Saturday, July 30, 2022

বনঘাট - দ্বিতীয় সর্গ

দ্বিতীয় বা শেষ পর্ব লিখতে বসে, প্রথমেই মনে হল যে এগুলো পর্ব নয়| এগুলো হল সর্গ - যা কিনা স্বর্গের খুব কাছাকাছি| তাই প্রথম পর্বকে  বদলে, প্রথম সর্গ করে দিলাম| 

তা ছাড়া, ভেবেছিলাম যে দু একটা ছবি যোগ করব| কিন্তু সে ব্যাপারেও মত পাল্টালাম| প্রথমত, যে স্বর্গ দেখেছি, মোবাইলে তোলা গুটিকতক ছবি সেটাকে তুলে ধরতে পারবে না| সেই আলো, সেই অন্ধকার, জলের শব্দ, পাখির ডাক, সেই নৈশব্দ, বুনো গন্ধ,  লোকজনের জঙ্গলের প্রতি ভালোবাসা - যদি পারি, তো সেটা খানিকটা লিখেই বোঝাতে পারব| আর দ্বিতীয়ত, যারা পড়ছেন, তাদের কল্পনার রাশও আমি কয়েকটা ছবি দিয়ে বেঁধে রাখতে চাই না|

এবার শুরু করি এই স্বর্গ রাজ্যের দ্বিতীয় অধ্যায়|

পরেরদিন ভোরের  রুটিনটা একই  রকম| সকাল সকালে ওঠা, হাত মুখ ধুয়ে চা খেয়ে তৈরি হয়ে নেওয়া| আজ আমাদের সঙ্গে চলেছে ভূপি  আর আশীস| ভেলা পেরিয়ে একই রাস্তা ধরে সেই এম্ফিথিয়েটার এর মত জায়গাটা অবধি পৌঁছলাম| আজ যেন পাখির সংখ্যা অনেক বেশী| কোথাও থেকে হর্ণবিলের ডাক আসছে| দুটো  ফিঙ্গে লাফালাফি করছে| এক ঝাঁক বুলবুল আসতে, তারা সরে পড়ল|

 আশিস বলল-আজ এখান থেকেই জঙ্গলের ভেতরে ঢোকা যাক| রাস্তাটা ওপর দিকে চলে গেছে, ক্রমশ  নদীর থেকে দূরে| ওর জানা রাস্তায় এক চক্কর ঘুরে আসতে ঘন্টা তিনেক লাগবে| কিন্তু না, আজ আর ঘোরাঘুরি নয়| আমরা ঠিক করলাম আজ  এক জায়গায় বসে জঙ্গলটা উপভোগ  করব| সামনে কিছু বড় বড় গাছ|  অনেক নিচে রামগঙ্গা  বয়ে চলেছে, যদিও গাছ থাকার কারণে পুরোটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না  | তবে পাথর ভেঙে জল যাবার আওয়াজ এখান থেকেও পরিষ্কার শোনা যায়|  দুপাশে আর পেছনে  ঘন জঙ্গল - পায়ে চলা একটা আবছা পথ পেছন দিকে  জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে | তবে প্রায় পঞ্চাশ মিটার পর্যন্ত গাছের ঘনত্ব অতো বেশী নয়| হঠাৎ কোনো জন্তু জানোয়ার এলে দেখতে পাব| দুটো হরিণ এইমাত্র আমাদের দেখতে পেয়ে নিচের দিকে নেমে গেল| কোথা থেকে কিচমিচ করতে করতে উজ্জ্বল কমলা রঙের  গাদাখানেক পাখি সামনের গাছটায় এসে বসল|  এদের নাম নাকি মিনিভেট| চমৎকার দেখতে| মাঝে একদল প্লাম হেডেড প্যারাকীট উড়ে গেল| পেছনের জঙ্গল থেকে অনেক্ষণ একটা ঠক ঠক করে শব্দ হচ্ছিল - এবার কাঠঠোকরাটাকে দেখতে পেলাম| গাছপালার একটা  মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে| তার সঙ্গে কেমন যেন একটা  কাঠ জ্বলার গন্ধ - হয়তো কোথাও গাছে আগুন লেগেছে আর হাওয়ায় সেই গন্ধ ভেসে আসছে| এসব গন্ধ একাকার হয়ে  কেমন যেন মনকে বোঝাতে লাগলো এবার ক্ষিধে পেয়েছে| লুচি আলুর তরকারি বেরিয়ে এল| বেরল বেশ কিছু ডিমসেদ্ধ| তারপর ফল| সবশেষে ফ্লাস্ক  থেকে চায় গরম|

মাঝে মধ্যেই আশপাশটা আর পেছনের জঙ্গলটা খেয়াল রেখে চলেছি| কোন অনাহুত অতিথী না এসে পড়ে| বাঁদরের দল এলে আর দেখতে হবে না! আশীস তার গল্পের ঝুলি খুলে বসেছে ------ 

"বছর পাঁচেক আগের কথা| রিসর্টএ তখনও ভালোমত বেড়া দেওয়া ছিল না| একটা বাঘ ঢুকে এসেছিল| আমরা দু-তিন জন কাছাকাছি ছিলাম| চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি - একদম নড়ছি না| বাঘটা  একটা চাপা ঘড় ঘড় আওয়াজ করছে| তারপর আচমকা সামনের দিকে দু চার পা দৌড়ে এল| তারপর আবার পেছিয়ে গেল| এরকম চলল দু  তিন বার| তারপর পেছন ফিরে হাঁটা দিল| হয়তো মিনিট পাঁচেক ছিল, আমাদের মনে হচ্ছিল কয়েক ঘণ্টা|----" 

"মাঝরাত্রে হাতি এসে যেত তখন| আমরা যে যা পেতাম - মায় হাতা  খুন্তি পর্যন্ত - তাই দিয়ে আওয়াজ করতাম, চেঁচাতম, দরজা পেটাতাম| কোনদিন কাউকে অ্যাটাক করে নি---"

"গত বছর এক সাহেব কে নিয়ে ঠিক এইখানটায় এসেছিলাম| সাহেবের খুব ফটো তোলার শখ| দেখি দূরে ওই দিকে একটা হাতি কখন এসে দাঁড়িয়েছে| সাহেব তো খুব খুশী| ফটো তুলছে| হঠাৎ এদিক ফিরে দেখি, এদিকেও হাতি - একদল| প্রথমটা আমাদের দেখতে পায় নি - দৃষ্টি শক্তি জোরালো নয় যে| তারপর জানি না কি হল, শুঁড় তুলে তুলে খুব গন্ধ নিল| হঠাৎ একটা হাতি প্রচন্ড চিৎকার করে উঠল| তারপরই প্রায় পুরো দলটা আমাদের তেড়ে এল| এই সামনের খাড়া ঢাল বেয়ে আমরা নামার চেষ্টা করলাম| সাহেবকে বললাম কোনো শব্দ না করে স্রেফ আমার সঙ্গে লেগে থাকতে| ধারালো পাথরে ঘষা  লেগে সাহেবের জিন্স ছিঁড়ে গেল| গাছের ডাল ধরে নামতে গিয়ে হাত পা ছড়ে গেল| বহু কষ্টে দুজন বেঁচে গেছিলাম সেদিন| কিন্তু ধন্য বটে সাহেব| কোনো বিকার নেই| ওই খাড়াই বেয়ে নামতে নামতেও ছবি তুলে চলেছিল|"

ভাস্বতী জিজ্ঞেস করল "ঠিক এইখানটায়?"

-"একদম এইখানে"

-"তাহলে আমরা এখন এখান থেকে একটু অন্য কোথাও গিয়ে বসি না কেন ?"

তাই হল| আমরা আবার খানিকটা নিচে নেমে এসে বসলাম| এবার নদীটা আবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে - বহুদূর পর্যন্ত| সেই যেখানে পাহাড়ের ফাঁকে বাঁক নিয়ে সে করবেট পার্কের একদম ভেতরে ঢুকে গেছে| 

আবার শুনি হর্ণবিলের ডাক| এরপর যা দেখলাম ভাষায় বোঝাতে পারব না| দুটো গ্রেট হর্ণবিল যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে আমাদের সামনে দিয়ে নদী পেরিয়ে চলে গেল| এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তাদের সৌন্দর্য দেখে, যে আমরা কেউ ক্যামেরা পর্যন্ত তুলি নি| বিশাল ডানা মেলে হলদে কালো দুটো  কনকর্ড এরোপ্লেন যেন সামনের পর্দার ওপর দিয়ে স্লো মোশনএ চলে গেল - শুধু শব্দটা ছিল না - যেন সাইলেন্ট মুভি| হর্ণবিল অনেক দেখেছি, কিন্তু গ্রেট হর্ণবিল সম্ভবত জীবনে এই দ্বিতীয়বার দেখলাম|

এই দৃশ্য দেখার পর এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু দেখার আশা করি না| তাই ফেরার পথ ধরলাম| বারবেট এর ডাক সমানে শোনা যাচ্ছে| ভূপি চিনিয়ে দিল অন্য একটা বারবেটএর ডাক - যার নাম কপারস্মিথ বারবেট - যেন স্যকরার ঠুক-ঠাক আওয়াজ | ভারী চমৎকার  দেখতে - লাল, সবুজ আর হলুদের মাখামাখি||

পেছন থেকে করা যেন গল্প করতে করতে আসছে| দেখি কালকের সেই ছেলেগুলো|

-"কি হে? এত তাড়াতাড়ি  বাড়ি ঘোরা হয়ে গেল? বাড়ির খবর সব ভালো তো?"

-"আর বলবেন না স্যার| কাল সারা রাত ঘুমোতে পারি নি কেউ|"

-"কেন?"

-"সমস্ত রাত গ্রামের আশেপাশে একটা বাঘ ঘুরে বেড়িয়েছে | কোনো একটা গরু তোলার তালে ছিল| কিন্তু আমরা সতর্ক থাকায় সুবিধে করতে পারে নি | তাই মাঝে মধ্যেই গরগরিয়ে রাগ দেখিয়ে গেছে| খুব ভয়ে ভয়ে রাতটা কাটিয়েছি|"

গল্প করতে করতে পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে থাকি| পাথর সাজিয়ে একটু সিঁড়ির মত করার চেষ্টা হয়েছিল কখনো| হাতির দল এসে পথরগুলোকে নিজেদের খুশিমত সাজিয়ে দিয়ে গেছে| ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে এই রাস্তাটা একটু ঠিক করতে হবে, নইলে কোনো  শহুরে ট্যুরিস্ট কোনদিন পা মচকে পড়ে থাকবে|

আমরা আবার নদীর পাশে| আমি, ভাস্বতী আর ভূপি ভেলায় উঠে পড়ি| মাঝ নদীতে দেখি একটা পিয়েড কিংফিশার| এই  মাছরাঙ্গার সেই উজ্জ্বল নীল রঙ নেই - নেহাতই সাদা-কালো| কিন্তু  একটা অদ্ভুত ক্ষমতা হল ফড়িং  এর মত শূণ্যে এক -ই জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারে - ডানা ঝাপটানোর এক অসাধারণ কৌশল| সান বার্ড এর মধ্যেও এই ক্ষমতা দেখেছি| আর ভিডিও তে  দেখেছি হামিং বার্ড কে এরকম ভাবে উড়তে | জলের প্রায় দশ পনেরো ফিট ওপরে ভাসছিল পাখিটা| হঠাৎ ডানা মুড়ে জলের ওপর টুপ করে খসে পড়ল| তারপর সেই ফেনিল জলরাশির থেকে একটা খাবি খাওয়া রোদ ঝলমলে মাছ মুখে করে নিয়ে বোধহয় বাড়ির দিকে উড়ে পালাল| ওই মাছটার আত্মীয় স্বজনের হাহাকার আমরা শুনতে পেলাম না - এমনিতেই জলের যা শব্দ !

