Wednesday, May 9, 2018

টি কে ডাক্তারবাবু

ডাঃ টি কে দাশগুপ্ত| এই নামেই ওনাকে জানতাম| প্রায় চল্লিশ বছর পরে জেনেছিলাম ওনার পুরো নাম| উনিই ছিলেন আমাদের গৃহ চিকিৎসক| যদিও আমাদের গৃহে ওনাকে কখনো আসতে হয় নি| তবে নতুন পল্লীর দিকে গেলে, ওনার সুবিশাল গৃহটি বাইরে থেকে দেখেছি| সেটা দেখে আমার মনে হয়েছিল যে ওনার ডাক্তারি করাটা স্রেফ সময় কাটানো বা শখ মেটানোর জন্য| অর্থের প্রয়োজন তেমন আর নেই| ওনার অন্য একটা পরিচয়ও  ছিল, যা তখন জানতাম না| সেকথা পরে লিখছি।

সেযুগে সবাইকে বছরে একবার বসন্তের টিকে নিতে হত| বাড়ি বাড়ি লোক এসে সেই যন্ত্রণা দিয়ে যেত|আমাদের ধারণা ছিল, টি কে ডাক্তারবাবু, ডাক্তার হবার আগে বোধয় টিকে দেবার কাজ করতেন - তাই ওই নাম|

চেম্বার টা ছিল বেতাইতলা বাজারের কাছে| ঝর্না  সিনেমার উল্টোদিক বরাবর| আশেপাশে আরো দু একটা দোকান ছিল - কিসের দোকান - সেসব আজ আর মনে নেই| শুধু মনে আছে, কেশায়নী  নামে একটা সেলুন ছিল আর একটা ডেকরেটরের অফিস ছিল কাছাকাছি| ঠিক উল্টোদিকে ছিল একটা ঘড়ি সারাই এর দোকান| মালিকের নাম দেববাবু| এসব সেই সত্তর দশকের কাহিনী|
চেম্বার বলতে মেন রাস্তার ওপরে একটা ১০ ফিট বাই ১০ ফিট ঘর| সামনেই ডানদিকে একটা মাঝারি কাঠের টেবিল| পেছন দিকটায় ডাক্তারবাবুর চেয়ার আর সামনে দুটো চেয়ার - একটা রুগীর আর অন্যটা রুগীর সঙ্গীর| ঘরের দু পাশে দুটো কাঠের বেঞ্চ পাতা - একদম সস্তার স্কুলে যেরকম বেঞ্চ হয় - তেমনি| ঘরটার সামনের বারান্দাতেও দুটো বেঞ্চ পাতা থাকত - রুগী বেশি হলে তারা সেখানে বসে বসে রাস্তার ধুলো শুঁকত| ডাক্তারবাবুর বসার জায়গার ঠিক পেছনেই ছিল দুটো কাঠের আলমারি - তাতে নানান ওষুধ ঠাসা| এই আলমারিগুলোর  পেছনে ছিল ওনার কাজের জায়গা - সেখানে উনি খলনুড়ি দিয়ে কিসব গুঁড়ো  করে তার মধ্যে নানান রঙিন তরল পদার্থ ঢেলে অখাদ্য সব মিক্সচার বানাতেন| সেসময় ঠুং  ঠাং করে নানারকম অওয়াজ পাওয়া যেত| তারপর একটা কাঁচের শিশিতে সেই মিক্সচার ঢেলে, বাইরে একটা কাগজের খাঁজকাটা ফালি লাগিয়ে নিয়ে আসতেন| আমরা জানতাম ওসব হলো দাগ দেওয়া ওষুধ| কখন ক'দাগ খেতে হবে সব উনি বলে দিতেন|  আমরাও বাড়িতে কাগজ কেটে ঐরকম 'দাগ' বানাতে শিখেছিলাম| আর এই ল্যাবরেটরির পাশেই একফালি জায়গা পার্টিশন করা ছিল - সেখানে রুগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন|
ওনার ফী ছিল ২ টাকা| সেযুগের হিসেবেও হয়ত খুব -ই সস্তা| অবশ্য ওষুধের দাম আলাদা দিতে হত|
ভালই ভিড় হত| গরিব মানুষই বেশি| তাদের থেকে আরো কম ফী নিতেন| তখন বুঝতাম না সেই গরিব মানুষগুলোর থেকে আমরাও  খুব একটা বেশি ধনী ছিলাম না| সেকালে ছোটরা পয়সা কড়ির ব্যাপারে তেমন খোঁজ খবর রাখত না সবাই| তবে ডাক্তারবাবু ধনী গরিব নির্বিশেষে, সকলকেই খুব যত্ন নিয়ে চিকিৎসা করতেন, সেটা খানিকটা বুঝতাম|
সকাল দশটা নাগাদ উনি সাইকেল চড়ে আসতেন| রাত্রের দিকেও চেম্বার খুলতেন একবার| একদম পাটভাঙ্গা একটা ফুলহাতা সাদা শার্ট আর স্লেট রঙের প্যান্ট ই ছিল বেশির ভাগ দিনের পোশাক| শার্ট এর হাতাটা কনুই অবধি গোটানো থাকত আর বুকপকেটে  থাকত একটা ভালো ফাউন্টেন পেন|  চশমা পরতেন কিনা মনে পড়ছে না| গলার কাছে কি একটা কন্ঠী দেখেছিলাম? সেটাও ঠিক মনে নেই| পায়ে থাকত বাদামী রঙের স্যান্ডেল| গ্রীষ্মের দিনে মাথায় একটা ফেল্ট হ্যাট| মাথার পেছন দিকে সামান্য পাকা চুল ছিল - বাকিটা টাক| হালকা সাদা গোঁফ| রোগা পাতলা চেহারা| হাইট -  মেরে কেটে সাড়ে পাঁচ ফিট|
উনি আসার আগেই ওনার হেল্পার এসে যেত| সে ডাক্তারখানা খুলে, ধুলো টুলো ঝেড়ে, ক্যালেন্ডারের দিনক্ষণ সব ঠিক করে রাখত| উনি এলেই সে গিয়ে ওনার সাইকেলটা বারান্দায় তুলে দিয়ে চাবি দিয়ে দিত|
ডাক্তারবাবুর  সঙ্গের ব্যাগ এ থাকত ওনার অস্ত্রশস্ত্র, অর্থাৎ  - প্রেসার মাপার যন্ত্র, স্টেথোস্কপ আর থার্মোমিটার| শেষের দুটো অস্ত্র উনি সব রুগীর ওপরেই  প্রয়োগ করতেন| তারপর চোখের নীচটা টেনে দেখতেন| ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে পেট পিঠ পরীক্ষা করতেন| জিভ বার করতে বলতেন| জিভ  ভেঙিয়ে ওনাকে কিছুতেই সন্তুষ্ট করা যেত না| কালী ঠাকুর এলেও বোধহয় উনি বলতেন "না না - আরো লম্বা করে বার  করে 'অ্যাঅ্যা' বল|"
এবার উনি বসতেন চিন্তা করতে| বোধহয় মনে মনে ভাবতেন কতটা বিস্বাদ ওষুধ এ ব্যাটা সহ্য করতে পারবে! সেই সময় উনি টেবিলের ওপর কনুই দুটো রেখে হাতের তালুদুটো দিয়ে কপালের দুপাশটা চেপে ধরতেন| চোখ বন্ধ থাকত| ঠোঁটের কোনে একটা মুচকি হাসি| ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে নিজের টাকের ওপর একটু তবলা বাজাতেন| তারপর খসখস করে বহু ওষুধ লিখে ফেলতেন| এর মধ্যে মিক্সচার গুলো নিজেই বানিয়ে দিতেন সেকথা আগেই বলেছি|
কখনো তেমন রেগে যেতে দেখি নি। শুধু একদিন খুব রেগে গিয়েছিলেন ওই ঘড়ির দোকানের দেববাবুর ওপর| তখন দুপুর প্রায় ১২ টা হবে| আমার সর্দি কমছিল না বলে দেখাতে গিয়েছিলাম| অন্য রুগী ছিল, আমি বসে বসে রাস্তার বাস গুনছিলাম কিম্বা ঝর্না  সিনেমার পোস্টার দেখছিলাম| হঠাৎ দেববাবু রাস্তা পেরিয়ে এসে বেঞ্চে  বসে হাঁফাতে লাগলেন| "কি হলো মশাই" বলে ডাক্তারবাবু এগিয়ে গেলেন| দেববাবুর বক্তব্য বদহজম হয়ে গ্যাস হয়ে গেছে - শরীরটা ঠিক ভালো লাগছে না| প্রেসার পরীক্ষা হলো| তারপর নাড়ি দেখা, স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পিঠ দেখা, চোখ টেনে টেনে দেখা এসমস্ত করে ডাক্তারবাবু বললেন "ভালো বুঝছি না| ছেলেকে বলুন দোকান বন্ধ করে আমার কাছে আসতে আর আপনি সাইকেল রেখে, একটা রিক্সা করে এক্ষুনি বাড়ি চলে যান|" দেবাবাবু  গাঁই গুঁই করতে লাগলেন "আরে  না না - একটু গ্যাস হয়ে গেছে..."| কথাটা শেষ করতে পারলেন না| ডাক্তারবাবুকে জীবনে প্রথমবার (এবং শেষবার) ক্ষেপে যেতে দেখলাম - "রাখুন মশাই আপনার গ্যাস| যা বলছি তাই করুন|" ওই একদিনই ওনাকে রাগে কাঁপতে দেখেছিলাম| দুদিন পর জানলাম, দেববাবুর হার্ট এটাক হয়েছিল| সম্ভবত এর কিছুদিন পরেই দেববাবু মারা যান|

