিনজন বাঙালির  প্যারিস যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল| সেখানে চায়ের দোকান  খুঁজছিলাম একদিন সকালে| একজন একটা দোকান দেখিয়ে দিল - দোকানের  গায়ে লেখা ছিল salon de tea - অর্থাৎ চা এর ঝুপড়ি| তাই দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিলো "দ্যাখো কান্ড, এখানে চুলও কাটে আবার  চা ও বিক্রি করে!" অবশ্য আমি নিজেও এ ব্যাপারে কম যাই না| একবার বোলপুর বেড়াতে গিয়ে বাবার কাছে শুনলাম রবীন্দ্রনাথকে নাকি শেষ যেবার কলকাতায় আনা হয়, রেলের একটা স্পেশাল সেলুন কার-এ করে  আনা হয়েছিল| আমি কল্পনা করেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ চুল কাটতে কাটতে বোলপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন একটা ভ্রাম্যমান সেলুনে চড়ে| অত চুল দাড়ি, সময় তো লাগবেই - তাই জার্নির সময়টা কাজে লাগানো হয়েছিল| সাধে কি আর বিশ্বকবি!

যাই হোক, হচ্ছিল কেশায়নীর কথা| জি টি রোডের ওপরেই সেই দোকান| পাশেই একটা ডেকরেটরের  দোকান ছাড়া আসে পাশে আর কিছু ছিল না| বেশ একটা শান্ত পরিবেশ| রাস্তার ওদিকটায় তেমন রোদ্দুর ও যেত না - কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব| একবার মাত্র ওই দোকানে ঢুকেছিলেম| সেবার মা ছোটমামাকে বলল ছেলেটার চুলটা  একটু কাটিয়ে নিয়ে আয় তো! ছোটমামার অত দোকানের বাছবিচার ছিল না| যেটা কাছে এবং ফাঁকা, সেখানেই ঢুকেছিল| কিন্তু ওই চুপচাপ ম্যাদামারা চুল কাটার দোকান আমার মোটেই  পছন্দ হয় নি| তবে নামটা জমজমাট ছিল| কেশায়ানী শব্দটা ডিকশনারীতে পাই নি| কোত্থেকে যে এই নামটা যোগাড় করেছিল কে জানে! আমি মনে মনে নিজেই একটা অর্থ করে নিয়েছিলাম - "বেশ বাহারী গোছের চুল"|

চুল কাটার  দোকানের মতো  দোকান ছিল রামের সেলুন| ওরকম জমজমাট সেলুন আর কোত্থাও দেখি নি| আমাদের কানপুরের সেলুন তার কাছে লাগে না| বসুদার সেলুনও নেহাত শিশু| এমনকি দিল্লী, ম্যাড্রাস মায় আমেরিকার সেলুনও  রামের সেলুনের ধরে কাছে ঘেঁষতে পারবে না| রামের সেলুনে ঢোকার আগে সেই সেলুনগুলোর সঙ্গে একটু পরিচয় করিয়ে দিই|

কানপুরের সেলুনে একটা ভালো জিনিস আর একটা খারাপ জিনিস ছিল| ব্যাস - বাকি সব মামুলী | ভালো জিনিসটা হলো একটা বোতলের মুখে একটা স্প্রে করার যন্ত্র| মাথায় বেশ পিচকিরি দিয়ে জল ঢালতো লোকটা - খুব মজা পেতাম ছোটবেলায়| একদম হোলি হ্যায়!| আর খারাপ জিনিসটা হলো ঘাড়ের চুল কাটার একটা ক্লিপ| যখন চালাতো, মনে হত ঘাড়ের চামড়া খুবলে খুবলে তুলে নিচ্ছে| ভয়ে সিঁটকে থাকতাম যখন নাপিত ভায়া ওটা হাতে তুলে নিত| একদম থার্ড ডিগ্রী|

ম্যাড্রাসের  সেলুনের দেয়ালে ছিল নানান ফিল্ম হিরোদের ছবি| তার মধ্যে সুপারস্টার রজনীকান্তের জামাই ধনুষের  অনেকগুলো ছবি ছিল|  আমি ভাঙ্গা ভাঙ্গা তামিলে বললাম "রজনীকান্ত মাপিল্লাই  আ? সুপ্পার এক্টর আ|" নাপিত ছেলেটা  আমার জ্ঞান দেখে সেদিন কি খুশীই না হয়েছিল! ষাট টাকার জায়গায় পঞ্চাশ টাকা নিয়েছিল| বলেছিলো "চেঞ্জ ইল্লা"| আমি জানি ওসব বাহানা - ওর কাছে চেঞ্জ ছিলো|| আসলে ও একজন তামিল সিনেমার ভক্ত হিসাবে আর একজন তামিল সিনেমার ভক্তকে ১০ টাকা ডিসকাউন্ট দিয়েছিল|

কর্মসূত্রে নিউ জার্সিতে কিছুদিন থাকতে হয়েছিল| ওখানে চুল কাটার দাম দেখে ঠিক করেছিলাম, যেদিন কাটব, একদম মিলিটারী ছাঁট দিয়ে নেব, যাতে আর ছমাস ওমুখো না হতে হয়| খুঁজে পেতে একটা সস্তার সেলুনও  বার করলাম| নাপিতের নাম জন| তার সারা দেয়ালে - না ফিল্ম হিরো নয় - ইউরোপের কিছু সুন্দর সুন্দর শহরের ছবি| আর সেই ছবিগুলোর সবকটাতেই জন উপস্থিত|  "ইস দ্যাট ক্রেমলিন?"   জিজ্ঞেস করতে বললো "ইয়্যা, ওয়েন্ঠ দেয়ার ল্যাস্ট ইয়্যার"| বুঝলাম যে জন হেলাফেলার পাত্র নয়| চুল তো কাটা  হলো| এদিকে কে যেন বলেছিলো, ওদেশে চুল কাটার পয়সা দেবার পর একটু টিপসও দিতে হয়| কিন্তু যে লোকটা রোম, প্যারিস, এথেন্স, মস্কো চষে এসেছে, তাকে আমি আর কি টিপস দেব? টিপস দিতে এত লজ্জা আর কখনো পাই নি|

আমাদের পাড়ায়  ছিল একটাই সেলুন| বসুদার সেলুন| ভাদ্রলেকের নাম বসু ছিল, না পদবী বসু সেটা বেশির ভাগ লোকই  জানত না| সকাল আটটার মধ্যে মালকোঁচা মারা ধুতি আর একটা ফতুয়া পরে সাইকেল চালিয়ে উনি আসতেন| দোকান খুলেই স্টোভ জ্বেলে একটু গরম জল চড়িয়ে দিতেন দাড়ি কামানোর প্রস্তুতি হিসেবে| তারপর এসে যেত পড়ার যত সদ্য রিটায়ার করা আধ বুড়োর দল| বেশির ভাগের পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি| খুব আড্ডা চলত| বসুদা একটা বাংলা কাগজ রাখতেন| সেই কাগজটা ওই লোকগুলোর কেউ বাড়িতে নিত না - বসুদার দোকানেই পড়ে নিত| কেউ কেউ দাড়িও কমিয়ে নিত আড্ডার ফাঁকে| মাঝে মধ্যে কোনো কুঁচো কাঁচা এসে চুল কেটে যেত| আমিও কেটেছি অনেকবার| রামের সেলুন বন্ধ হয়ে যাবার পর আর ওই বেতাইতলা  অবধি গিয়ে চুল কাটাতাম না| বসুদা কিছুতেই আমার কানের পাশের চুলগুলো কাটতে চাইতেন না| বলতেন "রোগা শরীর তো, কানের পাশটা একটু ভারী রেখে দিলে ভালো দেখাবে|" একদম আধুনিক জামানার হেয়ার স্টাইলিস্টদের মতো রিসার্চ ওরিয়েন্টেড চিন্তা ভাবনা! আমার আজকের ধুমসো চেহারা দেখলে হয়তো  উনি আমাকে ন্যাড়াই  করে দিতেন - "মোটা শরীর তো, যত কম চুল থাকে ততই ভালো|"