রিসর্ট এ ফিরে এসেছি| এক কাপ করে চা খাওয়া যাক এবার| ভূপি গল্প করে চলেছে|

"এতদিন আছি, কিন্তু বাঘ দেখি নি কখনো| তবে একবার একটা লেপর্ড দেখেছিলাম| নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ওপারের পাহাড়ের ওপর একটা ঘুরাল কে নজর রাখছিলাম| হঠাৎ দেখি ঘুরালটার থেকে প্রায় শ-খানেক মিটার দূরে চুপিসাড়ে এগোচ্ছে লেপর্ডটা| যতটা সম্ভব মাটির সঙ্গে মিশে আছে| আগাছা আর ঝোপ এর আড়াল তো আছেই| ঘুরালটা ঘাস পাতা চিবোতে ব্যস্ত| আমি দৌড়েছি আমার ঘরের দিকে, ক্যামেরা টা নিতে| মিনিট দেড়েক বাদে ফিরে দেখি ঘুরাল বা লেপর্ড কেউ নেই| আশিস -ও ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল| ও বলল শেষ মূহুর্তে বুঝতে পেরে ঘুরালটা একটা কঠিন চড়াই ধরে  উঠে পালিয়েছে|"

খেয়াল করি নি কখন আমরা চা শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে এসে গেছি| ঠিক সেইখানটায় - যেখানে "জলের থেকে মাছ বেশী"| সত্যি বটে| একদম থিক থিক করছে| ওরা যে কিভাবে নড়া চড়ার জায়গা পাচ্ছে কে জানে!

কিছুক্ষণ মাছ দেখে, আবার চলি নদীর সেই অংশটায় - যেখানে কাল স্নান করেছি| আজ শীতটা একটু কম লাগছে| ফলে বেশ খানিক্ষণ জলে ডুবে বসে থাকা গেল| বসে বসে আশেপাশের  পাহাড়গুলোর ওপর নজর রাখা আর জলের শব্দ শোনা| নাম না জানা আরও কিছু পাখির ডাক শোনা| এই করতে করতে দুপুর গড়িয়ে গেল| অনিচ্ছা সত্বেও আমরাও রিসর্ট এ ফিরলাম| তারপর পেট পুরে ভাত ডাল তরকারি মাংস আর মিষ্টি খাওয়া গেল|

ঘোষবাবুর এবার বিদায় নেবার পালা| উনি দেখি মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত| কাছে যেতে, আমাদেরও  দেখালেন - একটা প্রকাণ্ড সাইজের বাঘ একটা গরুকে আক্রমণ করেছে| ছবিটা রামনগর শহরের কাছাকাছি  কোথাও তোলা - কারণ দূরে শহরের বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে| 

-"আমার এক পরিচিত এটা এইমাত্র পাঠিয়েছে| বাঘটার সাইজ টা খেয়াল করেছেন? গরুটাকে প্রায় ঢেকে দিয়েছে| আর সেটাও শহরের এত কাছে| ভাবলেই ভয় করবে|"

ছবিটা আমরা সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকি| আশ মিটলে  ঘোষবাবুকে ছাড়ি| ওনাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি সবাই মিলে | গেটের পাশেই ওদের ছোট্ট গিফট শপ| একবার ঢুঁ মেরে নিই চট করে| আর পাঁচটা গিফট সপের মতই| গ্রামের লোকেদের হাতে তৈরি কিছু কিছু জিনিসও আছে বটে| একটা গরুর গলার ঘণ্টা কিনি - বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখলে, হাওয়ায় দুলে দুলে বেশ একটা গ্রাম্য আওয়াজ করবে|

খুব  ক্লান্ত লাগছে আজ| যাই, ঘণ্টা খানেক ঘুমিয়ে নিই|

দুপুরে ঘুম হল না| অবশ্য খানিকটা বিশ্রাম অবশ্যই হল| পাঁচটা নগদ আশিস কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম| আজ একটু সাহস বেশী - তাই পশ্চিম দিকের গেটটা দিয়েই বেরোলম| ওদিক দিয়েও নদীর ধারে আসা যায় - খানিকটা বেশী হাঁটতে হল, এই যা| জায়গাটা খুব  ঘন ঝোপ ঝাড়ে ভর্তি| তার মাঝে আশিস না জানি কিসের শব্দ শুনেছে - অনেক্ষণ একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল| শেষমেষ ঝোপ থেকে একটা বারকিং ডিয়ার বেরিয়ে এসে, আমাদের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করে দৌড় মারল| এদিকটায় ময়ূর অনেক| আধ ঘন্টার মধ্যেই আমরা নদীর ধারে এসে গেছি| নদীর ওপারে একটা বিশাল নাম না জানা গাছের ডালে একটা ঈগল বসে আছে| হঠাৎই সেটা জলে ঝাঁপ মারল| তারপর মুখে করে একটা মাছ নিয়ে গিয়ে আবার গাছের ডাল এ বসল| বেশ খানিক্ষণ তার মাছ খাওয়া দেখতেই কেটে গেল| সূর্য কখন চলে গেছে পাহাড়ের পেছনে| শিরশিরে হাওয়া জানান দিচ্ছে যে এবারে রিসর্টএর বাইরে আর নয়|

আজ সন্ধের দিকে খুব হাওয়া দিচ্ছিল| যত অন্ধকার হচ্ছে, হাওয়া কমে আসছে কিন্তু আকাশটা ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে| চাওলা সাহেবের আজ মন্দা - টেলিস্কোপ এ মেঘ ছাড়া কিছুই ধরা পড়বে না| চা খেতে খেতে আলোচনা করছি যে আজ রাতটা কি করা যায়| ভূপি র বক্তব্য "মাচানে বসে কাটিয়ে দিন"|

তাই বসলাম খানিক্ষণ| বেশ কিছু চিতল জল খেতে এসেছিল| দুটো বুনো শুওর ও  ঘুরে গেল| তারপর সব চুপচাপ| দু এক ফোঁটা বৃষ্টি হল| জঙ্গল আজ সাংঘাতিক রকম নিশ্চুপ | মেঘের জন্য চাঁদের আলোটুকু ও আজ নেই|  তাড়াতাড়ি ডিনার করলাম আজ| ডিনার এর সময় সজারুগুলো একবার দর্শন দিয়ে গেল| তারপর ঘণ্টা দু তিন স্রেফ অন্ধকারে বসে বসে ভূপি আর চাওলাজীর গল্প শোনা| কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না সেই জমাট অন্ধকারে| ভূপি চাপা স্বরে বলে চলেছে বনঘাটের ইতিহাস| মাঝে মধ্যে চাওলাজী যোগ করছেন ওনার কোনো অভিজ্ঞতা| 

-"বছর তিনেক আগে এই রকম -ই এক মেঘলা রাতে আমি ভীমতাল থেকে কালাধুঙ্গী আসছি, রাত প্রায় নটা,-------"

আমরা কান খাড়া করে রোমঞ্চের আস্বাদ নিচ্ছি| মনের ক্যামেরায় যেন চাওলাজীর গাড়ির হেডলাইটটা দেখতে পাচ্ছি| হঠাৎ মাচানের দিক থেকে একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ| তড়িঘড়ি উঠে বসি - আরে, এ তো সকাল হয়ে গেছে| রাত্রে কখন যে ঘরে এসে শুয়ে পড়েছি, মনেই নেই|

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

আজ আমাদের ফেরার দিন| সকাল সকাল বেরোলে, সকাল সকাল বাড়ি পৌঁছাব| সঙ্গে বিশেষ জিনিসপত্র নেই, তাই গুছিয়ে নিতে সময় লাগলো না| এক কাপ চা খেয়ে বাকি পয়সাকড়ি মিটিয়ে দিয়ে ঘরে এসে স্নান করে তৈরি হয়ে নিলাম| সকাল আটটা বাজে| আকাশে এখনো মেঘ| ভূপি আমাদের ভেলায় তুলে দিয়ে গেল| বালুলি ব্রিজের কাছে এসে দেখি গাড়ি ঠিক ঠাক আছে - কোনো জন্তু জানোয়ার উপদ্রব করে নি|মেন রোডে গাড়ি ওঠাতে মিনিট দশেক লাগলো| তারপর রাস্তা উঠে গেছে ওপরের দিকে আর রামগঙ্গা নদী আরো নীচে বহুদূরে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে|

বেলা এখন দশটা| আমরা করবেটের ধনগড়ি গেট -এর কাছকাছি একটা গ্রাম-এ| রাস্তার ধারে এক মা-মেয়ে একটা দোকান চালায় | ম্যাগী অর্ডার করে বসে আছি| আজ মেয়েটা একাই দোকান সমলাচ্ছে - মা হয়তো কোথাও গেছে| ওর নাম সুমন রাওয়াত - কলেজ এর ফার্স্ট ইয়ার এ পড়ে| আজ কলেজ ছুটি| ওর নাম মনে রেখেছি দেখে ও খুব খুশি| ওদের বাগানে গরমকালে খুব আম আর কাঁঠাল হয়| আমের বোল আসতে শুরু করেছে অল্প স্বল্প| কোত্থেকে একদল হর্ণবিল হই চৈ করতে করতে এসে আমগাছের ওপর বসল| সুমন এর কোনো বিকার নেই - এসব ওরা রোজই দেখে|

আর কয়েক ঘণ্টা পরে আমাদের গাড়ি তীর বেগে ছুটে চলবে মোরদাবাদ বাইপাসের দিকে | পেরিয়ে যাবো কাশীপুরের জ্যাম, পেরিয়ে যাবো চূড়ামনির হেমপুর| হয়তো সাগর রত্না রেষ্টুরেন্টে খেতে ঢুকবো| সেই রমরমা আর নেই কোভিডের কারণে| কেমন একটা মনমরা ভাব|  

কিন্তু এখানে সুমন এক মনে ম্যাগী, অমলেট আর চা বানিয়ে চলবে| ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া আসবে কোশী নদীর দিক থেকে| হর্ণবিল গুলো উড়ে চলে যাবে - যেদিকে ওদের যেতে ইচ্ছে হবে| 

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


Saturday, July 16, 2022

বনঘাট - প্রথম সর্গ

 ভ্রমণ কাহিনী পড়ে আমি তেমন মজা পাই না| খুব কম ভ্রমণ কাহিনীই আমার মন কেড়েছে| তাই লেখার কথাও চিন্তা করিনি কখনো|  ভ্রমণ কাহিনী হবে এমন, যেন পাঠক পড়তে পড়তে মনে মনে সেখানে পৌঁছে যান | যেমনটি বর্ণনা দিতেন বিভূতিভূষণ| আর ভ্রমণ কাহিনী কেমন হবে না? যদ্দুর মনে পড়ছে, ফেলুদা বলেছিল "ভ্রমণ কাহিনী যেন  ট্রাভেল গাইড না হয়ে যায়|"  আমারও সেই ভয়| তাই  আমি লিখি নি বিশেষ| আমার এক পরিচিতজন একটি সাইট চালায় - ghumakkar.com| আমি একবার কোন এক  অপরূপ দেশে  গিয়েছিলাম যেখানকার কাহিনী নিয়ে হয়তো তখন অবধি কেউ লেখে নি তার সাইটে| আমাকে খুব জোর করেছিল লেখার জন্যে  - সে লেখাও হয়ে ওঠে নি| যদিও খুব চমত্কার ঘুরেছিলাম

সেবার  বনঘাট ঘুরে আসার পর কাউকে দু লাইন বর্ণনা দিয়েছিলাম  - সেও ইংরাজিতে - সে বলল, লেখাটা পড়ে তার নাকি মনে হয়েছে যে সে রামগঙ্গা নদীর সামনের পাহাড়টায় দাঁড়িয়ে আছে|  তাই শুনে ভাবলাম, একবার চেষ্টা করেই দেখি না! আর মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য আমার ভাষা হল বাংলা - তাই এই প্রচেষ্টাও মাতৃভাষাতেই| যদিও আজকাল আমার বাংলায় আকছার ইংরাজী আর হিন্দি ঢুকে পড়ছে| প্রবাসে থাকার ফল হয়তো| 

যাই হোক, আসুন বনঘাট যাওয়া যাক| নাম শোনেন নি তো? ভালোই হল - কল্পনার রঙ মেশাতে সুবিধে হবে| যেমন ধরুন কেদারনাথ অতি সুন্দর জায়গা - কিন্তু সেখানে তো গাদাগাদা লোক গেছে| কত লেখা লেখি| আমি আর নতুন কি দেব? তারচেয়ে যাই একদম আনকোরা একটা জায়গায় - যেখানে প্রতি পদক্ষেপেই নতুন কিছুর আকাঙ্খা .....