অনেকটা বড় হবার পর ডাক্তারবাবুর  দ্বিতীয় পরিচয়টা জেনেছিলাম| উনি ছিলেন, স্বনামধন্য চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর বাবা| এই কিছুদিন আগে, বুদ্ধদেববাবুর একটা ইন্টারভিউ পড়তে পড়তে টি কে ডাক্তারবাবুর সম্বন্ধে আরো কিছু জানতে পারলাম| প্রথম দিকে উনি ছিলেন রেলের ডাক্তার| খড়গপুরে  অনেকদিন ছিলেন| তারপর নানা জানা অজানা জায়গায় পোস্টিং হয়| এমন জায়গাতেও ছিলেন, যেখানে রাতে বাঘ বেরোত| হাসপাতাল বলতে কিছুই ছিল না আর উনিই ছিলেন সর্বেসর্বা| স্থানীয় লোকজন ওনাকে ভালবাসত, শ্রদ্ধা করত|
মনে হয়, গ্রামের মানুষ তাদের শ্রদ্ধা ভালবাসা ঠিক জায়গাতেই দিয়েছিল| ভারী নিরহঙ্কার আর পরোপকারী মানুষ ছিলেন টি কে ডাক্তারবাবু| আমার মনের আকাশের একটি তারা| হ্যাঁ, ওনার পুরো নাম ছিল তারা কান্ত দাশগুপ্ত - যেটা আমি বুদ্ধদেববাবুর ইন্টারভিউ পড়ে কয়েকদিন আগেই  জানলাম|




Tuesday, May 8, 2018

ফ্ল্যাশব্যাক

মানুষ নাকি মৃত্যুর ঠিক আগে একটা ফ্ল্যাশব্যাক দেখে| কোথাও একথাটা পড়েছিলেন ভোলাবাবু| মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে শুরু হয় সিনেমাটা| একদম ছোটবেলা থেকে শেষ বয়েস পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাই ওপর ওপর দেখানো হয় সেই সিনেমাটাতে| কিছু কিছু প্রায় বিস্মৃত ঘটনাও দেখতে পাওয়া যায় একদম পরিষ্কার| তবে খুব তাড়াতাড়ি এসমস্ত ঘটে যায়| পাঁচ মিনিটের মধ্যে হয়ত পঞ্চাশ বছরের ফ্ল্যাশব্যাক দেখানো হয়| যদিও যে দেখে, তার মনেই হয় না যে এটা ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে দেখানো হচ্ছে| সে সাধারণ বেগেই সমস্তকিছু দেখে| বোধহয় মনটা তখন খুব দ্রুতগামী হয়ে যায় তাই সেই ক্লাস নাইনের রিলেটিভ ভেলোসিটির অঙ্কগুলোর মতো সিনেমার বেগটা অপেক্ষিক ভাবে তেমন বেশি দেখায় না|

বিজ্ঞান এর কথা এখন থাক, কারণ ভোলাবাবু মরতে বসেছেন| দোষটা খানিকটা ওনার নিজেরই| বাড়ির লোকজন সব সিনেমা দেখতে গেছে| ওনার শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে যান নি| বিছানায় শুয়ে শুয়ে  ডিসকভারি চ্যানেল দেখছিলেন| হাঁপানী রোগের ওপর কিছু একটা অনুষ্ঠান| ইনহেলার বেশি ব্যবহার করলে কি ঘটতে পারে - আফ্রিকার চিতাবাঘ গুলো দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে গেলেও ওদের কেন  ইনহেলার এর প্রয়োজন হয় না - মাছেদের হাঁপানীকে কি বলে - এই সমস্ত| আসলে নিজে হাঁপানী রুগী বলে, দেখতে বেশ ভালই লাগছিল| হঠাৎ করেই কেমন যেন হাঁফ ধরে উঠলো| টিভিটা বন্ধ করে দিলেন| অভ্যাসবশত পাশের টেবিলটা হাতড়ালেন| নাঃ, ইনহেলারটা  ওখানে নেই|  হাঁপানীটা খুব তাড়াতাড়ি বাড়ছে| বালিশের নিচেও নেই| তবে কি মাটিতে পড়ে গেল? কিন্তু নিচেও তো দেখা যাচ্ছে না| ভোলাবাবুর দম বন্ধ হয়ে আসছে| কাউকে ফোন করেও লাভ নেই - অতটা সময় যে পাওয়া যাবে না সেটা  বেশ বুঝতে পারছেন| পাশের বাড়ির ঘোষেদের ফোন নম্বরটা রাখার কথা বলেছিলো সুমিত সেদিন| কেন যে গড়িমসি করে সেটা করতে ভুলে গেলেন - ভেবে নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছিল| ছোটবেলা থেকেই ভুলে যাওয়ার এই ব্যামো ভোলাবাবুর| সেই জন্যই তো অনিকেত রায়চৌধুরীর ঠাকুমা ওনাকে ভোলা বলে ডাকা শুরু করেছিলেন| পরে  অবশ্য সবাই ওই নামেই ডাকত| মায় অফিস কলিগরা পর্যন্ত বি আর চৌধুরী বলেই ওনাকে জানত| ফাজিল একটা ছোকরা ওনাকে ভাল্লুকদা  বলত - বি আর থেকে বিয়ার আর তার থেকে ভাল্লুক|
আবার মনে করার চেষ্টা করলেন ইনহেলারটা কোথায়! এই তো এক  ঘন্টা আগেই পার্ক থেকে ঘুরে এলেন| এসেই সোজা নিজের ঘরে| আর কোত্থাও যান নি| টেবিলেই তো রাখার কথা| আরো একবার টেবিলটা দেখলেন| টেবিলের ড্রয়ারটা খুলেও হাঁটকালেন দুবার| ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে শ্বাসকষ্টটা|
ঠিক এই সময় শুরু হয়ে গেল ফ্ল্যাশব্যাক| ওই তো ছোট্ট ভোলা হাঁটবার চেষ্টা করছে| ওই তো পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গ্যালো| ইস, তখন যদি দেখতে পেতেন যে পেছনেই একটা তোষক পাতা ছিলো! এইবার ক্লাস ফোরের অঙ্ক পরীক্ষা| পেন্সিলএর শিষটা ভেঙ্গে গেল| এহে, কত সহজ একটা গসাগু ভুল করলেন ভোলাবাবু| ফ্লাশব্যাক এগিয়ে চলেছে| ভোলাবাবু মনে মনে হিসেব করলেন, শেষের দিকে উনি দেখতে পাবেন ইনহেলারটা কোথায় আছে| সঙ্গে সঙ্গে সেটা মুখে নিয়ে  আঙুলের চাপ দিতে হবে| দেরী করলেই অক্কা! আর শ্বাস নিতে পারছেন না উনি| একেই কি বলে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা?
এখন ভোলাবাবুর কলেজের থার্ড ইয়ারের পরীক্ষাটা চলছে| পাশের ছেলের দেখে টোকবার সময় স্যার এসে চেপে ধরেছেন| ধুস, দরজার দিকটা একবার দেখে নেওয়া উচিত ছিল| ভোলাবাবু অফিস এ লেট মার্ক হলেন - আগের বাসটা না ছাড়লেই হত! এখন আর এসব দেখে কি লাভ! মন দিয়ে কিছুই আর দেখছেন না উনি| এই সময় সুস্থ থাকলে হয়ত একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ত| কিন্ত যা অবস্থা, হ্রস্ব  বা দীর্ঘ কোনো শ্বাসই আর বেরোচ্ছে না| ক্রমশ সিনেমাটা শেষ হয়ে আসছে| ভোলাবাবুও শেষ হয়ে আসছেন| ভোলাবাবু পার্কে যাবার সময় টেবিল থেকে ইনহেলারটা তুলে পকেটে  ভরলেন| এবার ভোলাবাবু পার্ক থেকে বাড়ি ফিরলেন| সোজা বিছানায়| জামাকাপড় বদলান নি - সেই প্যান্ট আর ফতুয়া| অর্থাৎ পকেটেই আছে ওটা| ফতুয়ার ডান পকেটে দেখলেন, নেই| ভোলাবাবুর সিনেমা প্রায় শেষ| মৃত্যুর আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি| অতি কষ্টে প্যান্টের ডান পকেটে হাত ঢোকালেন| সেখানে শুধুই রুমালটা| খুব রাগ হলো নিজের ওপর| এই তো, একটু আগেই দেখাচ্ছিল উনি ওটা পকেটে ভরছেন| তখন যদি একটু মন দিয়ে দেখতেন, তাহলেই ঝামেলা মিটে যেত|  সিনেমা শেষ|
রাত্রে বাড়ির লোকজন দরজা ভেঙ্গে ঢুকে দেখল ভোলাবাবু বাঁ হাতটা প্যান্টের বাঁদিকের পকেটে ঢুকিয়ে দেহত্যাগ করেছেন| ফতুয়ার বাঁ পকেট থেকে ইনহেলারটা পাওয়া গিয়েছিল|