দিল্লীতে আজকাল অবশ্য প্রচুর হেয়ার স্টাইলিস্ট| তাদের এয়ার কন্ডিশন্ড বাহারী দোকান| কিসমস্ত নাম - Hair port, Julius Scissor, Hair you go, Hairitage.. এই সমস্ত চুল বিশেষজ্ঞরা  সব নাকি কোনো এক হাবিব মিঞার চ্যালা | আমার রাজু ভাইয়ার  দোকানে ৫০ টাকা তো হেয়ারপোর্টে ১০০ টাকা| পলটু সেবার সেই দোকানে গিয়ে দরাদরী শুরু করেছিল| শেষমেষ বলেছিলো, আমার কাছে ৭০ টাকাই আছে - কাটবে কি না বলো? লোকটা রাজি হয়ে গেছিলো| বাড়ি ফিরতে আমি বললাম তুই ওই দোকানে ২০ টাকা বেশি দিয়ে চুল কাটালি? পলটুর  অকাট্য যুক্তি - তোমার দোকানের চেয়ে ২০ টাকা বেশি, কিন্তু ওদের দামের চেয়ে তো ৩০ টাকা কম! আমি ৩০ টাকা বাঁচালাম আজ|

পলটু  চুল কাটতে গেলেই ঐরকম কিছু একটা করে আসে| সেবার ফ্রি তে চুল কেটে এলো| ও নাকি তিন ইঞ্চি চুল রাখতে বলেছিলো আর নাপিত সেটা দু ইঞ্চি শুনেছিল| চুল কাটার পরে ঝগড়া| ওর পাশে বসা ভদ্রলোকও নাকি পলটুকেই  এই ব্যাপারে সমর্থন করেছিলেন| পলটু  ক্ষতিপূরণ দাবী করেছিল - যদিও সেটা ও পায় নি| তবে ফ্রি তে চুল কাটা  হয়ে গেছিল|

রাজু ভাইয়ার দোকানে আবার অন্য খেলা| সে আজকাল আর নিজে চুল কাটে না| অনেক লোক রেখেছে - নিজে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে| কেউ ওদিকে গেলেই "আইয়ে সার আইয়ে" বলে ঢুকিয়ে নেয়| পাশের দুটো দোকানে যাতে কেউ না যায়, সেই ব্যবস্থা| অনেকদিন পরে  জেনেছিলাম যে ওই তিনটে দোকানই নাকি রাজু কিনে নিয়েছিল| তাহলে কার সঙ্গে এত কম্পিটিশন? রাজুকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, আগে তো তার একটাই দোকান ছিল| তখন ওরকম ডাকাডাকি করতেই হতো| কিন্তু এখনো করে কারণ "আদত পড় গয়া"| আমি বললাম, "সে তো যখন তুমি শুরু করেছিলে, শুনেছি ইঁটের ওপর বসিয়ে চুল কাটতে| এখনো সেলুনের ভেতরে চেয়ারের বদলে ইঁট রাখোনা ক্যানো? রাজু উত্তর দেয় নি| আরো একজনের পেছন পেছন "আইয়ে সার আইয়ে" বলতে বলতে ছুটেছিল|

রামের সেলুন দিয়ে শেষ করি| জীবনের শেষ কথাটাই তো "রামনাম সত্য হ্যায়"| রামের সেলুন ছিল বেতাইতলার ব্যস্ত মোড়ের থেকে বড়জোর ২০ মিটার দুরে| দোকানের দুটো অর্ধেক  পাল্লা  ছিলো| টেনে বা ঠেলে খোলা যেত, ছেড়ে দিলে দুবার এদিক ওদিক করে নিজেই আবার স্বস্থানে গিয়ে থেমে যেত| তখন দোকানের ভেতরের লোকেদের পা গুলো দেখা যেত শুধু| কতজন ওয়েটিং এ আছে হিসেব করতে হলে, মোট পায়ের সংখ্যাকে দুই দিয়ে ভাগ করে ভাগফল থেকে দুই বাদ দিতে হত - কারণ দুজন নাপিত ছিল সেখানে| দুটো পাল্লারই  ওপরে বাঙলায় লেখা ছিল  "রামের সেলুন"| পাল্লা  দুটোর ওপর দিয়ে সকালের রোদ ঢুকত রামের সেলুনে| জিটি রোড রামের সেলুনের সামনেই  সামান্য বাঁক নিয়েছে - ফলে সর্বক্ষণ বাস এর তীব্র হর্ন| ধুলোও  ঢুকত সেলুনে| পাশেই একটা গোপালের গেঞ্জি জাঙ্গিয়ার দোকান - সে দর চড়িয়ে রাখতো আর সবাই জানত যে ওর দোকানে খুব দরাদরী করা যায়| ফলে ভিড় হত আর লোকজন খুব চেঁচামেচি করে দরদস্তুর করতো| রাস্তার ওপারে একটা বাঁশ আর বালির গোলা| মাঝে মধ্যে সেসব  ঠেলাগাড়িতে তোলবার সময় বা ঠেলাগাড়ি থেকে নামানোর সময় খুব হই চই  হত| আশে  পাশে আরো কিসব দোকান ছিল - সব মনে নেই| সামনে উঁচু রোয়াক, সেখানে কেউ কেউ সাইকেল উঠিয়ে রাখতো| গোটা চারেক নেড়ি কুকুর সারাদিন চেঁচাতো| একদম  হাই ডেসিবেল জোন| এরই মধ্যে অত্যন্ত ধীর স্থির ভাবে রামদা একটার পর একটা লোকের চুল দাড়ি কেটে যেত সারাদিন| পরনে খাটো ধুতি আর হেমন্ত মুখার্জির  মতো একটা সাদা শার্ট| পায়ে চামড়ার চটি| বেঁটে খাটো মানুষ  - বড় জোর সাড়ে পাঁচ ফিট| মাথার মাঝখানে টাক| চিন্ময় রায়ের মত সরু গোঁফ| রামদার সাগরেদ ছিল জুন| তার নাম আসলে জুনেদ, না জানকিপ্রসাদ, না জন...কেউ জানতো না| ঘাড় ঢাকা চুল| খানিকটা চুল চোখ, নাক মুখের ওপরেও এসে পড়ত| এক আঙ্গুলে কায়দা করে সেগুলো সরাত জুন|  চকচকে মুখ, মনে হত দিনে দুবার দাড়ি কামায়| রোগা  তেঢ্যাঙ্গা চেহারা| আমাদের বাড়ির কেউ কিন্তু জুনের কাছে চুল কাটাত না| কারণ রামদা ছিল অভিজ্ঞ নাপিত, ফলে সবাই তার খদ্দের ছিল| শুনেছি জুনের খাবার জুটত না, তাই রামদা দয়াপরবেশ হয়ে ওকে কাছে রেখে কাজ শিখিয়েছিল| রামদার বৌ বাচ্ছারা সব দেশে থাকত, তাই কোনো সমস্যা ছিল না| আমার অবশ্য মনে হত জুন নেহাত খারাপ নাপিত নয়| রামদার ঘাড়ের চুলগুলো কেমন পরিপাটি - সেটা নিশ্চই জুন -ই কাটে! আর জুন এর ওই এলোমেলো চুল কাটে রামদা|

