এটা পুলুকে নিয়ে গল্প নয়| এটা হলো পুলুর গল্প নিয়ে গল্প|
ফিরে যেতে হবে পঁয়ত্রিশটা বছর পেছনে| পুলুর তখন কত বয়েস - সাত কি আট হবে! আর বুলির বয়েস আরো বছর ছয়েক বেশি| প্রায় মাসখানেক ভুগেছিল বুলি| পুলুর অবশ্য ভালই লাগত প্রথম প্রথম| দিদি স্কুল যাচ্ছে না - বেশ সময় কাটত| পুলু তো তখনো স্কুলেই ভর্তি হয় নি| কিন্তু শেষের দিকে বুলি প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে গেল| অনেকটা সময়ই তখন পুলু ওর দিদির বিছানার পাশে বসে বসে ছবির বই নাড়াচাড়া করত| বুলি বেশির ভাগ সময়ই ঘুমোতো তখন | সেদিন বিকেলের কথাটা পুলুর অল্প অল্প মনে পড়ে| এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়ে আবহাওয়াটা কিছুটা গুমোট| বুলি কিন্তু চাদর জড়িয়েই শুয়ে আছে| হঠাৎ বলে উঠলো "জানিস পুলু, আমি মনে হয় মরেই যাবো| কাল রাত্রে মা কাঁদছিল আর বাবা বলল দ্বিজেন ডাক্তার বলেছে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে| ওরা ভেবেছিল আমি ঘুমিয়ে আছি - কিন্তু আমি অনেকটাই শুনেছি ওদের কথা||
পুলু কি বুঝেছিল ভগবান জানে| মরে যাবার কথাটা শুনেছিল আগে, কিন্তু মরে গেলে ঠিক কি হয়, বা ঠিক কিভাবে মানুষ মরে যায় - এসমস্ত নিয়ে ওর কোনো ধারণা তখন ছিল না| যদিও মরার ব্যাপারটাকে বেশ ভয়ই পেত - মরে গেলে যে মানুষ ভূত হয়ে যায় এটুকু সে জানত| ভয়ে ভয়ে দিদির হাতটা চেপে ধরে বলেছিলো, "তুই মরে গেলে আমার কি হবে রে দিদি ?" বুলি কি একটু হেসেছিল তখন?
*************
তেমন কিছুই কিন্তু ওলট পালট হয় নি পুলুর জীবনে| মোটামুটি পড়াশোনা করে ব্যাঙ্কে একটা চাকরি পেয়ে গেছিল| বিয়ে-থা করে সংসারী - যদিও ছেলে মেয়ে নেই | বাবা মা দুজনেই গত হয়েছেন| সকাল নটা নাগাদ এক কৌটো টিফিন নিয়ে স্কুটার চালিয়ে অফিস যাওয়া, কিছুক্ষণ কাজ, কিছুক্ষণ আড্ডা| চার কাপ চা| গোল্ড ফ্লেক সিগারেট| মাসে দুটো সিনেমা| জামাইষষ্ঠী তে শ্বশুরবাড়ি - পরের দিন এন্টাসিড....এসব করে বেশ দিন কেটে যাচ্ছিল| বুলি বলে একটা মেয়ে যে কোনকালে এই বাড়িতে ঘুরে বেড়াত, সেটাই যেন ভুলতে বসেছিল|
সব কিছু বদলে গেল চ্যাটার্জিবাবু জয়েন করার পর| ভদ্রলোকের ছিল লেখালেখির শখ| একটা লিটল ম্যাগাজিনও চালাতেন| একদিন অফিসের সামনে হরির দোকানে চা খেতে খেতে বললেন "পল্লববাবু, আপনি তো বেশ গল্প বলেন, লেখার চেষ্টা করেন না কেন?"