Wednesday, March 14, 2018

নয়ে ডয়ে

না, আমি নয়ডায় থাকলেও এ লেখা টা নয়ডা নিয়ে নয়| এ লেখা "নয়ে ডয়ে" নিয়েই|

আমার সহজ পাঠ পড়তে বেশ ভালো লাগে| বেশ সহজ সরল লেখা| গল্প আর কবিতা গুলো যেন ছবির মত চোখের সামনে ফুটে ওঠে - তা সে বিশম্ভর বাবুর পালকি ভেঙ্গে যাবার গল্পই হোক বা সেই কবিতাটা, যেটায় "স্টিমার আসিছে ঘটে"|

কিন্তু "নয়ে ডয়ে"র ব্যবহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বড়ই অল্প লিখেছেন| ওই "রেভারেন্ড এন্ডারসন", পন্ডিতমশাই আর কুন্ডু - ব্যাস| তার মধ্যে তো দুটো শব্দ বাংলা অভিধানে পাওয়াই যাবে না|

অথচ কি সম্ভাবনাটাই না ছিল এই 'ন্ড' - এর! এই তো, আমাদের পাড়ার ব্যান্ড পার্টির নেতা পান্ডাদার বাড়ি অন্ডালের  কাছে| চেহারাটা তেমন ষন্ডা না হলেও, মনের খুব জোর|   নইলে  ঠান্ডার সময় স্রেফ একটা স্যান্ডো  গেঞ্জি পরে কেউ পিন্ডারি বেড়াতে যায়? এক কমন্ডলু ভরে উষ্ণ কুন্ডের জল এনেছিলেন সেবার| উনি আবার জেমস বন্ড এর মত গাড়ী চালান - হন্ডা গাড়ী যদিও| একবার  তো পাহাড় থেকে গাড়ী সমেত উল্টে নিচের নদীতে ল্যান্ড করেছিলেন | মুন্ডুতে খুব আঘাত লেগেছিল, হৃৎপিণ্ড থেমে যায় খানিক্ষন| টোটকা ওষুধের মন্ড খাইয়ে বাঁচিয়ে তুলেছিল গ্রামের লোকেরা|
নেশার মধ্যে দুটো - তেন্ডুলকারের ব্যাটিং দ্যাখা আর একটু চন্ডু-চরস সেবন| ভদ্রলোক ইংরাজীটাও মোটামুটি জানেন| সেদিন বললেন গ্যান্ডার মানে গন্ডার নয়|
খাওয়া দাওয়া নিয়ে তেমন ঝামেলা নেই ওনার |  প্রায় নিরামিষাশী - শুধু আন্ডা-কারী পেলে একটু খান| আসলে এক  কান্ড হয়েছিল একবার - মাংসের একটা বড় খন্ড গলায় আটকে যায়| তখন উনি টুন্ডলায় থাকতেন| ওখানকার  ডাক্তারটা ছিল ভারী পাষন্ড| একেবারে চন্ডাল যাকে বলে - বললে আগে পয়সা দিন| এদিকে পান্ডাদার গন্ডদেশে তখন প্রচন্ড ব্যাথা|শেষমেষ গন্ডাখানেক পাঁচশ টাকার নোট  দন্ড দিতে হল| এই সময় কিছু গুন্ডা ধরনের লোক ডাক্তারখানা লন্ডভন্ড করে দ্যায়| ডান্ডা মেরে ঝন্ডু  বামের অনেকগুলো শিশি ভেঙ্গে দিয়েছিল ওরা| তান্ডব থামার পর ডাক্তার ওষুধ দ্যান| এরপর থেকে পান্ডাদা শুধু  মন্ডা মিঠাই পেলে গান্ডেপিন্ডে খেয়ে ফেলেন - আর কিছু খান না|

Tuesday, February 27, 2018

ড্রাইভার সাহেব

এদিকটা বেশ ফাঁকামেলা| সেদিন অফিসের সামনে দেখি একটা দামী Audi গাড়ী দাড়িয়ে| তার ডিকির ওপর একটা চাদর বেছানো| সেই চাদরের ওপর খোলা হয়েছে একটা টিফিন কৌটো | রুটি, তরকারী, ডাল, আচার আর একটা বোতল ভর্তি লস্সি| ড্রাইভার সাহেবের লাঞ্চ হচ্ছে|

মনে হল, আমি এরকম কেন ভাবছি! এমন ও তো হতে পারে যে ওই লোকটাই এই গাড়ির মালিক!  সে যেভাবে খুশি, যেখানে খুশি লাঞ্চ করুক - কার কি আসে যায়? আসলে ছোটবেলা থেকে মন ভাবতে শিখেছে যে এরকম গাড়ীর  মালিকরা একটু দামী রেষ্টুরেন্ট ছাড়া খেতেই পারেন না|  কিন্তু উল্টো ও যে হয় তার প্রমান তো পাশের পানের দোকানটাতেই উপস্থিত| দোকানের মালিক এর নাম সন্দীপ| দেওঘরের ছেলে| এদেশে এসে নানান ব্যবসা ফেঁদে বসেছে| একদিন কথায় কথায় ওর নানা সাফল্যের গল্প শুনে বললাম "আর কি? এবার একটা গাড়ী কিনে ফেল| একটা ন্যানো বুক করে দাও|"
সন্দীপ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো কিছুক্ষণ| তারপর বলল "গাড়ী তো হ্যায় স্যার! এক স্করপিও আউর এক আইনোভা খরিদ লিয়া| এক ছোটা ট্রাক ভি খরিদা| রেন্ট পে লাগা দিয়া সব|" আমি আর মুখ লুকানোর জায়গা পাই না| সেই কলেজ জীবনে শুনেছিলাম কথাটা "কোথায় খাপ  খুলেছ শিবাজী - এ যে পলাশীর প্রান্তর|"

এরপর একদিন দেখলাম সন্দীপকে নিজের ট্রাক নিয়ে - ড্রাইভার সাহেবের বেশে| ড্রাইভার সাহেব কথাটা যদিও আমাদের দেশে ব্যবহার করা হয় কিন্তু আমি কোনদিন এদেশে কোনো সাহেব ড্রাইভারকে দেখি নি| বোধহয় ব্রিটিশ আমলে যখন এদেশে প্রথম গাড়ী এসেছিল তখন শুধু সাহেবরাই ড্রাইভ করত|

আমার বেড়ানোর খুব সখ| এক সময় ট্রেনে বাসে অনেক ঘুরেছি| বেশ কয়েকবছর চাকরি করার পর গাড়িতে ঘোরার ক্ষমতা হলো| কিন্তু নিজের গাড়িতে তো আর বেশিদূর যাই না - বড়জোর তিন চারশো কিলোমিটার| আমাদের দেশের রাস্তাঘাট বিদেশের মত অত ভালো এখনো হয় নি| তাছাড়া আমাদের দেশের রেলগাড়ির কোনো জবাব নেই| আজকাল আবার প্লেনের ভাড়াও অনেকটা সাধ্যের মধ্যে এসে গেছে| সবচেয়ে বড় কথা, নিজের গাড়িতে গেলে নতুন মানুষের সঙ্গে গল্প হবে কি করে?

তবে আমাদের দেশের ড্রাইভারদের মত কেউ গল্প করতে পারে না| বিদেশের ড্রাইভার রা কেমন যেন মুখচোরা| যেন কেউ ওদের কথা বলতে বারণ করে দিয়েছে| অবশ্য সবাই নয়| যারা কোনো না কোনো গরিব দেশ থেকে এসেছে, তারা তাও কথাবার্তা বলে| ডারহাম শহরে আলাপ হয়েছিল জন এর সঙ্গে| আদি নিবাস কোথায় জানতে চাইলাম| বলল সোমালিয়া| সর্বনাশ করেছে - জলদস্যুর ট্যাক্সি তে চড়ে চলেছি নাকি? হয়ত আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই সে বলল, সে নাকি মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার| সাংহাই থেকে পাশ করে আমেরিকা চলে এসেছে| তারপর ইঞ্জিনিয়ার সাহেব যে কি করে ড্রাইভার সাহেব হয়ে গেলেন আর জিজ্ঞেস  করি নি| হয়ত ট্যাক্সি চালিয়ে লাভ বেশি| কিম্বা চাইনিজ ডিগ্রির মূল্য কম| কথায় কথায় সে বলল তার কলেজে  কিছু বাংলাদেশী ছেলে ছিল - তখন সে নাকি একটু আধটু বাংলাও শিখেছিল| চমকপ্রদ তথ্য|

আর একবার সানফ্রান্সিসকো তে এক বার্মীজ ড্রাইভার পেয়েছিলাম| বার্মীজ শুনেই মনে পড়ে গেল  সুকুমার রায় এর খাই খাই  কবিতাটা "বার্মীদের ঙেপ্পিতে বাপরে কি গন্ধ|" পথের দাবী উপন্যাসে শরৎ বাবুও  নেপ্পির দুর্গন্ধের কথা লিখেছেন| জিজ্ঞেস করলাম "নেপ্পি কেমন খেতে?" সে অবাক হয়ে জানতে চাইল আমি কিভাবে এসমস্ত জানলাম| তারপর বলল "ও সব  গ্রামের দিকে খায় - আমি শহরের ছেলে, নেপ্পি খাই না|"

লানকাভি দ্বীপ এ গেছিলাম একবার| সন্ধে নাগাদ বৃষ্টি শুরু হলো| একটা টাক্সি ধরে তাড়াতাড়ি হোটেল -এ ফিরছিলাম| অন্ধকার জনশূন্য পথ| চারিদিকে ঘন গাছপালা| বৃষ্টি সমানে চলেছে| বেশ ভয় ভয় করছিল| হয়ত সেটা বুঝেই  ড্রাইভার একটা গান ধরল গুন গুন করে| একটু মন দিয়ে শুনে দেখি "জব চলি ঠান্ডি হাওয়া, জব উঠি কালিঘটা "| বললাম "এ গান তুমি শিখলে কোথায়?" বলল "ছোটবেলায় অনেক হিন্দি সিনেমা দেখতাম| আশা পারেখ আমার স্বপ্ন ছিল|" তারপর -ই যোগ করলো "আচ্ছা, আশা পারেখ কি এখনো বেঁচে আছেন?" আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না| সেটা বলতে সে খুব হতাশ হলো| হয়ত ভাবলো, এ কেমন ভারতীয় যে এটুকুও জানে না যে আশা পারেখ  বেঁচে আছেন কিনা| হায় রে আশা!