জুন ছিল ভারী ইন্টারেস্টিং মানুষ| ধর্মেন্দ্র থেকে ধাপার ফুলকপি, হোমিওপ্যাথি এবং  হেলেন, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের স্কোয়ার কাট  কিম্বা কাশীর বিশ্বনাথ গলির আলুর চাট  - হেন বিষয় ছিল না যার সম্বন্ধে জুনের অগাধ পান্ডিত্যের রসে আমরা চোবানি খাই নি| আমার পরিষ্কার মনে আছে, যেদিন মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলো, তার পরের দিন আমি চুল কাটাতে গেছিলাম| জুন বিস্তারিত ভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস বোঝাচ্ছিল - অমন আকর্ষনীয় ভাবে খুব কম লোকই ইতিহাস পড়াতে পারবে| নেহাত বেলা একটা বেজে গিয়েছিল, নইলে সেদিন আমার মোটেই বাড়ি যাবার ইচ্ছে করছিল না|  জুনের সবচেয়ে প্রিয় টপিক ছিল 'ম্যামড্যান' স্পোর্টিং এর কোনো বড় ম্যাচ দেখতে গিয়ে  'শ্শালা' বেধড়ক  মারপিটের ভেতর থেকে ও কিভাবে 'শ্শালা' অক্ষত বেরিয়ে এসেছিল সেই ঘটনা| শুধু 'শ্শালা' জামার সাইড পকেটটা ছিঁড়ে গেছিল - সেটা সে প্রমান হিসেবে দেখাত| ওর জামাটাও ছিল দেখার মত| একটা বিশাল সাদা আলখাল্লা বিশেষ| অনেকটা যেরকম জামা আজকাল পাক প্রেসিডেন্ট ইমরান খান পরে  থাকেন| সঙ্গে ম্যাচিং ঢোলা পায়জামা| খালি পা| অনেক পরে আমার মনে হয়েছিল, ফিদা হুসেনের দাড়ি গোঁফ চেঁচে দিলে অনেকটা জুনের মত দেখতে লাগতো| সর্বক্ষণ পান চিবোতো| খানিক্ষণ পরে পরেই চা আনিয়ে একটা  ছোট্ট খুরি তে করে খেত আর নিজের সব খদ্দেরদের খাওয়াত| রামদাকেও  খাওয়াত, কিন্ত রামদার খদ্দেরদের খাওয়াত না| তবে জুনকে সবাই কেমন যেন সন্দেহের চোখে দেখত| কারো কারো কাছে শুনেছি ও একটা নেশাখোর মাতাল| একদিন রামদার টাকাকড়ি নিয়ে সরে পড়বে|
তারপর একদিন চুল কাটতে কাটতেই রামদার স্ট্রোক হলো| সঙ্গে সঙ্গে  জুন......না, রামদার টাকা পয়সা নিয়ে সরে পড়ল না| রামদাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল| সেখান থেকে হাঁসপাতাল| অনেক চেষ্টা করেছিল বাঁচাতে| অবশেষে রামনাম সত্য হ্যায় হয়ে গেল| আমরা বললাম dying in harnesss (কথাটা নতুন শিখেছি তখন)| তারপর কিছুদিন সেলুন বন্ধ| মাসখানেক পরে  দেখি জুন আবার দোকান খুলেছে আর জুনের পেছনে দাঁড়িয়ে চুল কাটছে রামদা| কি আশ্চর্য! ভেতরে ঢুকে জানলাম ওটা রামদার ছেলে - একদম বাপের মত চেহারা আর পোশাক আশাক| মায় টাকটা পর্যন্ত রামদার মতন| জুন বলল "'শ্শালা' আসতেই চায় না| গ্রামে গিয়ে ধরে আনলাম| 'শ্শালা' তোর বাপের ব্যবসা তুই দেখবি না তো কি আমি দেখবো"| কিছুদিন এই ভাবেই চলল| রামদার ছেলেকে জুন চুল কাটা  শেখালো| কিন্তু তখনো  জুন জুনিয়র পার্টনারের মতই ব্যবহার করত| রামদার ছেলের কিন্তু শহরে মন টিকলো না| সে ভেগে গেল| এরপর আমি জুনের কাছেই চুল কাটাতাম| লোকের মুখে শুনেছি জুন প্রতি মাসে রামদার বাড়িতে টাকা পাঠাতো| কিন্তু জুন আর বেশিদিন বাঁচে নি| বোধহয় ওর মন ভেঙ্গে গিয়েছিল|

স্বর্গে গিয়ে জুন হয়তো  আজও গৌতম  বুদ্ধের জটার পাক খুলতে খুলতে ওনাকে বোঝাচ্ছে "ওরকম শ্শালা ঝাড়পিটের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলাম, ম্যামড্যান তখনও এক গোলে  জিতছে| শ্শালা পকেটটা ছিঁড়ে গেল, এই দ্যাখো"| স্বর্গে সে এক নতুন দৃশ্য়| গৌতম বুদ্ধ চা খেতে খেতে শুনছেন জুনের কাহিনী|

হুম, আমি নিশ্চিত যে জুন স্বর্গেই গেছে||


Thursday, November 28, 2019

পুলুর গল্প

এটা পুলুকে নিয়ে গল্প নয়| এটা হলো পুলুর গল্প নিয়ে গল্প|

ফিরে যেতে হবে পঁয়ত্রিশটা বছর পেছনে| পুলুর তখন কত বয়েস - সাত কি আট হবে! আর বুলির বয়েস আরো বছর ছয়েক বেশি| প্রায় মাসখানেক ভুগেছিল বুলি| পুলুর অবশ্য ভালই লাগত প্রথম প্রথম| দিদি স্কুল যাচ্ছে না - বেশ সময় কাটত|  পুলু তো তখনো  স্কুলেই ভর্তি হয় নি| কিন্তু শেষের দিকে বুলি  প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে গেল| অনেকটা সময়ই তখন পুলু ওর দিদির বিছানার পাশে বসে বসে ছবির বই নাড়াচাড়া  করত| বুলি  বেশির ভাগ সময়ই ঘুমোতো তখন | সেদিন বিকেলের কথাটা পুলুর অল্প অল্প মনে পড়ে| এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়ে আবহাওয়াটা কিছুটা গুমোট| বুলি  কিন্তু চাদর জড়িয়েই শুয়ে  আছে| হঠাৎ   বলে উঠলো "জানিস পুলু, আমি মনে হয় মরেই যাবো| কাল রাত্রে মা কাঁদছিল আর বাবা বলল দ্বিজেন  ডাক্তার বলেছে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে| ওরা ভেবেছিল আমি ঘুমিয়ে আছি - কিন্তু আমি অনেকটাই শুনেছি ওদের কথা||
পুলু কি বুঝেছিল ভগবান জানে| মরে যাবার কথাটা শুনেছিল আগে, কিন্তু মরে গেলে ঠিক কি হয়, বা ঠিক কিভাবে মানুষ মরে যায় - এসমস্ত নিয়ে ওর কোনো ধারণা তখন ছিল না| যদিও মরার ব্যাপারটাকে বেশ ভয়ই পেত - মরে গেলে যে মানুষ ভূত হয়ে যায় এটুকু সে জানত| ভয়ে ভয়ে দিদির হাতটা চেপে ধরে বলেছিলো, "তুই মরে গেলে  আমার কি হবে রে দিদি ?" বুলি কি একটু হেসেছিল তখন?