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

গজরোলা থেকে রওনা হতে হতে প্রায় সোয়া-নটা বাজলো| বিশেষ দেরি হয় নি| প্ল্যান অনুযায়ী নটার সময় বেরোনোর কথা| কিন্তু করোনার কারণে (নাকি করোনার করুণায়?) বিকানীরওয়ালার দোকানে একদম ভীড় ছিল না| তাই বেশ তাড়াতাড়িই  ব্রেকফাস্ট হয়ে গেল - গাবদা গোবদা স্যান্ডউইচ একটা করে|| আড়াই মাস আগেও এ রাস্তায় একবার এসেছি - রানিক্ষেতের দিকে যাচ্ছিলাম| কিন্তু সেদিন -ও বোধহয় এর চেয়ে বেশী ভীড় ছিল| আজ শুক্রবার বলেই কি এত ফাঁকা? রাস্তাও তো বেশ খালি ই ছিল| নয়ডা ছাড়ার পর, দেড় ঘণ্টায় প্রায় একশো  কিলোমিটার চলে এসেছি| ভেবেছিলাম ছটা নাগাদ বাড়ি থেকে রওনা হব - কিন্তু সেই পৌনে সাতটা হয়ে গেল| এখনো সূর্যোদয় দেরিতে হচ্ছে - ছটার সময় অন্ধকার|

এবার  ভাস্বতীর ড্রাইভ করার পালা| মোরাদাবাদ বাইপাসের কাছে রাস্তা বন্ধ দেখাচ্ছে গুগল| আমরোহা থেকে কি তাহলে শর্টকাট  নেব? কিন্তু সে রাস্তা কেমন কে জানে? একবার এদিকেই কালাধুঙ্গী যাবার সময় একটা শর্টকাট নিতে গিয়ে এক ভয়ঙ্কর খারাপ রাস্তায় পড়েছিলাম| রাস্তার ধারে দাঁড়াই| এক দাড়িওয়ালা মুসলিম চাচা দোকানে বসেছিলেন| পাশের অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তাটা দিয়ে  কাশীপুর যাওয়া যাবে কিনা জিজ্ঞেস করতে সোজাসুজি বারণ করে দিলেন - "হাই ওয়ে সে যাও বেটা, রাস্তা খোল দিয়া হ্যায়" |

 দেখতে দেখতে মোরাদাবাদ বাইপাস পেরিয়ে গেল - এই রাস্তাটা বরাবরই আমার ভাল লাগে| ভালো রাস্তা, ফাঁকা রাস্তা এবং দুপাশে যতদূর দেখা যায়, সবুজ ক্ষেত| তবে এই রাস্তাটা ছাড়ার পর  প্রায় দশ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ| বড় বড় গর্ত বাঁচিয়ে চলতে হয়| কিন্তু তারপরেই  কাশীপুর যাবার নতুন স্টেট হাইওয়ে|  সরু হলেও - এবড়ো খেবড়ো নয় , সুন্দর  রাস্তা| আবার দুপাশে সবুজের সমারোহ| মাঝে একটা চিনির ফ্যাক্টরী| ট্রাক্টর ভরে ভরে আখ চলেছে সেই ফ্যাক্টরীর দিকে| ট্রাক্টরের পেছনে ট্রেলারে ঠেসে ঠুসে প্রচুর আখ লাদাই করেছে| একজন ট্রাক্টরওয়ালা সেই আখ দিয়ে আমাদের গাড়ির গা-টা একটু চুলকে দিয়ে গেল| দেখতে দেখতে কাশীপুর| জানতাম যে ওখানে ফ্লাইওভার এর কাজ চলছে, রাস্তা খারাপ| ভাস্বতীর ছোট গাড়ি চালানোর অভ্যেস| বললাম আমায় গাড়ি দিতে| কিন্তু ও নারাজ| গাড়ি চালাতে কারো কারো সম্ভবত একটু বেশিই ভালো লাগে| আমার কিন্তু ড্রাইভারের পাশের সীটটাই পছন্দ - বেশ দুদিক দেখতে দেখতে যাওয়া যায়| যা ভয় পেয়েছিলাম, তাই - এক জায়গায় রাস্তা বন্ধ| সমস্ত গাড়িকে পাশের একটা অতি সরু গলি দিয়ে যেতে হচ্ছে| ভাস্বতীর রোখ চেপে গেছে - শেষমেষ সেই রাস্তাও পেরিয়ে গেল| আর কিছুক্ষণ পরেই রামনগর - যা  ছাড়ালেই  পৌঁছে যাবো গাছ গাছালির স্বর্গরাজ্যে| এতবার এসেছি, তবু আমার আশ মেটে না এদিকে আসার| 

এবার একটু চা খাওয়া যাক| এক সর্দারজীর দোকানে দাঁড়ালাম| এটা বোধ হয় উধম সিং নগর জেলা| সর্দারজীকে জিজ্ঞেস করলাম "এদিকে এত সর্দারের বাস কেন ?" উনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন "ভারতের কোনদিকে সর্দার থাকে না?" একটা বছর দশেকের মেয়ে এক প্যাকেট চিপস কিনে নিয়ে গেল| দেখি রাস্তার ধারে ওর পোষা ছাগলটা বাঁধা রয়েছে - মেয়েটা তার সঙ্গে চিপস ভাগ করে খাচ্ছে| কিছুদিন আগে একটা ভিডিও দেখেছিলাম, গরুতে ফুচকা খাচ্ছিলো| তাই ছাগলের চিপস খাওয়া তেমন আশ্চর্য করতে পারলো  না| তাছাড়া , বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অবাক হবার ক্ষমতটাও যেন অনেকটা  কমে যায়| 

আবার চলা| রামনগরের পর একটু পাহাড়ী রাস্তাও পড়বে - আর পাহাড়ে গাড়ি আমার হাতে| ওই যে দূরে ঝাপসা শ্লেট রঙের পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে| গাড়ির জানলার কাঁচ নামিয়ে দিই - ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়ায় আমেজ আসে| রামনগরে গাড়িতে তেল ভরে ঢুকে পড়লাম করবেটের পাড়ায়| বাঁদিকে রিজার্ভ ফরেস্ট আর ডানদিকে একের পর এক রিসর্ট| রিসর্ট গুলোর পেছন দিয়ে বয়ে যাচ্ছে কোশী নদী| এখন শুকনো| পাথরের মধ্যে দিয়ে সামান্য জল| অথচ একবার বর্ষাকালে এই নদীরই কি সাংঘাতিক রূপ দেখেছিলাম! কমাস আগেই কৌসানি থেকে ফেরার পথে কোশী নদীর ওপরের অংশটা দেখেছি| সে ছিল আরো পাথুরে| সামান্য তিরতিরে জল| 

আমডান্ডা গেট, গর্জিয়া মন্দির ছাড়িয়ে ধনগড়ি গেট পেরনোর  পর আশে পাশে টুরিস্টদের  গাড়ির সংখ্যা কমে এল| মোহন-এ রাস্তা দু ভাগ হয়ে যাবে| ডানদিকের রাস্তা যাবে ভাতরোঞ্জখান হয়ে রানিক্ষেত| আর আমাদের রাস্তা বাঁদিকে মরছুলা গ্রামের দিকে| এই সেই বিখ্যাত মোহন - যেখানকার মানুষখেকো বাঘের গল্প আমাদের অনেককেই শিহরিত করেছে -  বিশেষ করে যারা জিম করবেটের ভক্ত, তাদের | মোহনেও এখন দু একটা দোকানপাট আর রিসর্ট গজিয়ে উঠেছে - বছর দশেক আগেও প্রায় কিছুই ছিল না| একটা দোকানে গিয়ে বসি| লাঞ্চ আজ এখানেই হবে| দুই ভাই দোকান চালাচ্ছে| কোন কারণে দুজনের -ই কথা অত্যন্ত জড়ানো| জন্মগত কোনো রোগ| সোজা হয়ে দাঁড়াতেও অসুবিধা হচ্ছে| আকারে ইঙ্গিতে কথা হল| এদের দেখলে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়| তবুও কত মানুষ অসুখী| তারা  তাকিয়ে আছে তাদের চেয়ে বেশী পেয়েছে যারা - তাদের দিকে| পরোটা খেলাম| তেমন ভালো হয় নি কিন্তু গরম গরম - কাজ চলে গেল|     

ইতিমধ্যে বনঘাট থেকে ফোন এসে গেছে -  "আমরা সলুনার কাছে ব্রিজের সামনে অপেক্ষা করছি| কখন পৌঁছবেন? লাঞ্চ করবেন তো?" ছেলেটি ওখানকার ম্যানেজার - নাম ভূপি| বলি "আর মিনিট চল্লিশ| লাঞ্চ করে নিয়েছি|" মোহনের পর রাস্তা খুব আঁকাবাঁকা, পাহাড়ী| একটু সাবধানে চালাই| এদিকের জঙ্গল আরো ঘন| গর্জিয়া পর্যন্ত প্রচুর আম কাঁঠালের গাছ ছিল, ওদিকটায় পাখিও অনেক| এদিকে  চারপেয়ে বেশী| বার দুয়েক রাত্রিবেলা এসেছি - বেশ রোমাঞ্চকর| একবার এক ড্রাইভার এখানে লেপর্ড এর  চোখ দেখিয়েছিল| ভগবান জানে সত্যি লেপর্ড ছিল, না হরিণ! তবে এ রাস্তায় অনেককেই হাতির সামনে পড়তে শুনেছি|

ওই এসে গেল সলুনা| কতদিন বাদে এলাম| বাবা মা কে নিয়ে প্রথম এসেছিলাম পনের বছর আগে| তখন ছিল একটাই রিসর্ট| না, ভুল বললাম  - দুটো রিসর্ট| তার পরেও বার দুয়েক এসেছি| শেষ বোধ হয় দশ বছর আগে| সেবার রাস্তার ধারের জঙ্গলে বিশাল আগুন লেগেছিল| এখন দেখি আরো কিছু রিসর্ট হয়েছে| ইঁট, কাঠ, সিমেন্টের ছড়াছড়ি| একটা রিসর্ট তো বেশ দৃষ্টিকটু লাগলো - নদীর সেই নিরালা ভাবটাকেই নষ্ট করে দিয়েছে||

এবার রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে মাঠের ওপর| তরতরিয়ে ঢাল বেয়ে নিচে নামা| তারপর শুকনো নদীখাত - পাথুরে জমিতে লাফাতে লাফাতে গাড়ি পৌঁছে গেল বালুলি সাস্পেন্শন ব্রিজের পাশে, যেখানে অপেক্ষা করছে ভূপি, আশীস আর আরো দু একজন|