দেশে অনেক সময়েই কিছু কিছু জায়গায় পৌছানোর পর সেখান থেকে একটা গাড়ির দরকার হয়| ধরা যাক নাগপুর এ নেমে পেন্চ রিজার্ভ ফরেস্টে যাব, কিম্বা কুমায়ুন অঞ্চলে কিছুদিন ঘুরে বেড়াব| এসমস্ত জায়গায় গাড়ী ভাড়া  করার পর থেকেই শুরু করে দিই   ড্রাইভারদের  সঙ্গে বকবক করা| অনেক কিছু জানা যায় নতুন জায়গা সম্বন্ধে| অনেক কিছু জানা যায় একটা নতুন মানুষ সম্বন্ধেও| বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্ত ড্রাইভাররা আমার মনে একটা ছাপ ফেলে যায়| পরে  কেউ সেই জায়গায় গেলে তাকে আমার চেনা ড্রাইভার এর ফোন নম্বরও দিয়েছি কতবার!

স্টানলি কিন্তু কোনো টুরিস্ট স্পট এর ড্রাইভার ছিল না| ও ছিল আমাদের অফিসের ড্রাইভার| গাঁট্টা গোট্টা  চেহারা, রোদে  পোড়া কালো কুচকুচে গায়ের রং| ঢেউ খেলানো তেল চপচপে কালো বাহারি চুল| পুরুষ্ট গোঁফ| সবসময় একটা সাদা হাফ শার্ট পরত -  বুক পকেটে একটা পেন| সঙ্গে কখনো প্যান্ট, কদাচিৎ সাদা লুঙ্গি|

সেবার একটা প্রজেক্ট সবে সুরু হয়েছে| ক্লায়েন্ট হলো MRF টায়ার কোম্পানি| টায়ার বানানোর রবারের মধ্যে ওরা যে কার্বনের গুঁড়ো মেশায় সেটা কতটা মিহিভাবে মিশে গেছে - সেটাই মাপতে হবে আমাদের সফ্টওয়ারের সাহায্যে| সেদিন ওদের ফ্যাক্টরি তে গিয়ে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার ভার আমার ওপর| স্টানলি আমাকে নিয়ে চলল চেন্নাই -এর উত্তরে শহরের বাইরের সেই ফ্যাক্টরি তে||
বেশ গরম পড়েছিল সেবার| কিন্তু গাড়ী তে কাঁচ তুলে, এসি চালিয়ে দিব্বি মজাসে যাচ্ছিলাম| পোর্ট অঞ্চল টা পার করার পর -ই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে এলো| স্টানলি সেদিন মেন রাস্তা না নিয়ে সমুদ্রের ধার দিয়ে একটা ভাঙ্গাচোরা রাস্তা নিল| নিঃসন্দেহে ট্রাফিক কম - কিন্তু প্রচন্ড ঝাঁকুনি| তবু সমুদ্র দেখতে দেখতে যেতে ভালই লাগছিল| মাস ছয়েক আগে প্রচন্ড ঝড়  হয়েছিল চেন্নাই এ| একটা জাহাজ সেই সময় বালিয়াড়িতে এসে আছড়ে পড়ে|| বিশাল জাহাজ| বেশ ভেঙ্গে চুরে গেছিল| সেটা দেখি তখনো  বীচের ওপর কাত হয়ে পড়ে রয়েছে| কিছু স্থানীয় জেলেদের ছেলেপুলেরা তার আশে পাশে  খেলে বেড়াচ্ছে| বালিমাখা খালি গা| কেউ বা অর্ধেক ভিজে| মন থেকে রবার, কার্বন এসমস্ত ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল| জানলা খুলে একটু সমুদ্রের গন্ধ নিতে যাব - হল্কা হাওয়া জানিয়ে দিল, ভুল করেছি|

স্টানলি র সঙ্গে গল্প জমানোর চেষ্টা করলাম| কোথায় থাকে ও? বাড়িতে কে কে আছে? নিজের দেশ কেরালার কোন অঞ্চলে? কতদিন চেন্নাই -এ আছে? এখানে কেমন লাগে? অনেক প্রশ্নই ছিল| কিন্তু ইংরাজি নাম হলে কি হবে, স্টানলির ইংরাজি জ্ঞান দেখলাম যৎসামান্য| হিন্দি তো জানেই না| আর আমার তামিল ভাষার জ্ঞান, স্টানলি-র ইংরাজি জ্ঞানের চেয়েও কম| মালায়ালমও  জানি না| তাই  বেশিক্ষণ টানতে পারলাম না| অবশ্য দরকারও ছিল না| দেখতে দেখতেই এসে গেল আমার গন্তব্য| বাঁ দিকের  ফ্যাক্টরিটা  দেখিয়ে  স্টানলি হেসে বলল "এম্ম অর  ইএফ" অর্থাত MRF| আর তারপর  একটা অদভুত  প্রশ্ন করে বসলো "ইয়োর লাঞ্জি স্যার?"
লাঞ্জি কি বস্তু রে বাবা? আমাকে কি গাড়ী থেকে এবার লাফিয়ে নামতে হবে - মানে lunge করে? কিন্তু জল কাদা তো নেই আশেপাশে! একটু ভেবে মনে হলো, ইংরাজি তে লিখলে দাড়াবে lungi - অর্থাৎ ও জানতে চাইছে স্যার সঙ্গে লুঙ্গি এনেছেন কিনা! কিন্তু আমি হঠাত MRF এর ফ্যাক্টরি তে লুঙ্গি নিয়ে আসতে যাব কেন? আর যদি এনেও থাকি, তাই  নিয়ে স্টানলির মাথাব্যথা কি কারণে? ও কি ভাবছে আমি এখন এখানকার কোনো গেস্ট হাউসে দিবানিদ্রা দিয়ে তারপর ফিরে যাব? আর আমি যে সদ্য সদ্য একটা লুঙ্গি কিনেছি, সেটাও তো স্টানলির জানার কথা নয়!  কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না| স্টানলি ততক্ষনে  গাড়ী পার্ক করে দিয়েছে| পাসের সিট এর নিচ থেকে একটা তিন চার তলা টিফিন কৌটো বার  করে ঝকঝকে এক হাসি হেসে বলল "মাই লাঞ্জি" - তারপর আবার একই প্রশ্ন "ইয়োর লাঞ্জি স্যার?"
এইবার বুঝলাম| ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমার লাঞ্জি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না| কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে| ও নিজের লাঞ্জিটা সময় মত করে নিয়ে যেন তৈরী থাকে| হয়ত সেদিন স্টানলিও গাড়ির ডিকির ওপর চাদর বিছিয়ে লাঞ্জি করেছিল - কে জানে!