*************

তেমন কিছুই কিন্তু ওলট পালট হয় নি পুলুর জীবনে| মোটামুটি পড়াশোনা করে ব্যাঙ্কে একটা চাকরি পেয়ে গেছিল| বিয়ে-থা করে সংসারী - যদিও ছেলে মেয়ে নেই | বাবা মা দুজনেই গত হয়েছেন| সকাল নটা নাগাদ এক কৌটো টিফিন নিয়ে স্কুটার চালিয়ে অফিস যাওয়া,  কিছুক্ষণ কাজ, কিছুক্ষণ আড্ডা| চার কাপ চা| গোল্ড ফ্লেক সিগারেট| মাসে দুটো সিনেমা| জামাইষষ্ঠী তে শ্বশুরবাড়ি - পরের দিন এন্টাসিড....এসব করে বেশ দিন কেটে যাচ্ছিল| বুলি  বলে একটা মেয়ে যে কোনকালে এই বাড়িতে ঘুরে বেড়াত, সেটাই যেন ভুলতে বসেছিল|
সব কিছু বদলে গেল চ্যাটার্জিবাবু জয়েন করার পর| ভদ্রলোকের ছিল লেখালেখির শখ| একটা লিটল ম্যাগাজিনও চালাতেন| একদিন অফিসের সামনে হরির দোকানে চা খেতে খেতে বললেন "পল্লববাবু, আপনি তো বেশ গল্প বলেন, লেখার চেষ্টা করেন না কেন?"
"লিখেছিলাম তো একবার একটা গল্প| কিন্তু কোনো শালা ম্যাগাজিনে ছাপলো না|"
"বেশ তো, আমাকে দিন না, আমার ছায়ানটে ছেপে দেব|"
বলা বাহুল্য, ছায়ানট ওনার লিটল ম্যাগাজিনের নাম| পুলু কিন্তু ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিল| ওদিকে ছায়ানটে  সম্ভবত তেমন লেখা টেখা আসছিল না, তাই চ্যাটার্জিবাবু -ই আবার মনে করিয়ে দিলেন| পুলুও খুঁজে পেতে লেখাটা বার করলো| ছায়ানটে পুলুর প্রথম গল্প বেরলো - "আজব দেশ"| চ্যাটার্জি বাবুর শালার বন্ধু নিখিল রায় মশাই এর হাতে কোনভাবে সেই লেখাটা যায়| নিখিল রায় ছিলেন "অন্য সময়" এর সম্পাদক| আর মাসিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে "অন্য সময়" যে ভালই নাম ডাক করেছে, সে আর কে না জানে!
এক রবিবার, চ্যাটার্জিবাবুর সঙ্গে নিখিল রায় এসে হাজির পুলুর বাড়িতে|
"আরে মশাই, আপনার তো লেখার হাতটি চমৎকার| অনেকটা বিভূতিবাবুর  ধাঁচ, অবশ্য অমিলটাও কম নয়|  লেখা থাকে তো দিন না, "অন্য সময়" লুফে নেবে|
তা লুফেই নিয়েছিল "অন্য সময়"| তিন মাসের মধ্যে দুটো ছোটগল্প বেরিয়ে  গেল| নতুন লেখক পল্লব  দাশগুপ্ত কে নিয়ে বেশ একটা হৈ চৈ পড়ে গেল সাহিত্য মহলে| নিখিল রায় প্রায়ই আসেন| একদিন বললেন, ছোট গল্প লিখে কিছু হবে না - বুঝলেন| এবার একটা উপন্যাসে হাত দিন| পুলু তো আকাশ হেকে পড়ল - উপন্যাস!! ব্যাঙ্কের ক্লার্ক পল্লব দাশগুপ্ত লিখবে উপন্যাস! নিখিল রায় পুলুর মনের কথাটা ধরে ফেললেন|
"আরে মশাই, এমন কিছু আহামরি ব্যাপার নয়| সুনীল গাঙ্গুলীর  মুখে শুনেছি, উনি প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন স্রেফ নিজের জীবনের কোনো একটা ঘটনার সুত্র ধরে| আর একবার যদি সুত্রটা ঠিকমত ধরতে পারেন, দেখবেন যে ওটা আর সুতো  নেই, একদম মোটা দড়ি| তখন ট্রাপিজের খেলা দেখিয়ে বেরিয়ে আসবেন মশাই| লেগে পড়ুন  ভাই - লেগে পড়ুন|"
সেদিন রাত্রে পুলুর ঘুম এলো না| ব্যালকনি তে বসে রইলো অনেক দেরী পর্যন্ত| গোটাতিনেক সিগারেট পোড়ালো| ওর  কি আর সুনীল গাঙ্গুলীর  মত জীবন! এ তো একদম সাদামাটা ডাল-ভাত-চচ্চড়ি মার্কা জীবন| এই নিয়ে কি উপন্যাস হয়? সাসপেন্স নেই, রহস্য নেই, প্রেম নেই, হাসি-মজা সুখ দুঃখ কিছুই তো তেমন জোরদার নয় পুলুর জীবনে| নাঃ, ছোটোগল্পই ভালো| - একটু নামডাক হয়েছে, কয়েক হাজার টাকা উপরি পাওনা হয়েছে, আর কি চাই!
শুতে গিয়ে পুলুর হঠাত চোখ পড়ে গেল দেয়ালের ফটোটার দিকে| বুলির সঙ্গে পুলু, বাড়ির ছাদে তোলা|  আচ্ছা, কতদিন হলো? অনেকগুলো বছর! কতই না খারাপ লেগেছিল প্রথম দু-একটা বছর| সময় সব ভুলিয়ে দেয়| সেবার চিড়িয়াখানায় বাঁদরের  খাঁচার সামনের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল| পুরী বেড়ানোর কথাও মনে পড়ল| সেই ঢেউ এর ধাক্কায় পড়ে গিয়ে বুলির কি কান্না| এক এক করে অনেক ঘটনা মনে ভিড় করে আসতে লাগলো| ধীরে ধীরে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলো| তারপর কি স্বপ্ন দেখল, নাকি সব একে একে মনে পড়ে গেল - পুলু জানে না|
পরের দিন কোনো কারণে ছুটি ছিল| পুলু শুরু করে দিল লেখাটা| জীবনের সেই ঘটনাটা তার মনে এসে গেছে, যেখান থেকে তাকে ট্রাপিজের খেলাটা শুরু করতে হবে|

১৩ই আগস্ট, ১৯৮৫| সূর্যাস্তের আগেই ওরা বুলির ছোট্ট দেহটা নিয়ে বেরিয়ে গেছিল|........