ভূপি আমাদের আশীসের সঙ্গে রওয়ানা করিয়ে দিল| দু কিলোমিটার মতন হাঁটতে হবে| বাকিরা অপেক্ষা করতে লাগলো আরো কোনো অতিথির জন্য| আমাদের সঙ্গে লাগেজ খুবই কম| আশীসের সঙ্গে গল্প করতে করতে সরু পাহাড়ী রাস্তা ধরে চলেছি| ব্রীজ পেরিয়ে বাঁ দিকের রাস্তা| রামগঙ্গা নদী চলেছে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে| ক্রমশ নদী বাঁ দিকে অনেকটা নিচে চলে গেল - অর্থাৎ আমরা অনেকটা ওপরে উঠে  গেলাম| দু একটা রিসর্ট গজিয়ে উঠছে এদিকেও| একটা গ্রাম পেরিয়ে আবার রাস্তাটা নিচের দিকে নামতে লাগলো| অনেকক্ষণ থেকে একটা কুকুরবাচ্ছা আমাদের সঙ্গ নিয়েছে| দেখে মনে হল বেশ ক্ষুধার্ত| কুকুরদের প্রতি ভাস্বতীর একটু দুর্বলতা আছে আর সেটা ওরা ঠিক বুঝতে পারে| এই কিছুদিন আগেই কর্ণাটকের এক পাহাড়ে একই  দৃশ্য দেখেছি - একটা পাহাড়ের ওপর থেকে পিছু নিয়ে নিচে রাস্তায় দোকানগুলো  অবধি একটা কুকুর আমাদের সঙ্গে সেঁটে ছিল|  যেন রিটার্ন ফ্রম মহাপ্রস্থান| নিচের দোকান থেকে কিনে ভাস্বতী সেটাকে বিস্কুট খাইয়েছিল| এখানেও যথারীতি ভাস্বতী ব্যাকপ্যাক খুলে কিছু বিস্কুট বার করে কুকুরটাকে খাওয়াল| ভাবলাম এবার ব্যাটা আমাদের সঙ্গ ছাড়বে| কিন্তু সে আমাদের সঙ্গে আটকে রইল| ধুলিময়  রাস্তায় চলেছি| ধুলোর ওপর নানান আঁকিবুঁকি বুঝিয়ে দিচ্ছে এই রাস্তায় অনেক জন্তু জানোয়ারের আনাগোনা| একটা টায়ারের দাগও  দেখলাম| আশীস বলল খানিকটা রাস্তা জীপেও যাওয়া যায়| আর একটু বেশী খরচ করলে নদীর ধার দিয়ে দিয়েও জীপে  করে যাবার ব্যবস্থা আছে| অবশ্য সে অভিজ্ঞতা আমাদের আগে ছিল| ওই পথেই সন্ধের অন্ধকারে জীপে চড়ে  নদীর অল্প জলের ওপর দিয়ে পাথরের ওপর ঝাঁকুনি খেতে খেতে এসেছিলাম অনেক দিন আগে|

এসব কথা বলছি - হঠাৎ চোখে পড়ল বেশ বড়সড় একটা পায়ের ছাপ| পাঁচটা আঙ্গুলের টাটকা দাগ বুঝিয়ে দিচ্ছে এই পথে যে বাঘটা গেছে, সে খুব বেশিক্ষণ আগে যায় নি| আশীস বলল যাবার সময় এরকম কোনো দাগ সে  দেখে নি| ভাস্বতী বেশ ভয় পেয়ে যায় এসব সময় - কিন্তু আশীস অভয় দিল "আমরা তো আর বাঘের নর্মাল খাদ্য নই"| নর্মালই হই বা এবনর্মাল, আমাদের চলার গতি বেড়ে গেছে| আবার আমরা একদম নদীর ধারে| দেখি একটা ভেলা বাঁধা রয়েছে| অবশ্য এখন যা জল, হেঁটেও পেরিয়ে যাওয়া যায় - খুব বেশী হলে কোমর অবধি হবে | তবে জলের স্রোত ভালোই| ভেলাটা বাঁশের তৈরি| নিচে গাড়ির চাকার দুটো টিউব আটকে রেখেছে| এপার থেকে ওপারে দড়ি বাঁধা| সেই দড়ি টেনেটেনে আশিস আমাদের পার করে দিল| কুকুর বাচ্ছাটা এখান থেকেই ফিরে গেল| যাবার আগে নদীর জল খেল পেট ভরে| বিস্কুট খেয়ে বোধ হয় গলা শুকিয়ে গেছে ওর|

নদী পেরিয়ে  ডানদিকে ঘুরে আবার হাঁটা| এক জায়গায় এসে আশীস বলল এরপর নাকি আর মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না| চটপট মেয়েকে একটা ফোন সেরে এগিয়ে চলি| পরে ভূপি বলেছিল বিএসএনএল এর নেটওয়ার্ক বনঘাটেও পাওয়া যায় কখনো সখনো| আমরা এবার প্রায় গন্তব্যে এসে গেছি| চারিদিকে গাদাগাদা হাতির নাদা| একসপ্তাহ আগেই নাকি একদল হাতি ঘুরে গেছে| ইলেকট্রিক্যাল ফেনসিং দেওয়া একটা অঞ্চলে ঢুকে পড়লাম| পেছন ফিরে দেখি অন্য অতিথিদের নিয়ে ভূপিও জীপ থেকে নামছে| একটা খোলামেলা ডাইনিং এরিয়া| একটু বসি| দেয়ালে জিম করবেটের কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবি|একজন এসে লেবুর শরবত এগিয়ে দিল| ঢকঢক করে দু গ্লাস খেয়ে নিলাম| খাতায় নাম এন্ট্রী করতে হল| তারপর গেলাম আমাদের ঘরে| মাটি আর পাথরের ঘর| মোটা দেয়াল| তিনজনের থাকার মত ব্যবস্থা| মেয়ে হোস্টেলে না থাকলে আসতে পারতো| সেই রকম ই প্ল্যান ছিল গতবছর| কিন্তু করোনা এসে সব প্ল্যান বিগড়ে দিল|

ঘরটা বেশ ঠান্ডা| তার ওপর ফ্যানও আছে| বাথরুমের জলও খুব ঠান্ডা| পরে জেনেছি এদের জলের সাপ্লাই হল নদীর ওপারের একটা ঝর্ণা| খাবার জলও তাই - কোনো ফিল্টার এর ব্যবস্থা নেই |  হাত মুখ ধুয়ে বাইরের মোড়াতে গিয়ে বসি| সামনেই একটা পলাশ গাছ ফুলে ফুলে লাল| তার ওপর হৈ চৈ করতে করতে এক ঝাঁক টিয়া এসে বসল| তাদের কারো কারো পুরো মাথাটাই লাল| কারো বা শ্লেট রঙের| পরে জেনেছিলাম  এরা হল প্লাম হেডেড প্যারাকীট আর গ্রে হেডেড প্যারাকীট| ফুলের মধ্যে থেকে কিছু একটা ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে | ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ছে  মাটিতে| বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে আজ | অনেক ভোরে উঠেছি, তাই  আমেজে চোখ জুড়ে আসছে|| ঘরে গিয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ি|

সন্ধের আগেই ঘুম ভাঙল| একটা খোলা জায়গায় চা পাকোড়ার আয়োজন হয়েছে| অন্য অতিথিদের সঙ্গে আলাপ হল| বাবা মা ছেলে আর মেয়ে| তারা দুপুরে ঘুমোয় নি| বিকেলে একটু জঙ্গলে ঘুরতে গেছিল| খুব ময়ূরের ডাক শোনা যাচ্ছে পেছনের পাহাড়টা থেকে| পাখিদের কিচিমিচি বেড়ে গেছে দশগুণ| ওদিকে দেখি একটা মাচান| তারপর বেড়ার বাইরে একটা ওয়াটার হোলের ওপর চোখ পড়ল| এক কাকার এর সঙ্গে চারি চক্ষুর মিলন| কাকার হল বারকিং ডিয়ার| অনেকটা কুকুরের ডাকের মতই ডাক| প্রথম যেবার কাকারের ডাক শুনি, আমি কুকুরের ডাক ভেবে ভুল করেছিলাম| বাঘ বা লেপার্ড দেখলে এরা  পুরো জঙ্গল কে সাবধান করতে ওস্তাদ|  "আরো এক কাপ চা খাবেন নাকি?" - তাকিয়ে দেখি সুমন্ত ঘোষ হাজির| উনিই এই জঙ্গল রিসর্ট এর  মালিক| একদম আধুনিক জিম করবেট| "ওই দেখুন -  হোয়াইট ক্রেস্টেড লাফিং থ্রাস   - কি অদ্ভুত দেখতে পাখিগুলো না, যেন এই পৃথিবীর নয়? একটু অপেক্ষা করুন, এক্ষুনি সজারুগুলো আসবে|" ঘোষবাবু অনর্গল বলে যেতে থাকেন| "আসুন, কর্নেল চূড়ামনির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই |" দেখি সেই বাবা-মা-ছেলে-মেয়ের দলের দলপতি| 

চূড়ামনি মজার লোক| বললেন "বসন্ত বাবু কা সাথ" পরিচয় না ঘটলে  এখানে ওনার আসাই হতো না| তারপর সেই 'বসন্ত বাবু'র উদ্দেশ্যে অনেক প্রশংসা বাক্য| কিছু কথার পর উনি আবার বললেন যে ভাগ্যিস "হেমন্ত বাবু কা  সাথ" পরিচয় হয়েছিল| নইলে এত সুন্দর জায়গায় ওনাদের আসা অসম্ভব ছিল| এতক্ষণে বুঝি যে উনি 'সুমন্ত' নামটা গুলিয়ে ফেলেছেন| জিজ্ঞেস করলাম "মশাই-এর  কোথা থেকে আসা হচ্ছে?"

-"জী, উও জগাহ কা নাম হ্যায় হেমপুর - জাস্ট এবাউট ফিফটি সিক্স কিলোমিটারস ফ্রম হিয়ার|" তারপর উনি হেমপুর এর গুনকীর্তন করতে বসলেন| সে এক অদ্ভুত স্বর্গরাজ্য| বাড়ির পেছন থেকেই শুরু হয়ে গেছে ঘন জঙ্গল| কত রকমের গাছ গাছালি আর পাখি সেই জঙ্গলে| মাঝে কোথাও কোথাও শুকনো নদীখাত| হয়তো বা বালির ওপর দিয়ে তিরতিরে একটু জল| ওখানে ঘোড়া নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বাঘের দর্শনও পেয়েছেন| হাতিও এসেছে কখনো| ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় একটা মিষ্টি গন্ধ লেগে থাকে সেই জঙ্গলে| হালকা রোদ্দুর গায়ে মেখে ঘুরতে ঘুরতে কেমন যেন নেশা ধরে যায়| এতদূর বলে ভদ্রলোক একটা গ্লাসে চুমুক দিলেন| বুঝলাম আপাতত ওনার অন্য একটা নেশা সবে ধরতে শুরু করেছে - অন্ধকারের মধ্যে এতক্ষণ খেয়াল করি নি| কিন্তু উনি জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া নিয়ে করেনটা কি? উত্তরটা ওনার বসন্ত হেমন্ত সুমন্ত বাবুই দিলেন| চূড়ামনি একজন পশু চিকিৎসক - হেমপুরে মিলিটারিদের ঘোড়ার ট্রেনিং হয়, উনি সেখানকার ডাক্তারবাবু| এরপর মোবাইল বেরিয়ে এল আর সেখানে দেখলাম জঙ্গলের মধ্যে গাদা গাদা ঘোড়ার ছবি| নাঃ, চূড়ামনি গুল মারেন নি দেখছি| ভাবলাম বলি, এই মহান্ত বাবুর সঙ্গে পরিচয় না ঘটলে আজ কর্নেল ঘোড়ামনির এই সমস্ত গল্প শুনতে পেতাম না| 

হঠাৎ ঘোষবাবু বলে উঠলেন, ওই যে, সজারুগুলো এসে গেছে| সামনের নিচু জমির দিকে ওনার পেছন পেছন আমরা দৌড়ই| কোথায় সজারু? "ওই যে ওই যে" - ঘোষবাবুর চাপা গলা| তারপর উনি আরো উত্তেজিত "আরে এ তো একটা সিভেট - ওটাকে দেখেই সজারুগুলো পালিয়েছে|" সিভেট বাবাজিও  ততক্ষণে আমাদের দেখে পালিয়েছেন - শুধু দেখলাম অন্ধকারের মধ্যে কিছু একটা ছুটে গেল আর তার পেছন পেছন ঘোষবাবুর জোরালো টর্চের আলোটা তাড়া করল |

আবার ফিরে এলাম আমাদের চা খাবার জায়গায়|চূড়ামনির নেশা তখন চুড়ার কাছাকাছি| সমানে কথা বলে যাচ্ছেন "আই  অ্যাম চূড়ামনি সুব্রমনি অরিজিনালি ফ্রম মথুরা"| 

-"বলেন কি মশাই? আপনার কথা শুনে তো দক্ষিণ ভারতীয় বলে বোঝাই যায় না|"

চূড়ামনি হ্যা  হ্যা  করে হাসতে হাসতে আরো একটা চুমুক দিলেন| এবার ওনার ছেলে অমিত  মুখ খুলল "ওটা বাবার একটা জোক - বাবার নামে কোথাও সুব্রমনি নেই|" চূড়ামনি হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়েন - "হেঃ হেঃ হেঃ, আই  অ্যাম ফ্রম মথুরা, নট ম্যাড্রাস |"

হঠাৎ একটা বারকিং  ডিয়ারের ডাক শুনে সবাই চুপ করে যাই| পেছনের পাহাড়টা থেকে ডাকটা এসেছে| একটু পরেই আবার| ঘোষবাবু বোঝান "ওটা কোনো বাঘ বা লেপার্ড দেখে থাকবে|" এইবার চূড়ামনির মেয়ে মুখ খোলে - "যখন আমি স্কুল এ পড়তে হেমপুর এ থাকতাম, বাড়ির পেছনের রাস্তায় ভাই এর সঙ্গে খুব সাইকেল চালাতাম - একদিন একটা লেপার্ডকে ওখান দিয়ে যেতে  দেখার পর থেকে আমাদের ওদিকটায় সাইকেল চালানোই বন্ধ হয়ে গেল|"

-"বল কি? বাড়ির পেছনে লেপার্ড?"