একটা কথা আজ ও চিন্তা করলে  ভালো লাগে - কোথাকার কে স্টানলি! সেও আমার জন্য ভেবেছিল| অফিসের ফোর্থ ক্লাস স্টাফদের মধ্যে আরো কেউ কেউ আমার জন্য  ভাবত| আমি অনেক দেরী করে অফিস থেকে বেরোতাম দেখে এক গার্ড নাকি আমার এক সহকর্মীকে প্রশ্ন করেছিল "ওনার কি কোনো পারিবারিক সমস্যা আছে? সময় মত বাড়ি যান না কেন?" সহকর্মীটি তাকে বুঝিয়েছিল "এখানে ওনার কোনো পরিবার টরিবার কিছুই নেই| একাই থাকেন তাই যা খুশি করেন|"

লালা কিন্তু নিজের পরিবার ছাড়া কারো জন্য বিশেষ চিন্তা ভাবনা  করত না| লালা অর্থাত দিনেশ চন্দ্র জয়সওয়াল| এলাহাবাদের ছেলে| বি কম পাস করে কি ভাবে জানি কাঠগোদাম -এ হাজির হয়েছিল| তারপর ড্রাইভিং শেখে| বহু বছর এখানে থেকে থেকে এক রকম পাহাড়িদের মতই হয়ে গেছে| নিজের একটা মারুতি ভ্যান ছিল| আমাকেও সেটাতেই নিয়ে যেতে চেয়েছিল| কিন্তু আমরা দলে ভারী ছিলাম - তাই সুমো র নীচে কিছুতেই রাজি হই নি| তখন কোত্থেকে একটা সুমো যোগাড়  করে এনেছিল| তারপর দশদিন এ পাহাড়  সে পাহাড় , এ জঙ্গল ও জঙ্গল, নানান মন্দির, নদী আর উপত্যকা ঘুরিয়েছিল আমাদের| কথায় কথায় নিজের ছেলেমেয়েদের গল্প করত| বাড়ি ফিরে কতক্ষণ তাদের সঙ্গে ক্যারাম খেলবে তার হিসেব দিত|  রাস্তাঘাট ছিল নখদর্পনে| একবার পাহাড়ের ধারে গাড়ী রেখে ওপর দিকে  কোথায় চলে গ্যালো| নিস্তব্ধ পাইনের জঙ্গল| নিচে অনেক দুরে সরযূ নদী বয়ে চলেছে| মন্দ লাগছিল না - কিন্তু লালা গেল কোথায় ভেবে চিন্তাও  হচ্ছিল| কিছুক্ষণ বাদে অনেকগুলো সাদা সাদা পাথর নিয়ে ফিরে এলো| বলল এগুলো গুঁড়ো করে ক্যারম এ দিলে নাকি স্ট্রাইকার আর ঘুঁটি 'দনাদ্দন' চলতে লাগে| ছেলেমেয়েরা পেয়ে খুব খুশী হবে|

কিন্তু সবাই তো লালা নয়! লুথরার ছিল সবার প্রতি পিতৃসুলভ আচরণ| ভোরবেলা রামনগর স্টেশন এ নেমে একটাই গাড়ী পেলাম আর সেটা লুথরার জিপ| বিরাট ভুঁড়ি  আর বিশাল গোঁফওয়ালা একটা মাঝবয়েসী লোক| করবেট পার্ক পেরিয়ে মারছুলা গ্রাম এ যাবার ছিল| সেখান থেকে ফেরার কোনো গাড়ী পাওয়া মুশকিল, তাই লুথরাকেই বললাম ফেরার দিন সকাল বেলা এসে নিয়ে যেতে| প্ল্যান করেছিলাম সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে, রাত্রে ট্রেন ধরব| খেয়াল ছিল না যে ফেরার দিনটা ছিল হোলি| রেষ্টুরেন্ট তো দুরের কথা, রাস্তার ধারে একটা ফলের দোকান পর্যন্ত খোলা ছিল না সেদিন| সঙ্গে যারা রয়েছে, তাদের বয়েস  তিন থেকে আটাত্তর - খিদেয় সব কাতর| লুথরা অনেক জায়গায় চেষ্টা করলো - কিন্তু খাবার জোটাতে পারল না| তারপর কাঁচুমাচু মুখ করে বলল - যদি কিছু মনে না করি তাহলে ওর বাড়িতে যেতে পারি|  যেন দোষটা ওরই | এরপর রামনগরের গলি ঘুঁজির মধ্যে দিয়ে পৌছানো গেল লুথরার বাড়ি| সেখানে  তার মা, বৌ থেকে আরম্ভ করে ছোট্ট মেয়ে সুদ্ধ সে কি আপ্যায়নের ঠেলা! দই বড়া, মিষ্টি, নিমকি ইত্যাদি বাড়িতে যা যা ছিল হোলি উপলক্ষে, সব এসে হাজির | পেট পুরে খেয়ে বললাম - "এবার তাহলে নিয়ে চল জিম করবেটের বাড়িটা দেখাতে| শুনেছি ওটা মিউজিয়াম বানিয়েছে? আজ খোলা থাকবে তো?"
-"চলুন দেখি| মনে তো হয় খোলাই থাকবে|"
কালাধুঙ্গী বেশ অনেকটা পথ| গিয়ে দেখি যা ভয় করেছিলাম তাই| মিউজিয়াম বন্ধ| আবার লুথরার মুখ কাঁচুমাচু - যেন দোষটা এবারেও ওর|
-"মন খারাপ করবেন না স্যার| চলুন আপনাদের গর্জিয়ার মন্দিরটা দেখাই|"
আবার উল্টোপথ এ করবেট পার্ক এর গেট পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া| ভারী চমৎকার জায়গা গর্জিয়া| কোশী নদীর মাঝে একটা টিলার ওপর ছোট্ট মন্দির| চারিদিকে প্রচুর গাছ| সন্ধে হয়ে আসছিল - তাই পাখিও প্রচুর| একটা অন্য রকম পাখি দেখলাম| ঈগল জাতীয়, কিন্তু মাথার ওপর যেন দুটো শিং| অনেকক্ষণ নদীর ধরে পাথরের ওপর বসেছিলাম| কিছু ছোট ছোট পাখির মাছ ধরার চেষ্টা দেখলাম| লুথরা যে কোথায় ডুব মারলো কে জানে| সূর্যাস্তের পর আবার এসে হাজির| সময়মত স্টেশন এ ছাড়বার দায়িত্ব নিয়েছে যে!

ভালো থাক লুথরা, লালা, স্টানলি র দল| এরা আছে বলেই না ঘুরতে এত ভালো লাগে|


Monday, February 26, 2018

পামেলা

আগের লেখাতে লিখেছি "হারিয়ে না যায়"| কিন্তু লিখলেই যে সব  থেকে যাবে তারও কোনো গ্যারান্টি নেই| মানে, লেখা তো কাগজে বা ইন্টারনেট এ থাকবে - কারো মাথায় থাকবে কি? কত লোকেই তো গান রেকর্ড করে গেছে - তার কতগুলো আমরা শুনেছি বা শুনতে চাই? মান ভালো না হলে এগুলো পড়েই থাকবে| তবু চেষ্টা করে যেতে ক্ষতি কি?

আসলে, লেখার জন্য এত কিছু আছে যে শেষ হতে চায় না| গত ৫০ বছরে যা স্মৃতি জমিয়েছি, যদি শুধু  তার অর্ধেক -ও লিখতে চাই তো ২০ বছর লেগে যাবে| তার থেকেও ছেঁটে ছুটে স্রেফ কিছু ভালো লাগা ঘটনা যদি আলাদা করি - ৫ বছরের কমে তো কিছুই হবে না|
আর ঘটনা কি শুধু আমার জীবনেই? কত লোকের মুখে কত গল্প শুনেছি  - সেগুলোও কি কম আকর্ষক? বেঁচে থাকতে থাকতে তার কিছুটা তো অন্তত লিখে যেতে হবে|

আজ লিখি লেডি লিটনের কথা|  ১৮৭৬ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে এসেছিলেন লর্ড রবার্ট লিটন| যদ্দুর জানি তিনি এদেশে তেমন কিছু করে যেতে পারেন নি|  এর অনেকদিন পর, তাঁর ছেলে ভিক্টর লিটন বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন| কার্যকাল ছিল ১৯২২ থেকে ১৯২৭| মাঝে কিছুদিন উনি ভারতের একটিং  গভর্নর জেনারেল হয়েও কাজ করেন| কিন্তু আমার লেখা এনাকে নিয়েও নয়| আমার লেখার মধ্যমনি এনার স্ত্রী লেডি পামেলা প্লাউডেন লিটন|

হঠাত আমি পামেলা কে নিয়ে পড়লাম কেন? ফিরে যেতে হবে বছর পাঁচেক আগে| মা আগেই মারা গেছিলেন| বাবা মারা গেলেন ২০১২ তে| ওনাদের সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হলাম আমি - একমাত্র জীবিত বংশধর| কি কি যে ওনারা রেখে গেলেন সব -ই তো বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন| শুধু কলকাতার বাড়িতে দুটো মস্ত মস্ত ট্রাঙ্ক এর ভেতরে যে কি রহস্য ছিল, পুরোটা জানতাম না| পরের  বার যখন কলকাতা গেলাম, খুলে বসলাম সেই ট্রাঙ্কগুলো| মা এর সেলাই করার নেশা ছিল - কিছু নক্সা করা টেবিল ক্লথ পাওয়া গেল| অনেক রং-বেরং এর উল বেরোলো| তারপর বেরোলো একটা ছোট মেয়ের সাইজের কিছু জামা জুতো - বুঝলাম ওগুলো আমার দিদির স্মৃতি - যে অনেক কাল আগেই চলে গেছে| কিছু পুরোনো ফটো পাওয়া গেল| বেশির ভাগ -ই হলদে হয়ে যাওয়া সাদা-কালো ফটো| তাদের মধ্যে অনেককেই চিনতে পারলাম না| এরপর পেলাম একটা বহু পুরানো সার্টিফিকেট| আমার ঠাকুমার নামে| শুনেছিলাম ঠাকুমা খুব ভালো সেলাই করতেন| রীতিমত ট্রেনিং নিয়েছিলেন| আর তারপর অনেককেই সেলাই শিখিয়েছিলেন| রংপুর এ থাকতে নাকি কোনো এক জমিদার গিন্নি না রানীমাকেও সেলাই সেখাতে যেতেন - রাজবাড়ি থেকে জুড়িগাড়ী  আসত  ঠাকুমা কে নিতে| আসলে দাদুর সঙ্গে ঠাকুমার লড়াই হয়ে গেছিল কোনো কারণে - আর সেই থেকে ঠাকুমা স্বাধীন জীবন যাপন করতেন| কিছুদিন আবার কিছু সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপেও জুড়ে গেছিলেন - স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় - সম্ভবত পুলিন দাস এর দলের সঙ্গে| ফলে পুলিশের নজরদারিতেও  কাটাতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন|
সে যাই হোক, বলছিলাম সার্টিফিকেট এর  কথা| সেই সার্টিফিকেটের -এর নিচে দেখলাম পামেলা লিটনের সই| আমার পিসিমা কনফার্ম করলেন যে এ সেই প্লাউডেন লিটনই বটে| এই সেই সার্টিফিকেট -