পুলুর কলম যেন থামতেই চায় না| সেদিনের ঘটনাটা পুরো মনে পড়ে যাচ্ছে| মস্তিষ্কের কোন ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কে জানে|  সমস্তটা লিখে ফেলল| এরপর? এরপর কি লিখবে সে? ১8 ই আগস্ট? কিন্তু সে তো মনে নেই? ১২ই আগস্ট মনে আছে| পেছন দিকে হাঁটলে কেমন হয়? এ তো আর সুনীল গাঙ্গুলী  নয় - এ হলো পল্লব দাশগুপ্ত| চলা যাক উল্টো পথে| দু  মাসের মাথায় লেখাটা শেষ করে ফেলল পুলু| ছ মাসের মধ্যে বেরিয়ে গেল "অতীতের আগে"| নিখিলবাবু কিছু ভুল ত্রূটি শুধরে নিতে  বলেছিলেন, নইলে আরো আগেই বেরোত| নিখিল বাবুরই এক বন্ধু পাবলিশ করলেন বইটা| হট  কেকের মত বিকোতে লাগলো "অতীতের আগে"| এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সংস্করণ|

সুপর্ণ দাসের মত পরিচালক বাড়িতে এসে নিজে কথা বললেন| সঙ্গে প্রোডিউসার| ছবি হবে| মোটা অঙ্কের অ্যাডভান্স মিলল| বছর ঘুরতে না ঘুরতে ছবি বেরোলো, এবং সুপার ডুপার হিট| পুলু কে এখন  পুরো বাংলা চেনে| অনেকে শরতচন্দ্রের সঙ্গে পুলুকে তুলনা করতে শুরু করে দিয়েছে| পাবলিশারদের ভিড় বাড়িতে| রাস্তায় ঘাটে লোকে অটোগ্রাফ চায়| একটা মারুতি গাড়ী কেনা হয়েছে| বৌ খুব খুশি - বলেছে এবার থেকে মাসে চারটে করে সিনেমা দেখাতে হবে| পুলু অবশ্য ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছাড়ে নি| চ্যাটার্জিবাবুর সঙ্গে সখ্যতা অনেক বেড়ে গেছে| এখনো নিয়মিত ছায়ানটে লেখা দেয় পুলু|

কিন্তু এরপর যা ঘটল তা একদম অভাবনীয়| বম্বে  থেকে জীবন মন্সুখানি এসে হাজির| অত বড় প্রোডিউসার! আর যে অঙ্কের টাকা উনি অফার করলেন, বাপের জন্মে ক্যানো , অতি বৃদ্ধ  প্রপিতামহের জন্মেও পুলু সেটা চিন্তা করে নি| ভদ্রলোক ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলেন| কোথায় শিখেছেন জিজ্ঞেস করতে বললেন "আরে, কি যে বোলেন পোল্লব বাবু,  মুম্বাই কা  ইন্ডাস্ট্রি তো বাঙ্গালী তে ভোরা"| ভদ্রলোক উপন্যাসটার অনুবাদ পড়েছেন| বললেন "নিতিন সোরকারকে দিয়ে ম্যুজিক দিলাবো| এক্কেবারে ফার্স্ট সিনে একঠো স্যাড সং|" পুলুর মনে হলো সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, কিন্তু টাকার অঙ্কটা শোনার পর আর ওসব নিয়ে ঝামেলা করলো না|

আরো একটা বছর কাটল| মানে একদম হু হু   করে চলে গেল| ওর নতুন কেনা বি-এম-ডাব্লিউ গাড়ীটার মতন| স্রেফ  একটা উপন্যাস থেকে মানুষ কতটা সাফল্য পেতে পারে! শ্রেষ্ট কাহিনীর জন্য ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেল পুলু| অরিজিত রাঠোরের মত অভিনেতার হাত থেকে নিতে হলো সেই অ্যাওয়ার্ড! এবার কি পুলু নোবেল পাবে?

না, নোবেল নয়, কিন্তু জ্ঞানপীঠ পেয়ে গেল পুলু| এখন কফি হাউসে প্রেসিডেন্সির ছেলে মেয়েরা পল্লব    দাশগুপ্ত কে নিয়ে আলোচনা করে| নিখিল রায় একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন সেটা| ভাবলেও হাসি পায় পুলুর| ওই প্রেসিডেন্সিতেই ও এডমিশন টেস্টে ঝুলিয়ে এসেছিল সেবার|

এদিকে বাড়িতেও আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া গেছে বেড়ে| পিসিমা এসেছেন অনেকদিন পর| রাত্রে খেতে বসে বললেন "আজ বুলিটা বেঁচে থাকলে..." তারপর কান্না  ভেজা গলায় কি  যে বললেন বোঝা গেল না| দিদিকে বড্ড ভালবাসতেন পিসিমা|

পুলু অনেকদিন পর আবার রাত্রে বারান্দায় বসলো আজ| একটা  মার্লবোরো ধরালো, এখন আর গোল্ড ফ্লেক ভালো লাগে না| শেষ মেট্রোটা চলে গেছে কিছুক্ষন আগে | রাস্তাঘাট   আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে আসছে| একটা শূণ্যতা  ঘিরে আসছে পুলুর মনেও| পিসিমা কি বলল? আজ বুলিটা বেঁচে  থাকলে কি হত? মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথাটাও...."তুই মরে গেলে আমার কি হবে রে দিদি"....উত্তরটা পেয়ে গেছে পুলু| দিদি বেঁচে থাকলে "অতীতের আগে" বেরোত না,  এত নাম ডাক, অর্থ , ফিল্ম ফেয়ার , জ্ঞানপীঠ .....নাঃ, পুলু আর ভাবতে পারছে না|