এবার অমিত  জবাব দেয় "ওদিকে একটা স্লটার হাউস ছিল - পরে  জেনেছিলাম, সেখানে কখনো সখনো লেপার্ড চলে আসে|"

"ডিনার ইস রেডি" - ভূপি এসে খবর দেয়|

"এতো তাড়াতাড়ি? না ভাই ভূপি| তুমিও এসে বসো, একটু আরো গল্প-গুজব হোক|" ভূপিও দেখি গল্প করতে ওস্তাদ আর ঘোষবাবুর মতই জঙ্গল ভালোবাসে| বলল ওর বাড়ি কুলুতে| এক ছোট ভাই আছে| দিদির বিয়ে হয়ে গেছে| ট্যুরিসম নিয়ে পড়াশোনা করে দিল্লিতে চাকরি করত| কিন্তু দিল্লিতে ও হাঁপিয়ে উঠেছিল| বনঘাটে এসে দারুন খুশি|

ওদিকে শুনি চূড়ামনি ঘোষবাবুকে বোঝাচ্ছেন "কাছের কোনো বাজারে আপনার লোক পাঠিয়ে দেবেন| ওদের পচা শাক সবজি যেগুলো ফেলে দেয়, নিয়ে চলে আসবে| তারপর আপনার ওই কাঁটা তারের বেড়ার ঠিক বাইরে পুঁতে দেবেন| দেখবেন কত রকমের জন্তু জানোয়ার ভীড় করবে|"

আইডিয়াটা আমার মোটেই ভালো লাগলো না| কিন্তু চূড়ামনি এখন রঙিন, তাই আর ঘাঁটালাম না| ভূপির  সঙ্গেই লেগে রইলাম| লক্ষ করলাম, ভূপি যদিও আমাদের সঙ্গে কথা বলছে, ওর কানগুলো যেন জঙ্গলের দিকে খাড়া| কোথাও কোনো একটু আওয়াজ হলেই চুপ করে শুনছে|

"চলুন, খেয়ে নি| কাল ভোরবেলা আবার জঙ্গলে ঘুরতে যাবো|" ঘোষবাবুর কথা যুক্তিসঙ্গত|

ডাইনিং এরিয়া তে গিয়ে দেখি বেশ কিছু মোমবাতি জ্বলছে| বাইরে রাস্তার ধারে দু একটা লন্ঠন| ঘোষবাবু বললেন "ঘরগুলো ছাড়া আর কোথাও ইলেকট্রিক লাইট রাখি নি - বেশ একটা রোমাঞ্চকর ভাব থাকে|"

ঠিক কথা| রাস্তার ওপর কোথাও  থেকে একটা সাপ যদি  চলে আসে এই ভেবে খুব রোমাঞ্চ হচ্ছিল|

খাবার দাবার বেশ ভালো দেখলাম| ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি, মাংস, মিষ্টি  - চমৎকার  রান্না| "কে রেঁধেছে ভাই?" - ভাস্বতীর প্রশ্ন| 

"আমাদের হেড কুক হল হরীশ" - ভূপি উত্তর দেয়|

"আপনাদের এখানে তো শুনি নদীতে প্রচুর মাছ - আপনারা ধরেন না?"

ঘোষবাবু বোঝান "মাছ ধরার পারমিট লাগে এখানে| তবে হ্যাঁ, মাছ প্রচুর| আমি নিজেই ২৫  কিলোর মাশীর ধরেছি|  আপনারা কাল সকালে নদীর এদিকটায় গিয়ে দেখবেন - মনে হবে জলের চেয়ে মাছ বেশী|" 

"আর জল এতো পরিষ্কার আপনাকে কি বলব" এবার ভূপি খেই ধরে, "একবার আমি একটা ছোট ড্রোন উড়িয়েছিলাম - অনেক উঁচু থেকে জলের ছবি নিয়ে দেখি তাতেও মাছগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে|"

ঘোষবাবু বলেন "আপনি করবেটের  Fish of my dreams লেখাটা পড়েছেন? আমাদের লাইব্রেরী থেকে নিয়ে পড়ে দেখবেন - যদিও জায়গার নাম লেখা নেই, কিন্তু ওই ঘটনা এই বনঘাটের| ব্রিটিশরা এখানে নদীর ধারের জঙ্গলগুলোর  গাছ কেটে কেটে একদম সাফ করে দিত যদি না  রামসে সাহেব  ----"

"মুকেশ টর্চ দো জলদি - লগ রাহা হরিশ আয়া" ভূপির  উত্তেজিত গলা ঘোষবাবুকে চুপ করিয়ে দেয়| আমি ভাবি কুক হরিশ এসেছে তো এতো উত্তেজনা কিসের?

টর্চের আলো পড়ল সামনের একটা বেদীর ওপর - কে যেন শুয়ে রয়েছে| না, ওটা তো একটা বুদ্ধমূর্তি - শয়নমান| তারপর ই দেখলাম বিশাল গাছটার নিচে আলো আঁধারীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রমাণ সাইজের একটা  সজারু| তাহলে হরিশ কই? ভূপি বুঝিয়ে দেয় "সজারুগুলোর আমি  নাম রেখেছি, এটার নাম হরিশ|" বুঝলাম ভূপিকে যতটা নিরীহ ভেবেছিলাম, ও ততটা নয়|

আরো খানিকটা ভাত আর চিকেন নিয়ে বসি| বেড়ে রান্না করেছে আর খিদেটাও পেয়েছে জোর| 

"ওই বুদ্ধমূর্তি কে বনালো?"

-"ওঃ, ওটা আমি ভুবনেশ্বর থেকে অনিয়েছি" - ঘোষবাবুর দেখি আর্ট এর দিকেও একটু ঝোঁক আছে| কিন্তু ঘোষবাবু আবার জঙ্গলের গল্পে ফিরে আসেন| "কোভিডের সময় আমাদের অবস্থা এতো খারাপ ছিল - ভাবি নি যে আবার চালু করতে পারব| এখানে বিদেশীদের ভীড়ই বেশী ফলে  গতবছর তো একদম শুন শান  ছিল| কিন্তু আমি এই জায়গাটা বড্ড ভালবাসি| আবার দাঁড় করিয়েছি| সেবার এক ভদ্রলোক এটা  কেনার জন্য প্রচুর টাকা অফার করেছিলেন| লোভ হয়েছিল|কিন্তু ভেবে দেখলাম, এরকম আরো একটা জায়গা আমি আর কিনতে পারব না জীবনে| সস্তা গন্ডার সময় কিনে ফেলেছিলাম| প্রথমে তো স্রেফ ফিশিং ক্যাম্প ছিল| তারপর আস্তে আস্তে  গড়ে তুলেছি| বেশির ভাগ -ই লোকাল রিসোর্স দিয়ে বানানো| আগে তো বেড়া দেওয়াও  ছিল না - এইখান অবধি হাতি, হরিণ বাঘ সব আসত| কি যে ভালো লাগতো এই ভেবে যে এটা আমার নিজের জঙ্গল| ট্যুরিস্টদের শান্তির জন্য যদিও ইলেকট্রিকাল ফেনসিং লাগিয়েছি এখন, কিন্তু সেটাও স্রেফ সামনের দিকটায়| সারাদিন অবশ্য ওই তারে  কারেন্ট থাকে না - শুধু রাত্রে অন করা হয়| "

"হাতি বা বাঘ অ্যাটাক করে না?" - ভাস্বতীর প্রশ্ন|

"আজ অবধি তো করে নি| যেখানে জঙ্গল ভালো আছে, সেখানে ওদের খাবারও আছে| মানুষের সঙ্গে কনফ্লিক্ট নেই| আমরা তো আর ওদের ন্যাচারাল খাদ্য নই|"

"আপনার নিজের আদি বাড়িটা কোথায়?"

-"আমার বাবা আর্মির লোক, তাই ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি সারা জীবন| গুরখা রেজিমেন্টে ছিলেন বাবা| বলতেন কাজের জায়গার ভাষাটা ভালো জানা  দরকার| তাই বাড়িতে বাংলার চেয়ে বেশী নেপালি বলতাম আমরা| আমার ভাই আছে কুমায়ুন রেজিমেন্টে - সেই একই ব্যাপার, চমৎকার  কুমায়ুনি বলে| অবশ্য আমিও বলি, কারণ আমার বউ কুমায়ুনি| আমার মা আসাম এর মেয়ে| আমি নানা রকম  কাজ করেছি এদিক ওদিক | এখন থাকি রামনগর আর কলাধুঙ্গীর মাঝামাঝি একটা জায়গায়| ভালোই আছি| শহর আমার ভালো লাগে না| বড় মেকী মানুষজন| শহর থেকে কেউ কখনো ডাকলেও যেতে ইচ্ছে করে না| অথচ গ্রামে যখন কোনো একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানেও নিমন্ত্রন আসে, আমি চলে যাই| কোথায় যেন একটা আত্মিক টান অনুভব করি|"

আমাদের খাওয়া  দাওয়া শেষ| শুভরাত্রি বলে বিদায় নিই| চূড়ামনির দল আগেই চলে গেছে চটপট খেয়ে| আমাদের ঘর অবধি এগিয়ে দিতে আসে ভূপি|

অনেক দূরে পাহাড়ের ওপর দেখি আগুন জ্বলছে | ভূপি বলল দাবানল - এখন কদিন এরকম চলবে - তারপর বৃষ্টি হবে আর আগুনও নিভে যাবে| "কেন, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে কিছু করে না আগুন নেভানোর জন্য?"

"কোথায় কোথায় কত আগুন আর নেভাবে? লোকজন অসাবধান| বিড়ি খেয়ে ঝোপের মধ্যে ছুড়ে ফেলে চলে আসে|"

"ঘোষ সাহেব জঙ্গলের নামে পাগল" ভূপি বলতে থাকে| "সেবার অস্ট্রেলিয়ার থেকে একটা দল আসবে, একটা ভালো বিজনেস করব আমরা, ইমপর্ট্যান্ট মিটিং চলছে - কণফারেন্স কল| হঠাৎ "লীওথ্রিক্স লীওথ্রিক্স" বলতে বলতে উনি মিটিং ছেড়ে হাওয়া| কি ব্যাপার? না কতকগুলো রেড বিলড লীওথ্রিক্স দেখতে পেয়েছেন| কাল সকালে যাবেন ওনার সঙ্গে জঙ্গলে, দেখবেন ওনার জঙ্গল প্রেম|"

"কাল তুমি যাবে না জঙ্গলে ঘুরতে?"