এবার আমি নেট ঘাঁটতে বসলাম লেডি লিটনকে নিয়ে| নাঃ, উনি ভালো সেলাই করতেন বলে কথাও কিছু বলা নেই| সার্টিফিকেট এর সইটা উনি স্রেফ ছোটলাটের গিন্নি হিসেবেই করেছিলেন| রাজনৈতিক ভাবে উঁচু পদে থাকলে কে যে কাকে কিসের সার্টিফিকেট দিতে পারে - ভাবলে আশ্চর্য লাগে|
কিন্তু এই মহিলার সম্বন্ধে অন্য একটা চমকপ্রদ তথ্য পেলাম| উনি নাকি ছিলেন উইনস্টন চার্চিলের প্রথম প্রেম| ওনার সঙ্গে চার্চিলের আলাপ হয় চার্চিল যখন হায়দ্রাবাদে আসেন, ১৮৯৬ সালে| পামেলা ছিলেন ওখানকার ব্রিটিশ রেসিডেন্ট  স্যার ট্রেভর জন প্লাউডেনের এর ছোট মেয়ে|  চার্চিল এই সময় তাঁর মা কে চিঠিতে লেখেন

“I was introduced yesterday to Miss Plowden, who lives here in Hyderabad, about eight miles from Secunderabad.....I must say that she is the most beautiful girl that I have ever seen - bar none. We are going to try and do the city of Hyderabad together, on an elephant......You dare not walk on the roads here as the natives spit at Europeans – which provoke retaliation leading to riots”**

চার্চিল ভারতীয়দের দু চক্ষে দেখতে পারতেন না - এই চিঠিতেও তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়|
চার্চিল পামেলাকে অনেকদিন ভুলতে পারেন নি| বিয়ের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় কারণ চার্চিলের আর্থিক অবস্থা তখন তেমন ভালো ছিল না| ১৮৯৯ সালে কলকাতা থেকে চার্চিল পামেলাকে লেখেন

“My dear Miss Pamela, I have lived all my life seeing the most beautiful women London produces.......Never I have seen one for whom I would forgo the business of life...... Then I met you....For marriage, two conditions are necessary - money and the consent of both the parties. One certainly, both probably are absent.”**

কেমন দেখতে ছিলেন এই পামেলা? খুব বেশি ছবি খুঁজে পাই নি| তবুও সুন্দরী ছিলেন নিঃসন্দেহে|
Photo: Copyright: DailyMail.co.uk

এইবার আসল কথায় আসি| চিন্তা করুন তো, ওপরের  সার্টিফিকেট এ যে কোমল হাতের সই, সেই হাতকে  চুরুটের গন্ধওলা নিজের হাতে নিয়ে, হাতির পিঠে চড়ে উইনস্টন চার্চিল ঘুরে বেড়াচ্ছেন হায়দ্রাবাদ শহরে! হয়ত চারমিনারের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকাও খেয়েছিলেন| কে জানে?

**Thanks to "The Hindu" for the information.

Friday, February 23, 2018

হারিয়ে না যায়

কত কথাই তো মনে আসে| সুযোগ পেলে বলে ফেলি| কখনো হয়ত একই কথা একজনকে একাধিক বার বলি| তারা সবসময় মুখে কিছু বলতে পারে না - কিন্তু হয়ত বিরক্ত হয়| আমাকে যখন কেউ একই গল্প তিনবার শোনায় , আমার-ই  কি ভালো লাগে? বড়জোর বলি "হ্যাঁ হ্যাঁ - এটা আপনি সেদিন বলেছিলেন বটে!"

কিন্তু বলতেও তো হবে| নইলে গল্পগুলো হারিয়ে যাবে যে! তারপর যেদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেব, গল্পগুলো চিরতরে লুপ্ত হয়ে যাবে| এত বছর ধরে এত জায়গা ঘুরে, এত মানুষের সঙ্গে মিশে যে ঘটনাগুলো মনের মনিকোঠায় গেঁথে রেখেছি, সেই মালাগুলো কাকে পরিয়ে  দিয়ে যাব? প্রত্যেকদিনই তো এইভাবে কত গল্প ধ্বংশ হয়ে যাচ্ছে| বাবা, মা বা ঠাকুমা যে গল্পগুলো বলে যেতে পেরেছিল, সেগুলো আমি কিছুদিন অন্তত বয়ে বেড়াতে পারব| যেগুলো বলে নি - সেগুলো হারিয়ে গেছে|

কিন্তু লেখকরা একটা পাকা বন্দোবস্ত করে যান| যতক্ষণ লিখতে পারা যাচ্ছে, চিন্তা কি? আজ থেকে ৫০ বছর পরেও যদি এগুলোর মধ্যে একটা কারো ভালো লাগে, জীবন সার্থক| নইলে কি লাভ এ জীবনে? ছোট থেকে খেলাধুলা করলাম কিন্তু পেলে বা সোবার্স তো হই নি| পড়াশোনা করলাম, আইনস্টাইন  হলাম না| গান করলাম, মহম্মদ রফি হওয়া হলো না| পরীক্ষায় নম্বর পেলাম, সে মার্কশিটগুলো একসময় মুল্য থাকলেও আর দুদিন বাদে ওজন দরে বেচে  দেয়া যেতে পারে| চাকরি করলাম, পয়সা কিছু খরচা হলো বাজে কাজে, সামান্য খরচা হলো ভালো কাজে আর কিছুটা হয়ত পড়েই থাকবে| আমার কোম্পানি দুদিন বাদে ভুলে যাবে আমি কাজ ছাড়লে| তারপর একদিন দেহটা পুড়িয়ে ফেলবে সবাই মিলে - খেল খতম|

কিন্তু এতগুলো বছর অনেক কিছু দেখবার আর শোনবার সুযোগ পেলাম| অভিজ্ঞাতাগুলো শেয়ার করলে কারো হয়ত কোনদিন কাজে লেগে যাবে| কিম্বা কারো কোনো কাজে লাগবে না, স্রেফ পড়তে ভালো লাগবে| এক মিনিটের জন্যও যদি এসব পড়ে কেউ একটু হাসে, কোনো শ্মশানে, কোনো শ্যাওড়া গাছের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে, বাকি সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে নাকি সুরে গাইতে পারব - "সাঁর্থক  জঁনম আঁমার"।

শুরু করা যাক। যেদিন যেমন মনে আসবে লিখে যাব। সাথী কে দিয়েই শুর করি আজ?

আমার স্কুল জীবন  শুরু হয়েছিল বেশ দেরিতে। ক্লাস থ্রি তে  ভর্তি হলাম ভরদ্বাজ শিক্ষাশ্রম -এ।  সেকালে কলকাতায় কো-এডুকেসন  স্কুল খুব কম-ই ছিল| কিন্তু ভরদ্বাজ এর মত কিছু  স্কুল ছিল যেখানে ক্লাস ফোর পর্যন্ত কো-এডুকেসন চালু ছিল| আমাদের ক্লাস-এ আমি নতুন ছেলে - বাকিরা প্রায় সবাই  ক্লাস ওয়ান থেকে পড়ে আসছে | আমাকে কেউ বিশেষ পাত্তা দিত না| তবু সাথী আমাকে খুব-ই ভালবাসত | মাঝে মধ্যে টিফিনের সময় বাড়ি থেকে আনা আচারও  খেতে দিত| আর এসবের পেছনে কারন ছিল একটা সিনেমা  - "হাতি মেরে সাথী"| সে বছর-ই রিলিজ হয়েছিল - মারাত্মক হিট  ছবি| একটা গান  ছিল "চল চল চল মেরে  হাতি - ও মেরে সাথী"| ক্লাস এর বেশির ভাগ পাজি ছেলেমেয়েরা সাথীকে দেখলেই  ওই গানটা  গাইতে শুরু করত| বলতে ভুলে গেছি  - সাথীর চেহারাটা একটু মোটাসোটা ছিল| সাথী সাঙ্ঘাতিক রেগে যেত ওই গানটা  শুনলে| কিন্তু আমি কোনদিন  ওই গানটা সাথী কে শোনাই নি - আর সেই জন্যই এত প্রেম|
দিব্বি আচার খেয়ে দিন কাটছিল -  কিন্তু কয়েক মাস  ভরদ্বাজ শিক্ষাশ্রমে  শিক্ষালাভের জন্য শ্রম  করার পর আমার ডানা গজাল| সেদিন দিব্বি কুলের আচার খাচ্ছি| সাথী আমাকে বোঝাচ্ছিল যে কেন ও আমাকে এত পছন্দ করে - আমি বাকিদের মত নই ইত্যাদি| কি যে দুর্বুদ্ধি  হল, হঠাৎ সাথী কে বললাম "তুই আমার খুব বন্ধু|" তারপর সিনেমার নামটা একটু ঘুরিয়ে বললাম "সাথী মেরে হাতি"| ব্যাস আর যায় কোথায়? সাথী রেগে, কেঁদে  একাক্কার কান্ড| তারপর একটু  সামলে নিয়ে  বলল "তোকে  আমি ভাল ছেলে  বলে জানতাম আর শেষকালে  তুইও?"
এরপর থেকে সাথী আমার সঙ্গে আর কথা বলত না| ওই স্কুলে আমরা আরো  এক বছর ছিলাম  - টিফিনে আর কোনদিন  আচার খাই নি| ভরদ্বাজ  ছাড়ার পর থেকে কোনদিন সাথীর সঙ্গে দেখাও হয় নি| আজ দেখা হলেও চিনতে  পারব না| হয়ত সেবার ট্রেনে আমার সামনের  বার্থে এ বসে বসে যে বৌটা আচার  চাটছিল - সেটাই সাথী| কে জানে?