"লিখেছিলাম তো একবার একটা গল্প| কিন্তু কোনো শালা ম্যাগাজিনে ছাপলো না|"
"বেশ তো, আমাকে দিন না, আমার ছায়ানটে ছেপে দেব|"
বলা বাহুল্য, ছায়ানট ওনার লিটল ম্যাগাজিনের নাম| পুলু কিন্তু ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিল| ওদিকে ছায়ানটে সম্ভবত তেমন লেখা টেখা আসছিল না, তাই চ্যাটার্জিবাবু -ই আবার মনে করিয়ে দিলেন| পুলুও খুঁজে পেতে লেখাটা বার করলো| ছায়ানটে পুলুর প্রথম গল্প বেরলো - "আজব দেশ"| চ্যাটার্জি বাবুর শালার বন্ধু নিখিল রায় মশাই এর হাতে কোনভাবে সেই লেখাটা যায়| নিখিল রায় ছিলেন "অন্য সময়" এর সম্পাদক| আর মাসিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে "অন্য সময়" যে ভালই নাম ডাক করেছে, সে আর কে না জানে!
এক রবিবার, চ্যাটার্জিবাবুর সঙ্গে নিখিল রায় এসে হাজির পুলুর বাড়িতে|
"আরে মশাই, আপনার তো লেখার হাতটি চমৎকার| অনেকটা বিভূতিবাবুর ধাঁচ, অবশ্য অমিলটাও কম নয়| লেখা থাকে তো দিন না, "অন্য সময়" লুফে নেবে|
তা লুফেই নিয়েছিল "অন্য সময়"| তিন মাসের মধ্যে দুটো ছোটগল্প বেরিয়ে গেল| নতুন লেখক পল্লব দাশগুপ্ত কে নিয়ে বেশ একটা হৈ চৈ পড়ে গেল সাহিত্য মহলে| নিখিল রায় প্রায়ই আসেন| একদিন বললেন, ছোট গল্প লিখে কিছু হবে না - বুঝলেন| এবার একটা উপন্যাসে হাত দিন| পুলু তো আকাশ হেকে পড়ল - উপন্যাস!! ব্যাঙ্কের ক্লার্ক পল্লব দাশগুপ্ত লিখবে উপন্যাস! নিখিল রায় পুলুর মনের কথাটা ধরে ফেললেন|
"আরে মশাই, এমন কিছু আহামরি ব্যাপার নয়| সুনীল গাঙ্গুলীর মুখে শুনেছি, উনি প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন স্রেফ নিজের জীবনের কোনো একটা ঘটনার সুত্র ধরে| আর একবার যদি সুত্রটা ঠিকমত ধরতে পারেন, দেখবেন যে ওটা আর সুতো নেই, একদম মোটা দড়ি| তখন ট্রাপিজের খেলা দেখিয়ে বেরিয়ে আসবেন মশাই| লেগে পড়ুন ভাই - লেগে পড়ুন|"
সেদিন রাত্রে পুলুর ঘুম এলো না| ব্যালকনি তে বসে রইলো অনেক দেরী পর্যন্ত| গোটাতিনেক সিগারেট পোড়ালো| ওর কি আর সুনীল গাঙ্গুলীর মত জীবন! এ তো একদম সাদামাটা ডাল-ভাত-চচ্চড়ি মার্কা জীবন| এই নিয়ে কি উপন্যাস হয়? সাসপেন্স নেই, রহস্য নেই, প্রেম নেই, হাসি-মজা সুখ দুঃখ কিছুই তো তেমন জোরদার নয় পুলুর জীবনে| নাঃ, ছোটোগল্পই ভালো| - একটু নামডাক হয়েছে, কয়েক হাজার টাকা উপরি পাওনা হয়েছে, আর কি চাই!
শুতে গিয়ে পুলুর হঠাত চোখ পড়ে গেল দেয়ালের ফটোটার দিকে| বুলির সঙ্গে পুলু, বাড়ির ছাদে তোলা| আচ্ছা, কতদিন হলো? অনেকগুলো বছর! কতই না খারাপ লেগেছিল প্রথম দু-একটা বছর| সময় সব ভুলিয়ে দেয়| সেবার চিড়িয়াখানায় বাঁদরের খাঁচার সামনের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল| পুরী বেড়ানোর কথাও মনে পড়ল| সেই ঢেউ এর ধাক্কায় পড়ে গিয়ে বুলির কি কান্না| এক এক করে অনেক ঘটনা মনে ভিড় করে আসতে লাগলো| ধীরে ধীরে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলো| তারপর কি স্বপ্ন দেখল, নাকি সব একে একে মনে পড়ে গেল - পুলু জানে না|
পরের দিন কোনো কারণে ছুটি ছিল| পুলু শুরু করে দিল লেখাটা| জীবনের সেই ঘটনাটা তার মনে এসে গেছে, যেখান থেকে তাকে ট্রাপিজের খেলাটা শুরু করতে হবে|
১৩ই আগস্ট, ১৯৮৫| সূর্যাস্তের আগেই ওরা বুলির ছোট্ট দেহটা নিয়ে বেরিয়ে গেছিল|........