"না, আমার একটু কাজ আছে এদিকে| তার আগে আপনাদের ব্রেকফাস্টটাও প্যাক করার ব্যবস্থা করতে হবে| যান, ঘুমিয়ে পড়ুন এখন| সকল ছটার সময় ডাইনিং এরিয়া তে এসে চা খেয়ে নেবেন| আর সকালে গরম জল লাগলে বলে দিন, পাঠিয়ে দেব|

সকাল সাড়ে পাঁচটার সময় গরম জল পাঠাতে বলে আমরা ঢুকে যাই ঘরে| যাবার আগে ভূপি আর একটু ভয় দেখিয়ে যায় "জুতো পরার আগে একটু দেখে নেবেন - অনেক সময় বিছে বা সাপ ঢুকে বসে থাকে|"

বিছানায় গিয়ে দেখি সেখানে আবার যত্ন করে হট  ওয়াটার ব্যাগ রেখে দিয়ে গেছে কেউ| লেপের তলায় আবার বিছে টিছে নেই তো? আর থাকলেই বা কি? ওই তো ঘোষবাবু বললেন - "নো হিউম্যান অ্যানিম্যাল কনফ্লিক্ট হিয়ার|" বাইরে একটা নাইট-জার ডেকে চলেছে| সেই একটানা আওয়াজ শুনতে শুনতে কোনো এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি|

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

ভোর পাঁচটা নাগাদ ঘুম ভাঙল। বাইরে অন্ধকার| আস্তে-ধীরে নড়েচড়ে বিছানা ছাড়তে আরো আধঘণ্টা লেগে গেল| বেশ ঠান্ডা লাগছে| ইতিমধ্যে বালতি করে গরম জল এসে গেছে| ছটার মধ্যে আমরা দুজনেই তৈরি| বাইরে হালকা আলোর রেখা, দু একটা পাখির কিচিমিচি| ডাইনিং এরিয়া তে গিয়ে দেখি চূড়ামনিরা চা খাচ্ছেন| আমরাও চা আর বিস্কুট নিয়ে বসে পড়লাম| সূর্য উঠেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ চারিদিকেই উঁচু উঁচু পাহাড়| তবে আলো ফুটেছে|  ঘোষবাবু কাঁধে বাইনাকুলার নিয়ে হাজির| প্রথমেই উনি কিছু নির্দেশ দিয়ে দিলেন| কেউ তাড়াহুড়ো করবেন না, পাহাড়ে ওঠার সময় সাবধানে উঠবেন, এক লাইনে চলবেন, কথা আস্তে বলবেন - এইসব | তারপর এলেন আসল কথায়| যদি বাঘ বা লেপর্ড সামনে এসে যায়, পেছন ফিরে দৌড় লাগাবেন না - তাতে ওরা মনে করবে আপনি ওদের শিকার| আর যদি হাতি এসে যায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই জায়গা ত্যাগ করবেন| হাতি কত স্পীডে দৌড়তে পারে আর কত ভালো পাহাড়ে চড়তে পারে - আপনাদের হয়তো সেই ধারণা নেই| সঙ্গে নিজের বাইনাকুলার আর জল রাখবেন|

আমরা গেট দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম| এটা অন্য গেট, এখান দিয়ে আমরা ঢুকি নি কাল | সামনেই একটা বন ফায়ার করার জায়গা| একটা সম্বর ঝোপের মধ্যে ছিল - হঠাৎ আমাদের বেরিয়ে আসতে দেখে অদ্ভুত   একটা আওয়াজ করে পালিয়ে গেল| 

জয়গাটার একটা বিবরণ দিয়ে দেওয়া  যাক এবার| পাহাড়ের গায়ে একফলি লম্বা সমতল জমিতে এই রিসর্ট -  ক্যাম্প বলাই ভালো যদিও| পূর্ব পশ্চিম বরাবর লম্বাটে জমিটা| কাল আমরা ওই পূর্ব দিকের গেটটা দিয়ে ঢুকেছি| পশ্চিমেও একটা গেট আছে - তার পেছনে ঘন জঙ্গল|  দক্ষিণে ক্যাম্প এর গায়েই জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়| উত্তরেও   একটা গেট - যেটা দিয়ে আমরা এক্ষুনি বেরোলম| আমাদের থাকার ঘরটা এই গেট এর সামনেই| বেরিয়ে একটু ঝোপঝাড় পেরলেই রামগঙ্গা নদী বয়ে চলেছে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে, অর্থাৎ পূর্ব থেকে পশ্চিমে| নদীর  ঠিক ওপারেই খাড়া পাহাড়| নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বেশ দূর অবধি নদীর গতিপথ টা দেখা যায় - বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে সশব্দে বয়ে চলেছে| আর কোথাও কোনো শব্দ না থাকায় একটা নেশার মত লাগে| নদীর দুপাশেই পাহাড় - ও পাশের পাহাড়টা একদম নদীর ধার ঘেঁষে| দূরে নদীটা বেঁকে পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে - দুই প্রান্তেই|

আকাশে বেশ কিছু ঈগল উড়ছিল| তার মধ্যে একটা মাঝে মধ্যে তীক্ষ্ণ চিৎকার করছিল - ঘোষবাবু না দেখেই বললেন "সারপেন্ট ঈগল"| বেশ আলো ফুটেছে এতক্ষণে| যদিও সূর্য এখনো পাহাড়ের আড়ালে| আমরা নদীর ধার দিয়ে পাথরে হোঁচট খেতে খেতে পশ্চিম দিক বরাবর চললাম| দেখি ওখানেও নদী পেরোনোর জন্যে একটা ভেলা রাখা আছে| দুজন দুজন করে পেরনো  হল| সব মিলিয়ে আটজন চলেছি| চুড়মনিরা চারজন, আমরা দুজন, ঘোষবাবু আর মুকেশ বলে একটি ছেলে| মুকেশ ঘোষবাবুর-ই সাগরেদ - জঙ্গল সম্বন্ধে বেশ ওয়াকিবহাল| মুকেশ বয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের ব্রেকফাস্ট| নদী পেরিয়ে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে কিছুদূর যাওয়ার পর পাহাড়ে চড়া শুরু হল| বেশ খাড়া রাস্তা, আলগা পাথরের ওপর দিয়ে| হড়কে যাবার ভয়| তার ওপর আবার চতুর্দিকে হাতির নাদা| অর্থাৎ এই রকম চড়াই এর রাস্তাতেও ওদের বেশ আনাগোনা আছে| মিনিট পনেরো ওঠার পর আবার একটু  সমতল জমি| অনেকেই অল্প স্বল্প হাঁফাচ্ছে| এগিয়ে চলি| রাস্তাটা আরো ওপরের দিকে উঠে গেছে| উঁচু থেকে নদীর গতিপথটা অনেকটা দেখা যাচ্ছে এখন| আমরা বোধহয় ৫০০ মিটার ওপরে| 

 রাস্তাটা ক্রমশ উপরের দিকে উঠেছে মোটামুটি ভাবে নদীর সঙ্গে সমান্তরালে| আমরা রেসর্ট থেকে ক্রমশ আরো দূরে চলে যাচ্ছি |ঘোষবাবু বললেন ওনার  ওয়াকি-টকীটা  টা খুব জোরালো ওটা দিয়ে অনেক দূর থেকেও রিসোর্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়|  হঠাৎ দেখি নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে বিশালকায় একটা কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে|মুকেশ বলল "আরে এটা এখনো যায়নি?" কি ব্যাপার? না একটা ষাঁড়  নাকি গত দু একদিন জঙ্গলের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে| মুকেশের বক্তব্য - যে কোনদিন এটাকে  বাঘে তুলে নিয়ে যাবে| জিজ্ঞেস করলাম "ষাঁড়টা  গ্রামে ফিরে যাবে না?" মুকেশ বলল "ভগবান জানে! হয়তো গ্রামে তেমন খাবার দাবার জুটছিল না| মনে মনে ভাবি - গ্রাম ছেড়ে মানুষ যায়  শহরে আর এই নন্দীবাবু চলেছেন জঙ্গলে|

কিছু ছড়ানো-ছিটানো পাথরের উপর আমরা বসলাম খানিকক্ষণ| নিচে  নদী বয়ে চলেছে| তার শব্দ এখান অবধি আসছে| মনে হচ্ছে  যেন একটা এম্ফিথিয়েটার বসে আছি - এখনই সামনে কোন নাটক শুরু হয়ে যাবে| হয়তো বা একটা হরিণ  জল খেতে আসবে আর  একটা বাঘ চুপিসাড়ে জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসবে তাকে ধরতে| ঝটপট করে একটা ময়ূর উঠে গিয়ে বসবে একটা গাছের ডালে| তারপর তার তীব্র  চিত্কারে ভরিয়ে দেবে জঙ্গল|   কিন্তু কল্পনা ছেড়ে এখান থেকে উঠতে হল - আরো পথ বাকি যে!

একটা কোনো পাখির ডাক সত্যিই ভেসে এল| আমি জ্ঞানীর মত বললাম "সারপেন্ট ঈগল|" ঘোষবাবু বললেন "না, এটা গ্রেট বারবেট|" 

-"বলেন  কি? বারবেট এরকম শব্দ করে?" 

-"আরো অনেক রকম করে| নানা ধরনের বারবেট  আছে|" 

ঘোষবাবু বাইনাকুলার চোখ রেখে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করেন| কথা বলতে থাকেন - "জঙ্গলে যারা আসে তারা কত যে দামি দামি ক্যামেরা আর লেন্স সঙ্গে করে আনে!" আমি কিন্তু তাদের বলি প্রথমেই কিনুন একটা ভালো বাইনোকুলার| ওটা না থাকলে জঙ্গলের অনেক কিছুই  অধরা থেকে যাবে|"

 এবার আমাদের গতিপথ বদলায়|  নদীর থেকে আরো দূরে চলে যাই,  কিছুটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ি| সামনে খাড়া পাহাড়| পাথরের ওপর পা টিপে টিপে খুব সাবধানে উঠি| ভাগ্যিস আশেপাশে কিছু গাছপালা ছিল সেগুলো ধরে উঠতে সুবিধে হচ্ছিল|খানিকটা ওঠার পর জলের  শব্দ পেলাম| "পৌঁছে গেছি" - ঘোষবাবু ঘোষণা করলেন| দেখি একটা ছোট্ট পাহাড়ি ঝরনা তার নিচে কিছু পাথর ছড়িয়ে রয়েছে সে ঝর্নার জলে চান করছে একটা খুব ছোট বাদামী রং-এর পাখি যার ব্রহ্মতালুটা  সাদা রংয়ের|মুকেশ বলল ওটার নাম হোয়াইট ক্যাপড  রেডস্টার্ট| আমরা বেশ  হাঁফিয়ে  গেছি  |পাথরের উপরে বসি | মুকেশ তার ঝোলা খুলে  আমাদের জন্য খাবার বার করে|পরোটা, সবজি, আচার, ইডলি, ফল, চা -  ভালোই ব্যবস্থা| 

 বেশ খিদে পেয়েছিল| খাওয়া দাওয়া সেরে আরো অনেকক্ষণ  বসা  গেল| বড়হয় ঘন্টাখানেক হবে| রোদ্দুর এখানটায় কম| একটু স্যাঁতস্যাঁতে ভাব| ঝর্নার থেকে জলের ছিটে গায়ে এসে লাগছে|  সেই পাখিটা, যতক্ষণ আমরা রইলাম  ততক্ষণ জলের আশেপাশে ঘুরে বেড়ালো| এবার ফেরার পালা| ঘোষ বাবু আগে আগে চলছেন| তারপর আমরা আর  একদম পেছনে মুকেশ|

 খানিকটা যাবার পরে দেখি আমাদের রিসোর্টের তিন চারটে ছেলে  হনহনিয়ে আসছে| 

-"কোথায় চললে ভাই তোমরা?" 

-"কাল আমাদের ছুটি - তাই বাড়ি যাচ্ছি"

-" বাড়ি কোথায়?"

"ওই যে - ওই  দূরে - পাহাড়ের ওপর"

 দেখি গতকাল রাত্রে যেখানে আগুন জ্বলতে দেখেছিলাম সেইখানটায়| এখনও একটু একটু ধোঁয়া বেরোচ্ছে সেখান থেকে|

- "ও তো অনেক দূর| হেঁটে  যাবে?

- "হ্যাঁ| আমরা তো এভাবেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে যাই| রাস্তা ধরে গেলে তো পাঁচ-ছ ঘণ্টা লেগে যাবে"

- "আর এই পথে কতক্ষণ লাগবে?"