Thursday, February 22, 2018

সিনেরারিয়া


অফিসের লন-এ ঘুরছিলাম। হঠাত ই চোখে পড়ল লেখাটা - 'Cineraria'.

ছোট ছোট বেশ সুন্দর ফুলগুলো| নানারকম রঙের|  বাকি অনেক নাম না জানা ফুলের ভিড়ে ওরাও রয়েছে| আর নাম না জানা বলেই, ওদের সবার সামনে একটা করে বোর্ড আর তাতে লেখা তাদের নাম| কিন্তু ফুলের নামে কিবা আসে যায়? সেক্সপিয়ার না কে যেন কোথায় একটা লিখেছিলেন না "গোলাপ কে যে নামেই ডাক না কেন সে তো গোলাপ ই"! Cineraria গুলোও শেষ শীতের রোদ্দুরে বেশ ঝলমল করছে| যেন কিছু বাচ্ছা ছেলে মেয়ে রং-বেরঙের জামাকাপড় পরে রোদ্দুরে খেলে বেড়াচ্ছে|
কিন্তু আরো তো অনেক সুন্দর সুন্দর ফুল ছিল| এই Cineraria -ই কেন আমার নজর কাড়ল?

কারনটা লুকিয়ে ছিল স্মৃতির অতলে| প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে শোনা এই নাম| তখন কি আর জানতাম যে এটা একটা ফুলের নাম! আর এই নামটা আমার প্রত্যেক দিনের সঙ্গী ছিল প্রায় পঁচিশ বছর - যতদিন ঠাকুমা বেঁচে ছিল|

ছোটর থেকেই ঠাকুমার মুখে শুনে আসছি "চোখ দুটো একেবারে গেছে| ছানি পড়ার পর থেকে আর বেশিক্ষণ পড়ার ক্ষমতা নেই |"
"ছানির ওষুধ হয় না?" আমার স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল|
"বলছে তো অপারেশন করে নিতে| কিন্তু আমার বড় ভয় হয় রে| কি জানি কি করে দেবে! ডক্টর মজুমদার অবশ্য এই ওষুধটা ব্যবহার করে যেতে বলেছেন| বেশ উপকার পাচ্ছি" - ঠাকুমা একটা ছোট্ট শিশি দেখালো আমাকে| সবুজ রঙের বাক্সের মধ্যে রাখা ছিল| ওপরে একটা চোখের ছবি| ওটাই নাকি রোজ দিনে দুফোঁটা  করে দু চোখে দিয়ে যেতে হয়|

এর পর থেকে আমি রোজ  ঠাকুমার চোখে ওই আই ড্রপ দেবার ব্যাপারটা লক্ষ্য রাখতাম| একটু বড় হবার পর একদিন ঠাকুমা আমায় বলল "চোখের ড্রপ টা একটু দিয়ে দিতে পারবি রে?" এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজার যোগ্য হয়ে গেছি ভেবেই তো বেশ গর্বিত লাগলো| আর সেই থেকে ঠাকুমার চোখে  রোজ দুই-দুই চার ফোঁটা ড্রপ দেবার কাজটা আমার ওপর এসে পড়ল| তখন মন দিয়ে ওষুধের  নামটা দেখলাম "Cineraria Maritima"| আর একটা জিনিস লেখা ছিল শিশিটার ওপর -  'Schwabe'.  ঠাকুমা বলল, ওটা হলো ওষুধটা  যারা বানায়, সেই কোম্পানির নাম| খুব বড় জার্মান কোম্পানি| আরো জানলাম যে ওটা নাকি হোমিওপ্যাথিক  ওষুধ| অবাক লেগেছিল জেনে| আমার ধারণা ছিল  হোমিওপ্যাথিক ওষুধ মানেই সাদা রঙের ছোট ছোট, মিষ্টি মিষ্টি গুলি|

ঠাকুমার ওই ওষুধটা কিনে আনত  বাবা| মাঝে কিছুদিন ওটা পাওয়া  যাচ্ছিল না| ওই এক-ই ওষুধ, কিন্তু অন্য কোনো কোম্পানি-র  তৈরী,  সেইটা আনছিল বাবা| সাদা রঙের বাক্সের মধ্যে এক-ই সাইজের শিশি| কোনো চোখের ছবি অবশ্য ছিল না সেটাতে|  ঠাকুমা বলত "এ হলো আমেরিকান ওষুধ, তেমন কাজ হয় না| আসলে আমেরিকানরা চায় না যে জার্মান রা এগিয়ে যাক| সেই যুদ্ধের  সময় থেকেই তো দেখছি|" ঠাকুমার মন চলে যেত  চল্লিশের দশকের গোড়ায়|

আবার কিছুদিন পর থেকে Schwabe -র ওষুধ পাওয়া যেতে লাগলো| ঠাকুমার জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক  হয়ে গেল| স্বাভাবিক মানে ওই আমেরিকা আর জার্মানি নিয়ে আলোচনা  ছেড়ে, বারান্দায় রোদ পোয়াতে পোয়াতে আবার সেই এক -ই কথা "ছানি পড়ে চোখদুটো গেছে| ওই ডক্টর মজুমদার -এর ওষুধটায় তাও যেটুকু দেখি| দে তো রে চোখে দুটো ড্রপ দিয়ে|"

আজ Phacoemulsification করে কত সহজে হয়ে যাচ্ছে  ছানির অপারেশন| একদিনেই হাসপাতাল থেকে ছুটি|| ঠাকুমা বেঁচে  থাকলে Phaco করিয়ে  দিতাম|

১৯৮৮ এর পর থেকে আমাদের বাড়িতে আর Cineraria Maritima আসে নি| ভাবছি একটা গাছ লাগাবো| আফ্রিকান ফুল আমার ফ্লাটের ব্যালকনি তে রোদ পোয়াবে| আর সেই রং এসে লাগবে আমার চোখে|



Thursday, February 1, 2018

নতুন খেলা

একটা নতুন খেলা  বেরিয়েছে  - হোয়াটস-এপ| ভারী মজার খেলা|

প্রথমে আপনাকে একটা বেশ দামী ফোন কিনতে হবে - যাকে বলে স্মার্ট ফোন| যত বেশি দাম, তত স্মার্ট! সামনে পেছনে ক্যামেরা চাই| আরে না না, আপনার পেছনে নয় - ফোন এর পেছনে| এরপর ওই হোয়াটস-এপ বস্তুটিকে আপনার ফোন -এ আনতে হবে| কিভাবে আনবেন? ১৫-২০ বছর বয়েসী কোনো একটা বাচ্ছাকে বলবেন, সে করে দেবে| এই সময় বাচ্ছাটা আপনাকে ইঞ্চি, গিগাবাইট, android এই ধরনের কোনো কোনো কথা বলতে পারে| বলুন আপনি Apple পছন্দ করেন| না না, সত্যি সত্যি আপনাকে আপেল খেতে হবে না| ওটা কথার কথা|

এরপর কিছুদিন প্রাকটিস করতে হবে| খুব সহজ| ঘুম থেকে উঠে আপনার বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, উকিল, ডাক্তার, প্লাম্বার, রাজমিস্ত্রী, ইন্সুরেন্স এর দালাল ইত্যাদি যাদের নাম ওই হোয়াটস-এপ -এ দেখতে পাচ্ছেন, তাদের সবাইকে "Good morning" লিখুন| এখানে Good Morning মোটামুটি বেলা একটা পর্যন্ত এলাউড| অন্যদের নকল করতে না চাইলে 'সুপ্রভাত' -ও লিখতে পারেন| দুদিন বাদেই আপনি দেখবেন নিজে থেকেই 'Suprobhat' লিখতে শিখে গেছেন|  পুরোপুরি বাংলা লিখতে কিছুটা অধ্যাবসায় চাই - সেটা না হয় পরেই করলেন|