পুলুর কলম যেন থামতেই চায় না| সেদিনের ঘটনাটা পুরো মনে পড়ে যাচ্ছে| মস্তিষ্কের কোন ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কে জানে| সমস্তটা লিখে ফেলল| এরপর? এরপর কি লিখবে সে? ১8 ই আগস্ট? কিন্তু সে তো মনে নেই? ১২ই আগস্ট মনে আছে| পেছন দিকে হাঁটলে কেমন হয়? এ তো আর সুনীল গাঙ্গুলী নয় - এ হলো পল্লব দাশগুপ্ত| চলা যাক উল্টো পথে| দু মাসের মাথায় লেখাটা শেষ করে ফেলল পুলু| ছ মাসের মধ্যে বেরিয়ে গেল "অতীতের আগে"| নিখিলবাবু কিছু ভুল ত্রূটি শুধরে নিতে বলেছিলেন, নইলে আরো আগেই বেরোত| নিখিল বাবুরই এক বন্ধু পাবলিশ করলেন বইটা| হট কেকের মত বিকোতে লাগলো "অতীতের আগে"| এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সংস্করণ|
সুপর্ণ দাসের মত পরিচালক বাড়িতে এসে নিজে কথা বললেন| সঙ্গে প্রোডিউসার| ছবি হবে| মোটা অঙ্কের অ্যাডভান্স মিলল| বছর ঘুরতে না ঘুরতে ছবি বেরোলো, এবং সুপার ডুপার হিট| পুলু কে এখন পুরো বাংলা চেনে| অনেকে শরতচন্দ্রের সঙ্গে পুলুকে তুলনা করতে শুরু করে দিয়েছে| পাবলিশারদের ভিড় বাড়িতে| রাস্তায় ঘাটে লোকে অটোগ্রাফ চায়| একটা মারুতি গাড়ী কেনা হয়েছে| বৌ খুব খুশি - বলেছে এবার থেকে মাসে চারটে করে সিনেমা দেখাতে হবে| পুলু অবশ্য ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছাড়ে নি| চ্যাটার্জিবাবুর সঙ্গে সখ্যতা অনেক বেড়ে গেছে| এখনো নিয়মিত ছায়ানটে লেখা দেয় পুলু|
কিন্তু এরপর যা ঘটল তা একদম অভাবনীয়| বম্বে থেকে জীবন মন্সুখানি এসে হাজির| অত বড় প্রোডিউসার! আর যে অঙ্কের টাকা উনি অফার করলেন, বাপের জন্মে ক্যানো , অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহের জন্মেও পুলু সেটা চিন্তা করে নি| ভদ্রলোক ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলেন| কোথায় শিখেছেন জিজ্ঞেস করতে বললেন "আরে, কি যে বোলেন পোল্লব বাবু, মুম্বাই কা ইন্ডাস্ট্রি তো বাঙ্গালী তে ভোরা"| ভদ্রলোক উপন্যাসটার অনুবাদ পড়েছেন| বললেন "নিতিন সোরকারকে দিয়ে ম্যুজিক দিলাবো| এক্কেবারে ফার্স্ট সিনে একঠো স্যাড সং|" পুলুর মনে হলো সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, কিন্তু টাকার অঙ্কটা শোনার পর আর ওসব নিয়ে ঝামেলা করলো না|
আরো একটা বছর কাটল| মানে একদম হু হু করে চলে গেল| ওর নতুন কেনা বি-এম-ডাব্লিউ গাড়ীটার মতন| স্রেফ একটা উপন্যাস থেকে মানুষ কতটা সাফল্য পেতে পারে! শ্রেষ্ট কাহিনীর জন্য ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেল পুলু| অরিজিত রাঠোরের মত অভিনেতার হাত থেকে নিতে হলো সেই অ্যাওয়ার্ড! এবার কি পুলু নোবেল পাবে?