Thursday, November 7, 2019

শর্মাজী

তখন এসেছিল রিয়েল এস্টেট এর স্বর্ণযুগ| লোকজনের বাড়ির খুব দরকার, আর অত বাড়ি শহরে নেই|  কিছুলোক, সেই তালে, যেন তেন প্রকারে কিছু জমি যোগাড়  করে ছোট ছোট ফ্ল্যাট  বানিয়ে বিক্রি করতে লাগলো| এদের একটা গাল ভরা নাম হলো - প্রোমোটার|এদের সাফল্য দেখে আরো কিছু ব্যবসায়ী মানুষ বড় বড় ফ্ল্যাট বানাতে লাগলেন| যখন জমির অভাব শুরু হলো, তখন খেলার মাঠগুলো, মাঠে মারা গেল| তারপর শুরু হলো পুকুর বোজানো| সে আবার এক বেআইনি ব্যাপার| তাই রাতের অন্ধকারে একটু একটু করে আবর্জনা ফেলা হতে লাগলো| দেখতে দেখতে পুকুরগুলো ঝোপ ঝাড়ের আকৃতি নিল| তারপর একদিন সেই ঝোপ পরিষ্কার করে ঝপাঝপ   করে চারতলা বাড়ি উঠে গেল| প্রত্যেক ফ্লোর-এ চারটে  করে ফ্ল্যাট| আগে লোকে পুকুর বোজানো জমিতে বাড়ি কিনতো  না, কিন্তু যখন সাপ্লাই এর চেয়ে ডিমান্ড বেড়ে গ্যালো, লোকজন সব ভুলে যা পাওয়া যায় তাই কিনতে লাগলো| এরপর এলো আবাসন প্রকল্প| দেয়াল ঘেরা ছোট্ট শহর| তার বাহার বাড়তে থাকলো| ভেতরেই খেলার মাঠ, দোকান, বাগান কি নেই! আর সেগুলোর দামও হয়ে গেল আকাশচুম্বী| ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে লোন নেবার লম্বা লাইন পড়ে গেল|
কিন্তু চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়| চারিদিকে এত ফ্ল্যাট  হয়ে গেল, যে আর কেনার লোক নেই| তারপর নানান কারচুপি, ঘুষ, চুরি এইসমস্ত ধরা পড়তে লাগলো| রিয়েল এস্টেট এর লোকজনের মাথায় হাত পড়ল|
যারা এই ব্যবসায় ছিলেন তারা সবাই যে অসৎ ছিলেন, তা হয়ত নয়| আর সবারই যে ব্যবসা লাটে  উঠে গিয়েছিল, তাও নয়| তাই আমি বলতে পারব না, শর্মাজী কিধরনের মানুষ ছিলেন| দুর্গাপুজোর চাঁদা নিতে ওনার বাড়ি যেতাম| মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতেন| বসিয়ে চা আর চানাচুরও  খাওয়াতেন| সাজানো গোছানো  ড্রয়িংরুম| বিশাল সোফা সেট | দামী কাঠের চমৎকার সেন্টার টেবিল | সেপ্টেম্বর মাসেও শর্মাজী মোজা পরে , একটা মোটা  কম্বল জড়িয়ে বসে থাকতেন| আর সে কি বাহারি কম্বল ছিল ওনার! একদম কাশ্মীরি গালিচা যেন! বৌদি বলতেন, তোমাদের দাদার আবার শীতটা বড্ড বেশি|   শর্মাজী পরিষ্কার বাংলা বলতে পারতেন| ওনার বক্তব্য ছিল, কম্বল জড়িয়ে সোফায় বসে চা খাবার মত আনন্দ খুব কম  আছে| একটু শীত বাড়লে আবার পায়ের কাছে একটা হিটার জ্বলত| সরস্বতী পুজোর চাঁদা নিয়ে বেরোনোর আগে সেবার হাত মেলালেন| আগুনে সেঁকে সেঁকে তপ্ত হাত| আমারই বেশ আরাম লাগতে শুরু করলো|
এরপর এলো সেই দুঃসময়| বছর গড়াতে লাগলো আর ক্রমশ চাঁদার অঙ্ক কমে আসতে লাগলো|  চানাচুর ছাড়া চা আসতে শুরু করলো| তারপর চাও বন্ধ হয়ে গ্যালো| কম্বলটাও  কেমন পুরোনো পুরোনো লাগত| একবার দেখলাম, একটা কোনা ছিঁড়ে গেছে| হিটারটা দেখি একপাশে  খারাপ হয়ে পড়ে আছে| শর্মাজী বললেন "একটা হিটার কিনব ভাবছি| সবচেয়ে ভালো কোনটা বলোতো? একবারই কিনব, একদম সেরা জিনিস!" 
শেষ যেবার গেছিলাম, বৌদি দরজা খুলে বললেন , চাঁদা আমি পাঠিয়ে দেব| বৌদি ছিলেন বাঙালি| ওনার পরিচিত  আর এক মহিলার কাছে শুনলাম যে আর চাঁদা পাবার আশা নেই| পয়সাকড়ির  খুব টানাটানি চলছে| ওনাদের নাকি ছ-সাতটা বাড়ি ছিল, এখন এই একটাতে এসে ঠেকেছে| ছেলেটাও ছোট, স্কুল এ পড়ছে তখনো| তাই অর্থাগম এর আর কোনো উপায় খোলা নেই|
কয়েকবছর আর ওদিক মাড়াই নি| হঠাত শুনলাম উনি খুব অসুস্থ| হাসপাতালে ভর্তি| লিভারের সমস্যা| কিছুদিন পর আবার সব ঠিক ঠাক| কিন্তু মাস দুই আগে শুনি আবার উনি হাসপাতালে| জানলাম যে ওনার মদ্যপান অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছিল| অর্থাভাব ভুলতে উনি মদ্যপান বাড়িয়েছিলেন নাকি মদ্যপান  বাড়িয়ে উনি অর্থাভাবে পড়েছিলেন, জানি না| সিরোসিস অফ লিভার হয়ে গেছে| লিভার-এ নাকি জল জমেছে - হাসপাতাল এ গিয়ে সেই জল বার  করতে হচ্ছে|| এদিকে পয়সাকড়ির  যা অবস্থা, প্রাইভেট হাসপাতালে আর রাখা যাচ্ছে না| পাড়ার লোকজনরা মিলে কিছু সাহায্য করল, কিন্তু তাতে আর কতদিন চলে| শর্মাজির অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হতে লাগলো| হাসপাতালেও আর রাখতে চায় না| তখন এ হাসপাতাল, ও হাসপাতাল সে হাসপাতাল ঘুরে বেড়াতে লাগলেন| মানে উনি আর ঘুরে বেড়ানোর অবস্থায় ছিলেন না - ওনার পরিবারের লোকজন ওনার দেহটাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো| সেই হোটেল বুক না করে বেড়াতে গেলে যেমন হয়, সেই অবস্থা| ঠিকমত হোটেলগুলো বড্ড দামী, সস্তার হোটেল থাকার যোগ্য নয়| ভালো ধর্মশালা খুঁজতে হয়| তাই AIIMS আর  সফদারজং -এ   চেষ্টা চলতে লাগলো| তারাও ওই অবস্থার রুগী নিতে নারাজ| শেষপর্যন্ত চেনাজানা কাউকে ধরে কিছুদিন সফদারজং আর কিছুদিন AIIMSএ রাখা হলো| জ্ঞান নেই| ICU তে পড়ে আছেন|
নভেম্বর এর শুরুতে একদিন দেখতে গেলাম| AIIMSএ গিয়ে দেখি ওখানে কেউ নেই| ফোন করে জানলাম, AIIMS আর রাখবে না বলে আবার সফদারজং এ ফিরে গেছেন| ছেলে আর বৌ দেখি ওই ঠান্ডা ভোরে হাসপাতাল এর সিড়িতে বসে বসে ঢুলছে| যাক , শর্মাজী অন্তত ICU তে কম্বল চাপা দিয়ে আছেন - যা শীত কাতুরে মানুষ|
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে খবর পেলাম, শর্মাজী দেহ রেখেছেন| অনেকদিন পর ওনার বাড়ি গেলাম| সেই জৌলুস আর নেই| সোফাগুলো ছিঁড়ে গেছে| দেয়ালে বহুদিন পেন্টিং হয় নি | অগোছালো ঘর| মাটিতে একটা চাদরের ওপর শর্মাজির দেহ| গায়ের ওপরেও একটা চাদর - পাতলা আর পুরোনো| কিন্তু শর্মাজির এখন আর শীত লাগবে না|
আর একটু পরেই উনি যে হিটারের কাছে যাবেন, সেখানে মানুষ একবারই যায়|