এবার দেখবেন আপনি গুড মর্নিং পেতে শুরু করেছেন| শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে ভারি  চমৎকার সব ছবি -ও আসছে| ফুল এর ওপর ভ্রমর, কিম্বা গাছের ডাল -এ পাখি| কখনো বা নদীর ওপর সূর্যোদয়| তারপর আসবে ভিডিও| একটা বাচ্ছা  ছেলে হয়ত হাত নেড়ে নেড়ে গুড মর্নিং বলছে| তাহলে তো আপনাকেও এবার ওরকম পাঠানো শিখতে হয়| নইলে হেরে যাবেন যে!
যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এটা আপনাকে করতে হবে, তার নাম হলো ফরওয়ার্ডিং| রাষ্ট্রভাষায় বলে "ইধার কা মাল উধার"| মানে প্লাম্বার এর পাঠানো ছবিটা শালা কে পাঠিয়ে দিন, কিম্বা বন্ধুর পাঠানো ভিডিওটা উকিল কে| এইতো বেশ পোক্ত হয়ে উঠেছেন| এবার অন্যান্য কথাবার্তাও চালাতে পারেন|

পরবর্তী ধাপ হল গ্রূপ | সাধারনত আপনাকে গ্রূপ খুঁজে  বেড়াতে হবে না, গ্রূপ -ই আপনাকে খুঁজে  নেবে| মাসখানেক পরে দেখবেন, নিজেই গ্রূপ বানিয়ে মেম্বার খুঁজে বেড়াচ্ছেন| গ্রূপ -এ খেলাটা খুব উত্তেজনাপূর্ণ | ধরুন স্কুল এর বন্ধুদের গ্রূপ এ একটা ম্যাসেজ এলো - "নরওয়ে র বিখ্যাত বিজ্ঞানী Dr Kundusen বলেছেন, খাবার পর জিভের নিচে একটা ম্যাগনেট রাখলে জীবনে কোনদিন নিমোনিয়া হবে না"| সঙ্গে সঙ্গে মেসেজটা আপনার বাকি সব গ্রূপ এ ফরওয়ার্ড করে দিন - আত্মীয়দের গ্রূপ, অফিস এর সহকর্মীদের গ্রূপ ইত্যাদি|| কি বললেন? ওই মেসেজটা  ঠিক কিনা জানেন না? আরে মশাই আপনাকে যে পাঠিয়েছে সেও জানে না আর আপনি যাদের পাঠাচ্ছেন তারাও জানতে চায় না| এ হলো মহাকর্ষের মত এক অমোঘ শক্তি - ইংরাজি তে বলে "A message should be forwarded"| আর তাছাড়া ওই মেসেজ এর নিচে তো লেখাই রয়েছে "আপনি যদি মানুষের ভালো করতে চান তাহলে এই ম্যাসেজ যথেচ্ছ ফরওয়ার্ড করুন"| আর আপনি যে অপরের ভালো করতে চান সেটা কে না জানে! সেই যে - "জীবে প্রেম করে যেই জন...."| আপনার অধিকার শুধু কর্মে - ভুলে গেছেন নাকি? আপনার আগে যদি অন্য কেউ ফরওয়ার্ড করে  দেয় তাহলে তো আপনি হেরে যাবেন| বেসুরো গান, বেতালা কবিতা, বোকা বোকা চুটকি, চার্লি চাপলিন -এর বক্সিং, ববি ফিশার এর দাবা খেলা - সমস্ত ফরওয়ার্ড করতে থাকুন? কি বললেন? আলেকজান্ডারের সিন্ধু নদী পেরোনোর ভিডিও টা এসেছে? black and white তো? তাহলে নিশ্চই অথেন্টিক - পাঠিয়ে দিন, পাঠিয়ে দিন|  এবার খেলাটা একটু  একটু বুঝতে পারছেন আশা করি?

এবার বলুন দেখি, কিভাবে বুঝবেন যে আপনি খেলাটায় বেশ ওস্তাদ হয়ে উঠেছেন? ঠিক ধরেছেন - যখন দেখবেন আপনার পাঠানো মেসেজগুলো চারিদিক থেকে আপনার কাছেই ফিরে আসছে - বুঝবেন যে আপনি মোটামুটি national level এর খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন|

এবার তাহলে অলিম্পিকের  প্রস্তুতি| আপনি হোয়াটস-এপ এ সময় বাড়ান| রাত্রে ফোন সঙ্গে নিয়ে শোবেন আর কোনো শব্দ শুনলেই দেখে নেবেন যে মেসেজ এলো কিনা| এসে থাকলে উত্তর দিন আর ফরওয়ার্ড করুন| না না - ভুল বললাম| প্রথমে ফরওয়ার্ড করুন, তারপর উত্তর দিন| তাড়াতাড়ি লিখতে শিখুন| এই যেমন "How are you" না লিখে লিখুন "how r u" - বুঝলেন? সময় অতি মূল্যবান - অপচয় করবেন না|

কোনো নতুন জায়গায় গেলে ছবি তুলে পাঠান| নতুন কিছু খেলে ছবি তুলে পাঠান - সঙ্গে লিখুন "Having piri piri kochu at hanglathorium restaurant with montu kakima"| সেলফি নিতে শিখুন - ও তেমন শক্ত ব্যাপার নয়, নিজের ছবি নিজে তোলা - শুধু মুখটা একটু ছুঁচোর মত করে নিতে হবে - ব্যাস| কিছু মজার ভিডিও বানান| আপনার বাচ্ছাটার পায়খানা কষে গেছে? দারুন খবর| ও যখন কোঁত পাড়বে  তখন ভিডিও করুন| একটা মজার caption দিতে ভুলবেন না - যেমন ধরুন "every action has an equal and opposite reaction"| আর এই সমস্ত ফরওয়ার্ড করতে থাকুন| দেরী যেন না হয়? কে বলতে পারে - হয়ত পাশের বাড়ির পাঁচু বাবুর ছেলের -ও কোষ্ঠ কাঠিণ্য হয়েছে| পাঁচু বাবুর কাছে হেরে যাবেন না যেন|
হ্যাপী সরস্বতী পুজো, হ্যাপি ঈদ - এসমস্ত চালাতে থাকুন| gn লিখতে শিখুন| কি হলো? gn যে good night সেটাও এতদিনে জানেন না? দেশ ভক্তির কোনো মেসেজ  এলো কি? চোখ বন্ধ করে ফরওয়ার্ড করে দিন| নইলে দেশদ্রোহী আখ্যা পাবেন যে!

এবার আসি সাবধানতার ব্যাপারে| ধর্ম কে আঘাত করবেন না| বিশেষত সেই ধর্ম কে, যে ধর্মের লোক আপনার চারপাশে বেশি আছে| রাজা, রানী, মন্ত্রী এসব নিয়ে মেসেজ ফরওয়ার্ড করবেন না - যে কোনো দিন arrest হয়ে যেতে পারেন কিম্বা ঠ্যাঙানি খেতে পারেন| তখন জেলখানায়  বা হাসপাতালে ব্রেকফাস্ট করার ছবি পাঠানোর সুযোগ পাবেন অবশ্য|

ওহ হো, বলতে ভুলেই গেছি - প্রোফাইল পিকচার সেট করেছেন তো? সঙ্গে একটা বাণী? এইটা খুব জরুরি| সাদামাটা ছবি ছবি হলে চলবে না| ছবিটা দেখে যেন মানুষের মনে কিছু প্রশ্ন আসে| সঙ্গে ওটা কে? কিম্বা, থালার ওপর ওটা কি? অথবা, এ আবার প্যারিস গ্যালো কবে? এই রকম একট রহস্যে ঘেরা ছবি চাই| আর সঙ্গের ওই বাণী টা বাকিদের দেখে শিখে নিন| অদভুত কোনো নতুন ইংরাজি প্রভার্ভ ব্যবহার করতে পারেন - "Oh yeah! Mama Mia!" অর্থটা যেন ধরা না যায়| আবার একটা সহজ ভাব ও থাকতে হবে যাতে কেউ ওটার মানে জিজ্ঞেস করতে সাহস না করে - ভাবে, এটা নিশ্চই সবাই বুঝতে পারছে, শুধু আমিই বুঝি নি| কে আর যেচে বোকা হতে চায়!

অন্যান্যদের পাঠানো মেসেজগুলোর প্রশংসা করতে থাকুন| সে যত রদ্দি বস্তাপচা মাল -ই হোক না কেন! ওটাই দস্তুর| মন কে উদার করুন| ইমোটিকন জানেন? ওই যে হাসিমুখ, বা জলভরা চোখের কার্টুনগুলো! এই দুটো দিয়েই শুরু করুন - মেসেজ টা এই নিয়ে তেত্রিশবার পেলেন? দুটো হাসিমুখ পাঠিয়ে দিন| ভালো মেসেজ পেলে, কাঁচকলা দেখানোর ইমোটিকন টা ব্যবহার করবেন|

হাঁটতে হাঁটতে হোয়াটস-এপ করতে শিখুন এবার| এক সেকেন্ড -এর জন্য মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দশ ফিট রাস্তা দেখে নিয়ে আবার মোবাইল -এ মন দিন| পরের পাঁচ সেকেন্ড এ স্ক্রিন এর ওপর তর্জনীটা চার বার ওপর থেকে নিচে ঘষুন| তারপর টকাটক দুটো বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে একটা মেসেজ টাইপ  করে ফেলুন এবং সেন্ড করুন| আবার এক সেকেন্ড রাস্তা দেখুন - এঃ হে, গোবর মাড়ালেন যে! যাকগে, যা হবার হয়ে গেছে| ঘাসে মুছে নিয়ে এগিয়ে চলুন| চরৈঃ বেতি|




রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...