না, নোবেল নয়, কিন্তু জ্ঞানপীঠ পেয়ে গেল পুলু| এখন কফি হাউসে প্রেসিডেন্সির ছেলে মেয়েরা পল্লব দাশগুপ্ত কে নিয়ে আলোচনা করে| নিখিল রায় একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন সেটা| ভাবলেও হাসি পায় পুলুর| ওই প্রেসিডেন্সিতেই ও এডমিশন টেস্টে ঝুলিয়ে এসেছিল সেবার|
এদিকে বাড়িতেও আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া গেছে বেড়ে| পিসিমা এসেছেন অনেকদিন পর| রাত্রে খেতে বসে বললেন "আজ বুলিটা বেঁচে থাকলে..." তারপর কান্না ভেজা গলায় কি যে বললেন বোঝা গেল না| দিদিকে বড্ড ভালবাসতেন পিসিমা|
পুলু অনেকদিন পর আবার রাত্রে বারান্দায় বসলো আজ| একটা মার্লবোরো ধরালো, এখন আর গোল্ড ফ্লেক ভালো লাগে না| শেষ মেট্রোটা চলে গেছে কিছুক্ষন আগে | রাস্তাঘাট আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে আসছে| একটা শূণ্যতা ঘিরে আসছে পুলুর মনেও| পিসিমা কি বলল? আজ বুলিটা বেঁচে থাকলে কি হত? মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথাটাও...."তুই মরে গেলে আমার কি হবে রে দিদি"....উত্তরটা পেয়ে গেছে পুলু| দিদি বেঁচে থাকলে "অতীতের আগে" বেরোত না, এত নাম ডাক, অর্থ , ফিল্ম ফেয়ার , জ্ঞানপীঠ .....নাঃ, পুলু আর ভাবতে পারছে না|
ফিরে যেতে হবে পঁয়ত্রিশটা বছর পেছনে| পুলুর তখন কত বয়েস - সাত কি আট হবে! আর বুলির বয়েস আরো বছর ছয়েক বেশি| প্রায় মাসখানেক ভুগেছিল বুলি| পুলুর অবশ্য ভালই লাগত প্রথম প্রথম| দিদি স্কুল যাচ্ছে না - বেশ সময় কাটত| পুলু তো তখনো স্কুলেই ভর্তি হয় নি| কিন্তু শেষের দিকে বুলি প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে গেল| অনেকটা সময়ই তখন পুলু ওর দিদির বিছানার পাশে বসে বসে ছবির বই নাড়াচাড়া করত| বুলি বেশির ভাগ সময়ই ঘুমোতো তখন | সেদিন বিকেলের কথাটা পুলুর অল্প অল্প মনে পড়ে| এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়ে আবহাওয়াটা কিছুটা গুমোট| বুলি কিন্তু চাদর জড়িয়েই শুয়ে আছে| হঠাৎ বলে উঠলো "জানিস পুলু, আমি মনে হয় মরেই যাবো| কাল রাত্রে মা কাঁদছিল আর বাবা বলল দ্বিজেন ডাক্তার বলেছে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে| ওরা ভেবেছিল আমি ঘুমিয়ে আছি - কিন্তু আমি অনেকটাই শুনেছি ওদের কথা||
পুলু কি বুঝেছিল ভগবান জানে| মরে যাবার কথাটা শুনেছিল আগে, কিন্তু মরে গেলে ঠিক কি হয়, বা ঠিক কিভাবে মানুষ মরে যায় - এসমস্ত নিয়ে ওর কোনো ধারণা তখন ছিল না| যদিও মরার ব্যাপারটাকে বেশ ভয়ই পেত - মরে গেলে যে মানুষ ভূত হয়ে যায় এটুকু সে জানত| ভয়ে ভয়ে দিদির হাতটা চেপে ধরে বলেছিলো, "তুই মরে গেলে আমার কি হবে রে দিদি ?" বুলি কি একটু হেসেছিল তখন?