-" ঘন্টা দুয়েকে  পৌঁছে যাব|"

গ্রামটা আর একবার দেখি| যেতে মন চায়| কিন্তু আমাদের ওই চড়াই ভেঙে যেতে - কম করে চার ঘণ্টা লেগে যাবে! মায়া বাড়াই না| ওরা এগিয়ে যায় আর আমরা আবার নিচের দিকে নেমে আসি| একদম নদীর ধারে এসে গেছি আবার|  আবার সেই ভেলা পেরোনো|  আমিত আর ওর দিদি নেহা  জলে নেবে যায়| ওরা হেঁটে হেঁটেই  নদী পার হলো|

 এইবার খেয়াল  করলাম নদীর ঠিক উল্টোদিকে একটা ঝরনা নেমে এসেছে| ঘোষ বাবু দেখালেন সেই ঝরনার জল  পাইপের মধ্যে দিয়ে আসছে| পাইপটা নদীর জলের তিন চার ফুট ওপর দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এপারে| তারপর সেটা মাটির নিচ দিয়ে রিসর্ট এর ভেতরে চলে গেছে| মুকেশ বলল হাতির দল যখন আসে, ওরা ওই পাইপের মধ্যে দিয়ে জল যাওয়ার  শব্দ শুনতে পায়| ওদের চোখের দৃষ্টির তেমন জোর নেই কিন্তু কান আর নাক খুব সজাগ| বলে ফেলি "হবেই তো| ওই খুদে খুদে চোখ আর অতবড় কান! নাক এর তো বাহারই আলাদা|" মুকেশ হেসে ফেলে| তারপর আবার খেই ধরে "তারপর হাতিগুলো  মাটি খুঁড়ে পাইপ বার করে দুমড়ে মুচড়ে একদম শেষ করে দিয়ে যায়| আবার সব নতুন করে লাগাতে হয়| বেশ কয়েকবার এরকম ভাবে পাইপ নষ্ট করে দিয়ে গেছে হাতির দল|" আশেপাশে যে পরিমাণে হাতির নাদা  দেখলাম মুকেশকে অবিশ্বাস করার কোন কারন ছিল না|

 ঘরে এসেই চটপট তৈরি হয়ে নিলাম নদীতে চান করতে যাওয়ার জন্য| জল প্রচন্ড ঠান্ডা| আর জলের নিচে বড় বড় হড়কা পাথর| তারই মধ্যে দিয়ে  কোনক্রমে নদীর মাঝামাঝি গিয়ে একটা বড় পাথরের উপর উঠে বসি| জলে বেশিক্ষণ থাকা যাচ্ছে না ঠান্ডার জন্য| খানিকক্ষণ জলে নাবি আবার উঠে পড়ি - এভাবেই চলছিল আমার স্নান করা| ভাস্বতীর এদিকে প্রচন্ড ভয় - কখন কোথা থেকে একটা বাঘ বা লেপর্ড এসে যায়| তাই জলে বেশিক্ষণ না থেকে, পাড়ে বসে জঙ্গলের দিকে নজর রাখছিল| কিন্তু চতুর্দিকে জঙ্গল - কত দিকে আর নজর রাখবে?  শেষ পর্যন্ত একটা চারপেয়ে দেখা গেল| একটা কুকুর সম্ভবত ওই  দূরের গ্রাম থেকে বেড়াতে এসেছে|

কি যে ভাল লাগছিল - উঠতেই ইচ্ছে করছিল না| তবু  উঠতে হল| আর দেরি করলে লাঞ্চ পাব না| লাঞ্চ -ও দেখি মোটামুটি কালকের ডিনারের মতই| আসলে এখানে  জিনিসপত্র  আনাটাই খুব শ্রমসাধ্য| তাই বিশেষ ভ্যারাইটি নেই - যখন যা  আসে,  এক রকমই আসে|

চূড়ামনিরা  দেখি খুব তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছে| 

-"আবার বেরোচ্ছেন নাকি?" - জিজ্ঞেস করি| 

নেহা জবাব দিল "আরে না, ভাই এর একটা পরীক্ষা ছিল, এই মাত্র খবর পেল যে আজ বিকেলেই পরীক্ষা| এখানে ইন্টারনেট এর যা হাল, পরীক্ষা দেওয়া  যাবে না| তাই দৌড়চ্ছি বাড়ির  দিকে| মিনিট পনেরোর মধ্যে চূড়ামনি সপরিবারে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন| মুকেশ সঙ্গে গেল - বালুলি ব্রীজ এর কাছে ছেড়ে দিয়ে আসবে|

এবার পর রিসর্ট এ অতিথী শুধু আমরা| রিসর্টটা একটু ঘুরে ঘুরে দেখি| পশ্চিমের গেটটা দিয়ে বেরোই   এবার| ওধারটায় খুব বেশী ঝোপঝাড়| দুটো বেশ বড় বড় গর্ত ঝোপের ধারে| ভাস্বতী বলল "পালিয়ে চল, এ নির্ঘাত পাইথনের গর্ত|" কয়েক বছর আগে একবার আমরা করবেট পার্কের ভেতরে এক বিশাল পাইথন দেখেছিলাম| সে যদি আদর করে জড়িয়ে ধরত, তাহলে সেটাই জীবনের শেষ আদর খাওয়া  হয়ে যেত| কিন্তু এখানকার গর্ত দেখে সেটা আমার মোটেই সাপের গর্ত বলে মনে হল না| বরঞ্চ বুনো শুওর বা সজারুর গর্ত গতে পারে| "আরে ধুর, অতো ভয় পেও  না তো| একটু এগিয়ে দেখে নি, তারপর ফিরে যাবো|" কিন্তু ফিরে যেতে আমাদের বেশী সময় লাগলো না| দু-পা গিয়েই যা  দেখলাম, আর সাহসে কুলোলো  না| দেখি  রিসর্টের  বেড়ার ধার দিয়ে চলে গেছে পুরুষ্ট একটা থাবার ছাপ| ভেতরে এসে তাড়াতাড়ি গেট বন্ধ করি| ততক্ষণে ঘোষবাবু দেখেছেন আমাদের| "আরে ওখানে কি করছেন? ওদিক দিয়ে একদম একা বেরবেন না| মোটেই সেফ নয়|" বললাম যে বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছি | সেই কথা শুনেই ভূপি লাফাতে লাফাতে চলল সেদিকে| তার মুখে একটাই কথা "সকালে বেরিয়েছিলাম, কোনো ছাপ দেখি নি তো! কখন এল? নাকি আমি এত পরিষ্কার একটা ছাপ মিস করে গিয়েছিলাম!"

এবার তাহলে কি করে সময় কাটাই? আমাদের দুজনেরই চোখ গেল মাচানটার  দিকে| উঠে পড়লাম| দিব্যি বসার ব্যবস্থা করা আছে|  মাচানটা রিসর্টের  বেড়ার একদম ধারে| ওপর থেকে ওয়াটার হোলটা আরো ভালো দেখা যাচ্ছে| বাঘের পায়ের ছাপটা এদিকে আসারই ইঙ্গিত করেছিল| চুপচাপ বসে থাকি| আজ হাওয়ার জোর নেই - তাই জঙ্গল আরো নিশ্চুপ| সামনেই দুটো প্রকাণ্ড শিমুল গাছ| জঙ্গলী শিমুল - আমাদের পাড়ার শিমুল গাছের প্রায় ডবল সাইজের  হবে| সব পাতা  ঝরে গেছে - এবার নতুন পাতা  আসার সময় হয়েছে| একটা দুটো ফুল দেখা যাচ্ছে| হঠাৎ বেশ জোরালো একটা ঠোকাঠুকির আওয়াজ| দেখি দুটো কাঠঠোকরা  ওই শিমুল গাছের ডাল বেয়ে উঠছে আর মাঝে মধ্যেই ঠোকরাচ্ছে | জঙ্গলের নৈশব্দ খান খান করে দিচ্ছে ওই যুগল|

ইতিমধ্যে কিছু চিতল জল খেয়ে গেল| সূর্য ঢলে আসছে| ময়ূরগুলো খুব শোরগোল  শুরু করেছে| সন্ধের আগেই সব এক একটা গাছের ডালে উঠে বসে থাকবে| দূর থেকে ভূপি ইশারা করছে চা খেতে আসার জন্য| নেমে এলাম| চা খেতে খেতে ভূপি বলল, বিকেল বেলা একবার বাইরেটা ঘুরে আসুন| সঙ্গে মুকেশকে নিয়ে যান | বেরিয়ে পড়ি আবার| মুকেশ আমাদের নিয়ে চলল নদীর ধার দিয়ে দিয়ে| বড় বড় পাথর - খুব সাবধানে হাঁটছি| জঙ্গলের দিকে নজর দিতে পারছি না| সেটা করতে হলে খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে নিতে হচ্ছে| ছোট বড় কিছু নতুন রকম পাখি দেখলাম - কি একটা যেন বুলবুল আর স্যান্ডপাইপার | মুকেশ গড়গড়িয়ে নাম বলে যাচ্ছিল - সব নাম এখন আর মনে নেই| আর নাম জেনে আমি করবই বা কি? ভালো লাগছে - এটাই তো অনেক পাওয়া|  সেই ষাঁড়টা দেখি তখনো  ঘাস খেয়ে চলেছে|  ময়ূরের ডাক কমে গেছে| জঙ্গল শান্ত হয়ে আসছে| নদীর ওপারে পাহাড়ের ওপর কিছু একটা দেখে মুকেশ দাঁড়াল| তারপর আমাদের বলল "ওই দেখুন, একটা ঘুরাল|" করবেটের লেখায় পড়েছি ঘুরাল হল পাহাড়ী ছাগল| এরা খাড়া পাহাড়েও অনায়াসে তরতরিয়ে উঠে যেতে পারে| ঘুরাল লেপর্ডএর প্রিয় খাদ্য| অবশ্য আমরা কোনো লেপর্ড দেখলাম না| বরং ঘুরালটাই তার প্রিয় ঘাস পাতা  চিবোচ্ছিল| খালি চোখে বোঝাই যায়  না| এখন বাইনকুলার দিয়ে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি| এবার চারিদিকে একটা রহস্যময় আবছা অন্ধকার নেমে আসছে| আমরা পা চালাই| রিসর্টএ ঢুকে, প্রথমেই ঘরে গিয়ে সোয়েটার পরে নিই | ফেব্রুয়ারিতেও বেশ ঠান্ডা|  

"আসুন, পাকোড়া রেডি|" - ভূপি ডাক দেয়| দেখি আর এক নতুন অতিথি| "ইনি হলেন নীরাজ চাওলা" - ঘোষবাবু পরিচয় করিয়ে  দেন| চাওলার সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প চালাই| এখন পুরোপুরি অন্ধকার| স্রেফ চাঁদের আলোয় একে অন্য কে দেখছি| চাওলা কোন সফটওয়ার কোম্পানীতে  কাজ করতেন  এক সময়| তারপর নিজের কোনো ব্যবসা শুরু করেন  - কি সব  ইলেকট্রনিক পার্ট এর ব্যবসা| এখন সে ব্যবসা ওনার পার্টনার সামলায়  আর উনি পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান| সঙ্গে থাকে বড়সড় একটা টেলিস্কোপ| তাই দিয়ে টুরিস্টদের চাঁদের  পাহাড় আর শনির চক্র দেখিয়ে বেড়ান - কিছু উপার্জন হয় - কখনো বা কিছুই হয় না| কিন্তু মহাকাশের অনেক অজানা তথ্যই সেদিন রাতে উনি আমাদের বলেছিলেন| রাত প্রায় দুটো অবধি উনি বলে চললেন "ওই যে ওখানটায় একটু ধোঁয়া মত দেখছেন - এইবার টেলিস্কোপ এ চোখ রাখুন - কি দেখলেন? গোটা  পঁচিশেক তারা  - তাই তো? একটু জুম করছি  - আরো কত দেখেছেন? আসলে ওই ছোট্ট ধোঁয়ার  টুকরোটার মধ্যে কয়েক কোটি তারা আছে| ভাবতে পারেন? সময় থাকলে আরো অনেক দেখাতাম - এখন এদিকটায় দেখুন - " চাওলাবাবুর প্রচুর উৎসাহ| এদিকে আমরা হাই তুলছি| জঙ্গলের আওয়াজ-ও আর নেই| একটা অদ্ভুত ভয় ধরানো থমথমে ভাব| 

ভূপি বুঝতে পারে| "না, এবার আপনারা শুতে যান| কাল আবার ভোরবেলা বেরতে হবে তো? ব্রেকফাস্ট -এ সঙ্গে কি নেব?" 