Tuesday, November 5, 2019

ঘরু

-হ্যাঁ রে ঘোষাল, তুই মুখার্জিদের নিয়ে কোনো জোক জানিস ?
-নাহ্ । কেন বল তো ?
-ভালোই হয়েছে। তাহলে তোকে শোনানো যাবে।
-মুখার্জিদের নিয়ে জোক?
- নারে , ঘোষালদের নিয়ে। তুই যখন পাল্টা কিছু শোনাতে পারবি না বলছিস!
-মেরে ফাটিয়ে দেব।
-ঠিক আছে, তাহলে নাহয় বলবো না।
-না, না, তুই বল ।
-সে একটা গল্প। সেই রাজামশাই এর হাতিশালে হাতী, ঘোড়াশালে ঘোড়া, গোশালে গরু আর ঘোষালে ঘরু.....
-ধুস, ঘরু আবার কি?
-সে তো তোরই জানার কথা। তুই তো ঘোষাল, আমি তো নই !
-রাজাদের শুধু হাতিশাল আর ঘোড়াশাল থাকতো। ও সমস্ত গোশাল টোশাল থাকতো না।
-আলবৎ থাকতো। রাজারা প্রচুর পরিমানে সন্দেশ, রসগোল্লা, রাবড়ি এসমস্ত খেতেন এটা তো পড়ে থাকবি? রাজার ছোটভাই  ছানার ডালনা পছন্দ করতেন সেটা হয়ত নাও জানতে পারিস। রাজমাতার তো দই ছাড়া চলতই  না - পেট গরমের ধাত। আর রাজপুত্র, রাজকন্যাদের জন্য দরকার হতো খাঁটি দুধ। এছাড়া লুচি, পরোটা এসমস্ত করতে গাওয়া ঘি তো ছিল মাস্ট। রানীমা শিবঠাকুরের মাথাতেই তো রোজ সকালে ৫ লিটার করে দুধ  ঢালতেন।এতো দুধ কোত্থেকে আসতো শুনি? তুই কি ভেবেছিস ভোর সকালে সত্য গয়লা এসে রাজবাড়িতে কড়া  নাড়তো? নাকি কোনো রাজকর্মচারী একটা বালতি নিয়ে মাদার ডেয়ারী তে লাইন লাগতো?
-ঠিক আছে, ঠিক আছে - গোশাল না হয় মেনে নিলাম  । কিন্তু তাই বলে ঘোষাল! ওরকম কিচ্ছু হয় না ।
-তুই নিজেকে অস্বীকার করলি?
-মানে?
-বললি তো যে ঘোষাল বলে কিছু হয় না?
-আমি বলেছি ঘরু রাখার ঘোষালের কথা।
-ঘরু মেনে নিলি তাহলে? ঘোষাল না থাকলে ঘরুগুলো কোথায় থাকতো শুনি? তুই জানিস না ঘোষাল। এসব রাজা গজার কাহিনী । জীবনে রাজা দেখেছিস?
-কেন দেখবো না? আমাদের স্কুল এর গেম টিচারের নাম রাজা রায়।
-তাহলে কাল স্কুলে গিয়ে ওনাকে জিজ্ঞেস করে দেখিস। ..."স্যার, আপনাদের ঘরু আছে?"
-ঠিক আছে। ঘরু আছে। ঘোষালে ঘরু থাকে। খুশি?
-বাব্বা। এমন করছিস যেন এক্ষুনি ঘুঁতিয়ে দিবি ।
-হ্যাঁ দেব! আমরা রাজা । আমাদের ঘরু আছে। তোরা ভিখিরি । ভিক্ষে করতে আসিস, তখন নাহয় একটা ঘোদান করবো।
- ঘরুদের অবহেলা করিস না। খুব ঘোড়েল টাইপের গরুরাই ঘরু হতে পারে। তখন তারা ঘোড়ার মতো দৌড়োয়। ময়দানে একবার ঘরুর রেস দেখেছিলাম।
-তুই ও দৌড়েছিলি?
-আমি কি ঘরুদের সঙ্গে পারি?
-সে তো বটেই। তুই যে গরু। যা, এবার গোশালে যা।
-ঠিক আছে চললাম। গোবরের দরকার হলে বলিস।
-চাই না । আমি ঘোবর দিয়েই কাজ চালিয়ে নেব।

ট্রাঙ্ক

সে ছিল লোহার মস্ত একটা বাক্স। খুব ছোট হলেও দেড়ফুট বাই দেড়ফুট বাই আড়াই ফুট। আর বড়গুলো তো এর ডবল সাইজের। সে অনেক দিন আগেকার কথা। দোকানে গিয়ে দশ পয়সার বদলে এক মুঠো চানাচুর পাওয়া যেত  সে সময়ে। দেয়ালে গর্ত করে আলমারি বানানোর কায়দা বোধহয় আবিষ্কার হয় নি তখনো। দেয়ালে বড়োজোর সেল্ফ থাকতো, কিন্তু সেখানে কেউ জামাকাপড় রাখতো না। রাখতো বই, খাতা, আয়না, চিরুনি, ঘড়ি কিংবা দুটো মাটির পুতুল বা ফুলদানি । একটা খবরের কাগজ বিছিয়ে নেয়া হতো প্রথমে। সে খবরের কাগজও কত সাবধানে বাছতে হতো। কে একবার আয়নার নিচে লিরিল সাবানের বিজ্ঞাপন রেখে দিয়েছিলো বলে সে কি হুলুস্থুল সেবার আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। তবে  লোহার বা কাঠের আলমারি যে কারো বাড়িতে থাকতো না, তা নয়। কিন্তু আমার জানাশোনা বেশির ভাগ বাড়িতেই সেগুলো অনুপস্থিত ছিল কানপুরের মতো ছোট শহরে।

লোকজন বেড়াতে গেলে সঙ্গে যেত ট্রাঙ্ক । নেহাত দু একজনের সঙ্গে সুটকেস  দেখেছি  - তাও চামড়ার সুটকেস । ট্রাঙ্কের  সঙ্গে একটা বেডিং ও যেত বেড়াতে। ধন্য বটে সেসব কুলিরা, যারা দুটো ট্রাঙ্ক মাথার ওপর নিয়ে, তার ওপর একটা বেডিং চাপিয়ে টলমল করতে করতে হাওড়া স্টেশন এর ৯ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিতো। আর সে কি স্পিডে  তাদের হাঁটা! পেছন পেছন ট্রাঙ্কের মালিকরা দৌড়ত । গন্তব্যে পৌঁছে কাঁধের গামছা দিয়ে তারা প্রথমে ঘাম মুছতো আর তারপর কিছু বেশি পয়সা পাওয়ার  জন্য ঝগড়া শুরু করত। সেসমস্ত বিহারী কুলি - বাঙ্গালীদের ঘাড়  বোধহয় সেসময় অতটা শক্ত ছিল না। এখন কি হয়েছে?

চাকা লাগলো ট্রাঙ্ক দেখি নি। তাই ট্রাঙ্ক একটা ঝক্কি ছিল, এটা ঠিক। কিন্তু ট্রাঙ্ক নিয়ে ট্রেনে যাবার অনেক সুবিধেও  ছিল। হঠাৎ করে কোনো চোর ট্রাঙ্ক নিয়ে সটকে পড়তে পারতো না। কেউ একটা ছুরি দিয়ে ট্রাঙ্ক কেটে জিনিস নিয়ে নিতে পারতো না। ইঁদুরে সুটকেস ফুটো করে দিত কিন্তু ট্রাঙ্কের ক্ষেত্রে তারা ছিল জব্দ। ট্রেন আসতে  দেরি হলে প্লাটফর্ম-এ একটা ট্রাঙ্কের ওপর তিনজন অনায়াসে বসতে পারতো । ট্রাঙ্কের ভেতরের জামাকাপড়ের ভাঁজ নষ্ট হতো না। দুটো বার্থের মধ্যে দুটো ট্রাঙ্ক রেখে, তার ওপর তাস নিয়ে পেটাপেটি করা যেত। যেসব গোনাগুনতি লোক প্লেনে চড়বার ক্ষমতা রাখতো, তারা ট্রাঙ্ক নিয়ে যেত কিনা জানি না অবশ্য। আরো একটা মস্ত সুবিধে ছিল, চাবি হারিয়ে গেলে, তালাটা ভাঙলেই হতো, সুটকেসের মতো ঝঞ্ঝাট করতে হতো না।