*************
তেমন কিছুই কিন্তু ওলট পালট হয় নি পুলুর জীবনে| মোটামুটি পড়াশোনা করে ব্যাঙ্কে একটা চাকরি পেয়ে গেছিল| বিয়ে-থা করে সংসারী - যদিও ছেলে মেয়ে নেই | বাবা মা দুজনেই গত হয়েছেন| সকাল নটা নাগাদ এক কৌটো টিফিন নিয়ে স্কুটার চালিয়ে অফিস যাওয়া, কিছুক্ষণ কাজ, কিছুক্ষণ আড্ডা| চার কাপ চা| গোল্ড ফ্লেক সিগারেট| মাসে দুটো সিনেমা| জামাইষষ্ঠী তে শ্বশুরবাড়ি - পরের দিন এন্টাসিড....এসব করে বেশ দিন কেটে যাচ্ছিল| বুলি বলে একটা মেয়ে যে কোনকালে এই বাড়িতে ঘুরে বেড়াত, সেটাই যেন ভুলতে বসেছিল|
সব কিছু বদলে গেল চ্যাটার্জিবাবু জয়েন করার পর| ভদ্রলোকের ছিল লেখালেখির শখ| একটা লিটল ম্যাগাজিনও চালাতেন| একদিন অফিসের সামনে হরির দোকানে চা খেতে খেতে বললেন "পল্লববাবু, আপনি তো বেশ গল্প বলেন, লেখার চেষ্টা করেন না কেন?"
"লিখেছিলাম তো একবার একটা গল্প| কিন্তু কোনো শালা ম্যাগাজিনে ছাপলো না|"
"বেশ তো, আমাকে দিন না, আমার ছায়ানটে ছেপে দেব|"
বলা বাহুল্য, ছায়ানট ওনার লিটল ম্যাগাজিনের নাম| পুলু কিন্তু ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিল| ওদিকে ছায়ানটে সম্ভবত তেমন লেখা টেখা আসছিল না, তাই চ্যাটার্জিবাবু -ই আবার মনে করিয়ে দিলেন| পুলুও খুঁজে পেতে লেখাটা বার করলো| ছায়ানটে পুলুর প্রথম গল্প বেরলো - "আজব দেশ"| চ্যাটার্জি বাবুর শালার বন্ধু নিখিল রায় মশাই এর হাতে কোনভাবে সেই লেখাটা যায়| নিখিল রায় ছিলেন "অন্য সময়" এর সম্পাদক| আর মাসিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে "অন্য সময়" যে ভালই নাম ডাক করেছে, সে আর কে না জানে!
এক রবিবার, চ্যাটার্জিবাবুর সঙ্গে নিখিল রায় এসে হাজির পুলুর বাড়িতে|
"আরে মশাই, আপনার তো লেখার হাতটি চমৎকার| অনেকটা বিভূতিবাবুর ধাঁচ, অবশ্য অমিলটাও কম নয়| লেখা থাকে তো দিন না, "অন্য সময়" লুফে নেবে|
তা লুফেই নিয়েছিল "অন্য সময়"| তিন মাসের মধ্যে দুটো ছোটগল্প বেরিয়ে গেল| নতুন লেখক পল্লব দাশগুপ্ত কে নিয়ে বেশ একটা হৈ চৈ পড়ে গেল সাহিত্য মহলে| নিখিল রায় প্রায়ই আসেন| একদিন বললেন, ছোট গল্প লিখে কিছু হবে না - বুঝলেন| এবার একটা উপন্যাসে হাত দিন| পুলু তো আকাশ হেকে পড়ল - উপন্যাস!! ব্যাঙ্কের ক্লার্ক পল্লব দাশগুপ্ত লিখবে উপন্যাস! নিখিল রায় পুলুর মনের কথাটা ধরে ফেললেন|
"আরে মশাই, এমন কিছু আহামরি ব্যাপার নয়| সুনীল গাঙ্গুলীর মুখে শুনেছি, উনি প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন স্রেফ নিজের জীবনের কোনো একটা ঘটনার সুত্র ধরে| আর একবার যদি সুত্রটা ঠিকমত ধরতে পারেন, দেখবেন যে ওটা আর সুতো নেই, একদম মোটা দড়ি| তখন ট্রাপিজের খেলা দেখিয়ে বেরিয়ে আসবেন মশাই| লেগে পড়ুন ভাই - লেগে পড়ুন|"
সেদিন রাত্রে পুলুর ঘুম এলো না| ব্যালকনি তে বসে রইলো অনেক দেরী পর্যন্ত| গোটাতিনেক সিগারেট পোড়ালো| ওর কি আর সুনীল গাঙ্গুলীর মত জীবন! এ তো একদম সাদামাটা ডাল-ভাত-চচ্চড়ি মার্কা জীবন| এই নিয়ে কি উপন্যাস হয়? সাসপেন্স নেই, রহস্য নেই, প্রেম নেই, হাসি-মজা সুখ দুঃখ কিছুই তো তেমন জোরদার নয় পুলুর জীবনে| নাঃ, ছোটোগল্পই ভালো| - একটু নামডাক হয়েছে, কয়েক হাজার টাকা উপরি পাওনা হয়েছে, আর কি চাই!
শুতে গিয়ে পুলুর হঠাত চোখ পড়ে গেল দেয়ালের ফটোটার দিকে| বুলির সঙ্গে পুলু, বাড়ির ছাদে তোলা| আচ্ছা, কতদিন হলো? অনেকগুলো বছর! কতই না খারাপ লেগেছিল প্রথম দু-একটা বছর| সময় সব ভুলিয়ে দেয়| সেবার চিড়িয়াখানায় বাঁদরের খাঁচার সামনের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল| পুরী বেড়ানোর কথাও মনে পড়ল| সেই ঢেউ এর ধাক্কায় পড়ে গিয়ে বুলির কি কান্না| এক এক করে অনেক ঘটনা মনে ভিড় করে আসতে লাগলো| ধীরে ধীরে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলো| তারপর কি স্বপ্ন দেখল, নাকি সব একে একে মনে পড়ে গেল - পুলু জানে না|
পরের দিন কোনো কারণে ছুটি ছিল| পুলু শুরু করে দিল লেখাটা| জীবনের সেই ঘটনাটা তার মনে এসে গেছে, যেখান থেকে তাকে ট্রাপিজের খেলাটা শুরু করতে হবে|
১৩ই আগস্ট, ১৯৮৫| সূর্যাস্তের আগেই ওরা বুলির ছোট্ট দেহটা নিয়ে বেরিয়ে গেছিল|........
পুলুর কলম যেন থামতেই চায় না| সেদিনের ঘটনাটা পুরো মনে পড়ে যাচ্ছে| মস্তিষ্কের কোন ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কে জানে| সমস্তটা লিখে ফেলল| এরপর? এরপর কি লিখবে সে? ১8 ই আগস্ট? কিন্তু সে তো মনে নেই? ১২ই আগস্ট মনে আছে| পেছন দিকে হাঁটলে কেমন হয়? এ তো আর সুনীল গাঙ্গুলী নয় - এ হলো পল্লব দাশগুপ্ত| চলা যাক উল্টো পথে| দু মাসের মাথায় লেখাটা শেষ করে ফেলল পুলু| ছ মাসের মধ্যে বেরিয়ে গেল "অতীতের আগে"| নিখিলবাবু কিছু ভুল ত্রূটি শুধরে নিতে বলেছিলেন, নইলে আরো আগেই বেরোত| নিখিল বাবুরই এক বন্ধু পাবলিশ করলেন বইটা| হট কেকের মত বিকোতে লাগলো "অতীতের আগে"| এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সংস্করণ|
সুপর্ণ দাসের মত পরিচালক বাড়িতে এসে নিজে কথা বললেন| সঙ্গে প্রোডিউসার| ছবি হবে| মোটা অঙ্কের অ্যাডভান্স মিলল| বছর ঘুরতে না ঘুরতে ছবি বেরোলো, এবং সুপার ডুপার হিট| পুলু কে এখন পুরো বাংলা চেনে| অনেকে শরতচন্দ্রের সঙ্গে পুলুকে তুলনা করতে শুরু করে দিয়েছে| পাবলিশারদের ভিড় বাড়িতে| রাস্তায় ঘাটে লোকে অটোগ্রাফ চায়| একটা মারুতি গাড়ী কেনা হয়েছে| বৌ খুব খুশি - বলেছে এবার থেকে মাসে চারটে করে সিনেমা দেখাতে হবে| পুলু অবশ্য ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছাড়ে নি| চ্যাটার্জিবাবুর সঙ্গে সখ্যতা অনেক বেড়ে গেছে| এখনো নিয়মিত ছায়ানটে লেখা দেয় পুলু|