বাড়িতেও ট্রাঙ্ক -এর নানান  ব্যবহার ছিল। ট্রাঙ্ককে টেবিলের মতো ব্যবহার করা যেত। তিনটে  ট্রাঙ্ক একটার ওপর আর একটা রেখে তার ওপর দাঁড়িয়ে ফ্যান পরিস্কার  করা যেত। আমাদের বাড়িতে যখন প্রথম টিভি এলো, টিভি কিনেই পয়সা শেষ। সেটা রাখার টেবিল কোত্থেকে আসবে? তখন দুটো ট্রাঙ্ক রেখে, তার ওপর একটা টেবিল ক্লথ পেতে  টিভি রাখা হল। একবার দরজার ছিটকিনি ভেঙে গ্যালো, পুরো একদিন সেই দরজাটার পেছনে দুটো ট্রাঙ্ক দাঁড়িয়ে রইলো পাহারাদারের মতো। আর যে সব ট্রাঙ্কের সেরকম কোনো কাজ থাকতো না, তারা খাটের  তলায় ধুলো শুঁকত।

সে যাই হোক, প্রশ্ন হচ্ছে তখনকার লোকজনের জামাকাপড় কোথায় থাকতো? সেসব থাকতো আলনাতে । একটা কাঠের স্ট্যান্ড গোছের ব্যাপার আর কি । আমাদের আলনা ছিল না । তাই যেখানে পারা যেত, সেখানেই জামাকাপড় রাখা হতো। খাটের পাশে, ট্রাঙ্কের ওপরে, দরজার ওপরে, দেয়ালের হুকে, দড়ির ওপর । ট্রাঙ্কের ভেতরেও থাকতো। কিন্তু রোজ রোজ তো আর ট্রাঙ্ক খোলা হতো না। তাই রোজকার প্রয়োজনের বাইরের জিনিসগুলোই ট্রাঙ্কের ভেতরে যেত। যেমন এক্সট্রা চাদর, সোয়েটার, কোনো দামি জামা যেটা বিশেষ অনুষ্ঠানেই পরা  হবে - এইসব।

আমাদের বাড়িতে অনেকগুলো ট্রাঙ্ক ছিল। একটা বাবার, একটা মায়ের, একটা ঠাকুমার - এছাড়াও দু একটা এক্সট্রা ট্রাঙ্কও ছিল। যেদিন ট্রাঙ্ক খোলা হতো, হামলে পড়তাম দেখার জন্যে। প্রথমেই একটা ন্যাপথলিনের গন্ধ নাকে ধাক্কা মারতো। তারপর একে একে বেরিয়ে আসত বাবার কোনো পুরোনো কোট, কিম্বা ঠাকুমার বোনা একটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের সোয়েটার। মা বলতো প্যাটার্নটা খুব ভালো, তাই রেখে দিয়েছে। মায়ের বিয়ের শাড়ী কিংবা একটা লক্ষীর ঝাঁপি বেরোতো কোনো ট্রাঙ্ক থেকে । একটা ভোঁতা নেপালি কুকরিও ছিল - কে যেন বাবাকে প্রেজেন্ট করেছিল। একটা কাশ্মীরি শাল দেখেছিলাম - মা বলেছিলো ওটা নাকি খুব দামি জিনিস। কদাচিৎ সেটা ব্যবহার হতে দেখেছি  - কখনো মায়ের গায়ে আবার কখনো ঠাকুমার গায়ে - যার যখন দরকার।

যে ট্রাঙ্ক টার প্রতি আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল, সেটার মধ্যে ছিল দু একটা খেলনা। একটা পুতুল - তার সম্ভবত  একটা পা ছিল না। আর একটা পুতুল, যেটায় দম দিয়ে দিলে সে একটা বলকে মাটিতে ধাপাতে থাকতো । ওটাই ছিল আমার প্রধান আকর্ষণ। তখন তো এতো ব্যাটারিচালিত খেলনা পাওয়া যেত না - তাই দম দেয়া প্রায় অটোমেটিক সেই সমস্ত খেলনা দেখলে আর নিজেকে সামলানো যেত না। অবশ্য দম দেয়া খেলনার থেকেও বেশি আকর্ষণীয় একটা খেলনা তখন পাওয়া যেত - একরকম টিনের তৈরী মোটর বোট - ভেতরে একটা ছোট্ট প্রদীপ জ্বেলে দিলে সেটা জলের ওপর ফটফটিয়ে  চলতো। সে যাই হোক, প্রত্যেকবার ওই ট্রাঙ্কটা খোলা হলে আমার দাবিতে সেই পুতুলটা একবার চালানো হতো। আশ মিটতো না দেখে দেখে। কতবার বলেছি ওটা আমায় দিয়ে দিতে, কিন্তু কোনোবার ওটা পেতে সফল হই  নি। এছাড়াও সেই ট্রাঙ্ক থেকে বেরোতো একটা টিনের  সুটকেস - যেরকম সুটকেসে করে একসময় বাচ্ছারা স্কুলএর  বই খাতা নিয়ে যেত। সেটার ভেতরে ছিল একটা  চমৎকার ছবির বই। পড়তে শেখার পর দেখেছি তার প্রথম পাতায় লেখা ছিল :
Shilpika Mukherjee
First Prize
Class I

আর ছিল দু একটা ফ্রক - আমার সেগুলোর প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। এক জোড়া প্রায় নতুন কালো রঙের চামড়ার জুতোও ছিল।মন্দ নয় - তবে সেটা মেয়েদের জুতো বলে সেটা নিয়েও আমার কোনো লোভ ছিল না।
বছরে কমবেশি একবার এই বিশেষ ট্রাঙ্কটা  খোলা হত। বাবা ওটার কাছে বিশেষ ঘেঁষতো না। মা খুলত। তারপর খানিক্ষন বসে বসে কাঁদত। শেষমেশ কিছুক্ষণ  জিনিসপত্র রোদ্দুরে দিয়ে, ন্যাপথলিন জড়িয়ে সব আবার ট্রাঙ্ক বন্দী করে ফেলতো । তার পর সেই ট্রাঙ্ক এর ওপর অন্য একটা ট্রাঙ্ক চাপিয়ে রাখত। বুকের ওপর পাথর রাখার মতো। তারপর অনেকদিন চলতো আবার স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবন ।

আজও সেই ট্রাঙ্কটা  আমাদের শিবপুরের বাড়িতে পড়ে  আছে। শেষ খুলেছিলাম প্রায় বছর পাঁচেক আগে যখন গেছিলাম । সেই দম দেয়া পুতুলটা এখনো চলে। ইচ্ছে করলে নিয়ে নিতে পারতাম - বাবা মা কেউ নেই বাধা দেবার জন্য । কিন্তু আমার মহত্ম, যে আমি নিই নি। সব আবার গুছিয়ে তুলে রেখেছি । ওই ট্রাঙ্কটা খুলে কাঁদবার আজ আর কেউ নেই । ওগুলো ব্যবহার করার লোক তো তার আগেই হাওয়া হয়ে গেছে । কিছুদিন পর ওই ট্রাঙ্কটা খোলার লোকও থাকবে না । হয়তো কোনো পুরোনো লোহালক্কড়ের দোকানে ওটার ঠাঁই হবে । সেই দোকানদারটা জানতেও পারবে না যে ওটা খুললে একটা  চমৎকার দম দেয়া পুতুল পাওয়া যেতে পারে ।



রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...