কিন্তু এরপর যা ঘটল তা একদম অভাবনীয়| বম্বে থেকে জীবন মন্সুখানি এসে হাজির| অত বড় প্রোডিউসার! আর যে অঙ্কের টাকা উনি অফার করলেন, বাপের জন্মে ক্যানো , অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহের জন্মেও পুলু সেটা চিন্তা করে নি| ভদ্রলোক ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলেন| কোথায় শিখেছেন জিজ্ঞেস করতে বললেন "আরে, কি যে বোলেন পোল্লব বাবু, মুম্বাই কা ইন্ডাস্ট্রি তো বাঙ্গালী তে ভোরা"| ভদ্রলোক উপন্যাসটার অনুবাদ পড়েছেন| বললেন "নিতিন সোরকারকে দিয়ে ম্যুজিক দিলাবো| এক্কেবারে ফার্স্ট সিনে একঠো স্যাড সং|" পুলুর মনে হলো সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, কিন্তু টাকার অঙ্কটা শোনার পর আর ওসব নিয়ে ঝামেলা করলো না|
আরো একটা বছর কাটল| মানে একদম হু হু করে চলে গেল| ওর নতুন কেনা বি-এম-ডাব্লিউ গাড়ীটার মতন| স্রেফ একটা উপন্যাস থেকে মানুষ কতটা সাফল্য পেতে পারে! শ্রেষ্ট কাহিনীর জন্য ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেল পুলু| অরিজিত রাঠোরের মত অভিনেতার হাত থেকে নিতে হলো সেই অ্যাওয়ার্ড! এবার কি পুলু নোবেল পাবে?
না, নোবেল নয়, কিন্তু জ্ঞানপীঠ পেয়ে গেল পুলু| এখন কফি হাউসে প্রেসিডেন্সির ছেলে মেয়েরা পল্লব দাশগুপ্ত কে নিয়ে আলোচনা করে| নিখিল রায় একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন সেটা| ভাবলেও হাসি পায় পুলুর| ওই প্রেসিডেন্সিতেই ও এডমিশন টেস্টে ঝুলিয়ে এসেছিল সেবার|
এদিকে বাড়িতেও আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া গেছে বেড়ে| পিসিমা এসেছেন অনেকদিন পর| রাত্রে খেতে বসে বললেন "আজ বুলিটা বেঁচে থাকলে..." তারপর কান্না ভেজা গলায় কি যে বললেন বোঝা গেল না| দিদিকে বড্ড ভালবাসতেন পিসিমা|
পুলু অনেকদিন পর আবার রাত্রে বারান্দায় বসলো আজ| একটা মার্লবোরো ধরালো, এখন আর গোল্ড ফ্লেক ভালো লাগে না| শেষ মেট্রোটা চলে গেছে কিছুক্ষন আগে | রাস্তাঘাট আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে আসছে| একটা শূণ্যতা ঘিরে আসছে পুলুর মনেও| পিসিমা কি বলল? আজ বুলিটা বেঁচে থাকলে কি হত? মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথাটাও...."তুই মরে গেলে আমার কি হবে রে দিদি"....উত্তরটা পেয়ে গেছে পুলু| দিদি বেঁচে থাকলে "অতীতের আগে" বেরোত না, এত নাম ডাক, অর্থ , ফিল্ম ফেয়ার , জ্ঞানপীঠ .....নাঃ, পুলু আর ভাবতে পারছে না|