লুচি আর ডিমসেদ্ধর অর্ডার দিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়াই| ঘরের ওই টিমটিমে  আলোতে বিছানা বালিশ যথাসাধ্য পরীক্ষা করে নিই - কোথায় বিছে বাবাজী  বসে থাকবেন!

আরামে চোখ জুড়ে আসে|

(ক্রমশ )

Tuesday, July 12, 2022

আশীর্বাদ

  অনেক ছোটবেলায় একবার হরিদ্বার  গিয়েছিলাম, বেড়াতে|সেখানে  একদিন গঙ্গার ঘাটে দেখি এক সাধুবাবা সামনে ধূনি  জ্বালিয়ে ঈষৎ তূরীয় অবস্থায় বসে রয়েছেন| আমার মা তাঁর কাছে গিয়ে হাতে একটা সিকি দিয়ে বললেন "বাবা আমার এই ছেলেটার হাতটা একটু দেখে দাও তো"| আজকালকার ছেলেমেয়েদের জন্য বলি, সিকি হল পঁচিশ পয়সা| সে জামানায় পঁচিশ  পয়সায় অনেক কিছুই পাওয়া যেত| এই ঘটনার প্রায় তিন চার  বছর পরেও আমি দশ  পয়সায় চারটে ফুচকা খেয়েছি সুতরাং সাধুবাবা ইচ্ছে করলে সে সময় হয়তো পঁচিশ পয়সায় ডজন খানেক  ফুচকা খেতে পারতেন| অবশ্য সাধুরা ফুচকা খান কিনা আমি জানিনা - অন্তত আমি কোনদিন কোন সাধুকে ফুচকা খেতে দেখি নি| হয়তো সংসারের সমস্ত সাধ আহ্লাদ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার এটাও একটা অংশ| ফুচকা খাওয়ার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা যে কত বড় একটা আত্মত্যাগ সেটা যাঁরা ফুচকা খেয়েছেন তাঁরা হলফ করে বলতে পারবেন|

 সাধুবাবা আমার ডান হাতটা একটু নেড়েচেড়ে দেখে বললেন "ইসকা লম্বা উমর হোগা|" তারপর মার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন শুধু লম্বা উমর দিয়ে এই মহিলাকে  খুশি করা যাবে না| তাই যোগ করলেন "আচ্ছা নোকরি লগ যায়েগা|" হয়তো আশা করেছিলেন সেই নোকরির মাইনের কিছু অংশ মা সাধু সন্তের সেবায় অগ্রিম  নিয়োজন করবে| কিন্তু মার  উদ্দেশ্য ছিল অন্য| আমার দিদি পড়াশোনায়  অত্যন্ত ভালো ছিল - আমার মায়ের আশা গগনচুম্বী করে দিয়ে সে অকালে মারা যায়| আর আমার পড়াশোনার বহর দেখে মা হয়তো তখন অবধি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, যে এ ছেলে কদ্দুর কি করবে| তাই হাত জোড় করে বাবাজীকে বলল   "আশীর্বাদ কারো যেন ছেলেটার লেখাপড়া হয় "  সাধুবাবা সহাস্যে আমার মাথায় হাত ঠেকিয়ে বললেন "বহুৎ পঢ়াই হোগা|" মার মুখটা খুশী খুশী দেখে উনি আরো কিছু যোগ করলেন যাতে মার আনন্দ মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল  "ইয়ে লড়কা মেট্রিক পাশ করেগা|"  কিন্তু আশ্চর্য সেই ভবিষ্যৎবাণী! এই ঘটনার প্রায় দশ বছর পরে আমি  মেট্রিক অর্থাৎ মাধ্যমিক পাশ করলাম|

 কিন্তু সে ব্যাপারে আরো একজনের একটা বড়সড় ভূমিকা ছিল| তাকে নিয়েই মূলত এই কাহিনী| সে হল আমাদের বাড়ির বিশ্বস্ত কাজের লোক - দাসীদি| দাসীদিকে কেন যে আমি দিদি  বলতাম তা আমি ঠিক বলতে পারবো না|  দাসীদির  আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে অন্তত তিনজন আমার থেকে বয়সে বড় ছিল| তাছাড়া দাসীদি আমার মাকে বৌদি বলত| সম্ভবত আশেপাশে পাড়ার দাদারা দিদিরা যেরকম সম্বোধন করত আমিও তাই করতাম| আর তার নামটা নিয়েও আমার মনে প্রশ্ন ছিল - একজন মানুষের নাম কি করে দাসী হতে পারে! যদিও কর্মসূত্রে সে দাসীগিরি করত, কিন্তু ডাক্তারের নাম কি ডাক্তার হয়? মনে আছে কানপুর থেকে আমার এক জ্যাঠাইমা কিছুদিনের জন্য শিবপুরে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন| ফিরে যাবার আগেরদিন উনি জানতে পারলেন যে দাসীদির নাম সত্যিই দাসী| মাকে বললেন "আমি ভাবলাম তোমরা কলকাতার লোক, হয়তো শুদ্ধ বাংলায় কাজের লোককে দাসী বল|"

দাসীদি মাঝে মধ্যে আশ্চর্য সব প্রবচন ব্যবহার করত| তার অর্থ বুঝতে অসুবিধে হত না কিন্তু পুরো বাক্যটাতেই  কোনো একটা সাম্প্রতিক ঘটনার রেশ থাকতো| তার মধ্যে একটা এখনো আমার মনে আছে| দাসীদির কোনো মেয়ে সম্ভবত খুব দামী কোনো জামাকাপড় কেনার কথা বলে থাকবে, যেটা দাসীদির পছন্দ হয় নি| আমার মার কাছে তাই নিয়ে নালিশ করতে করতে বলেছিল - "ওই যে কথা আছে না - বড়লোকের বিটি লো তোর নম্বা নম্বা চুল|" সে সময় একটা গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল "বড়লোকের বিটি লো, লম্বা লম্বা চুল|" -সেটাকেই দাসীদি প্রবচন বানিয়ে ফেলেছিল| হয়তো বলতে চেয়েছিল "ছোট মুখে বড় কথা|"

সেবার  কোনো কারণে আমাকে দাসীদির  বাড়ি যেতে হয়েছিল| সেই প্রথমবার| গিয়ে দেখি একটা আট ফিট বাই আট ফিট ঘর আর তার সামনে তার চেয়েও ছোট একটা খোলা বারান্দা| ভেবে পেলাম না এরা দশজন এই বাড়িতে ঘুমোয় কি করে!" জিজ্ঞেস করেছিলাম| শুনলাম কয়েকজন ওই বাইরের বারান্দায় শোয়|

দাসীদির বরের নাম ছিল ভরত| কোনো কাজ কর্ম করত না| এর ওর কাছে এক টাকা দু টাকা চেয়ে বেড়াত| দাসীদির কাছেও  চাইত  -  যদিও পেত না| দাসীদির বক্তব্য ছিল "খালি নেশা ভাং করবে|" অবশ্য নেশা করে ভরত তার বাড়ির লোকেদের মারধর করত বলে শুনি নি কখনো|

সেবার চুরির দায়ে ধরা পড়ল দাসীদির ছেলে| কিছুদিন জেলে ছিল| সে সময়ে একদিন তার দুই বোন খুব সেজে গুজে রাস্তা দিয়ে চলেছে - আমার মা জিজ্ঞেস করল "কোথায় যাচ্ছিস তোরা?"

-"দাদার সঙ্গে দেখা করতে|"

মা যেন আকাশ থেকে পড়ল  - "জেলখানায় যাবি তো  অত সেজেগুজে যাবার কি হয়েছে?"

দাসীদির কিঞ্চিত পরিচয় দিলাম এটা বোঝানোর জন্য যে তারা ছিল আর পাঁচটা গরীব পরিবারের মত| আর আমার মায়ের কোন কারণে একটা ধারণা ছিল যে গরিব  মানুষদের আশীর্বাদের খুব জোর|  

এবার মূল গল্পে ফিরে আসি| সে সময়ে আমরা গুরুজনদের প্রণাম করে পরীক্ষা দিতে যেতাম| আমি ভাবতাম,  যাদের বাড়ির গুরুজনদের আশীর্বাদ-এর শক্তি  যত বেশি তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় তত বেশী নম্বর পায়| আমার বাড়িতে গুরুজনের  সংখ্যা খুব বেশি ছিল না| বেশিরভাগ সময়ে শুধু বাবা আর মা| কখনও সখনও ঠাকুমাও  থাকতেন | ওদিকে সঞ্জয়ের বাড়ীতে ওর বাবা, মা আর দিদি ছাড়া আরো কত গুরুজন ছিলেন, সে সম্বন্ধে আমার কোন জ্ঞান ছিল না| তবে ওর বাড়ির সম্মিলিত আশীর্বাদ   বরাবরই আমার বাড়ির আশীর্বাদকে  অনায়েসে হারিয়ে এসেছে -  এ ব্যাপারে আমি ভুক্তভোগি | 

তখন বোধহয় ক্লাস সেভেনে পড়ি| আমার পড়াশোনার গতি প্রকৃতি তেমন ভালোর দিকে যাচ্ছিল না| মনে আছে, সহজ সহজ ফ্যাক্টোরাইজেশনের অঙ্ক করতে  হিমশিম খেয়ে যেতাম| আমার হোম টাস্কের খাতা দেখে একদিন নির্মলবাবু এতটাই ক্ষেপে গিয়েছিলেন যে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন| খাতাটা পাখির মত ডানা মেলে উড়তে উড়তে ক্লাসরুমের দরজার কাছে গিয়ে পড়েছিল| আমার বন্ধু বান্ধবেরা ভারী আনন্দ পেয়েছিল সেদিন - ছোটরা বোধহয় পরের দুঃখে আনন্দ পেতে ভালোবাসে| সেবার ভয়ের চোটে পরীক্ষার আগের রাত্রে আমার জ্বর এসে গেল - সমস্ত কিছু গুলিয়ে যেতে লাগল| মা ডেকে পাঠালেন তাঁর  বন্ধু বিমলা মাসীমাকে| বিমলা মাসীমা পাড়ার এক নামী স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন|উনি এসে আমার বিছানার পাশে বসে আমাকে বোঝাতে লাগলেন যে ফ্যাক্টোরাইজেশন মোটেই কঠিন নয়| "এই দ্যাখ না - এইরকম করে মিডল টার্ম ভাঙ্গবি|"   দেখে শুনে তো আমার আক্কেল গুড়ুম | আমি আরো ঘাবড়ে গেলাম - এত সহজ জিনিসও আমি বুঝতে পারছি না! জীবনে প্রথমবার ফেল করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে লাগলাম| পরের দিন   পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি - দাসীদি তখন ঘর মুছছে| মাকে প্রণাম করে বেরোবো,  মা বলল "দাসীদিকেও  প্রণাম করো, বড়দের প্রণাম করার সময় সামনে যত গুরুজন থাকেন সবাইকে প্রণাম করতে হয়|" বাড়ির কাজের লোককে প্রণাম করতে হবে এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অদ্ভুত লেগেছিল কিন্তু কি আর করা - মা বলেছে, কোনো উপায় নেই| দাসীদি প্রথমটায় ঘোরতর আপত্তি জানালো| শেষমেষ মায়ের চাপে পড়ে খুব সংকুচিত ভাবে  প্রণাম গ্রহণ করলো| তারপর বললো "পাস করে এসো|" মা বললো "পাস করে এসো কিগো? বল, ফার্স্ট  হয়ে এসো|" দাসীদি  কি বুঝলো কে জানে, বলল "ফাস্টো হয়ে এসো|" কিভাবে জানি না অঙ্ক পরীক্ষাটা বেশ ভালোভাবেই উতরে গেল সেদিন | রেজাল্ট বেরলে  দেখা গেল যে  জীবনে প্রথমবার  আমি ফার্স্ট হয়েছি| এরপর থেকে মায়ের বদ্ধ  ধারণা হয়ে গেল দাসীদির  আশীর্বাদের জোরেই  আমার এই পরিবর্তন| দাসীদির  ওপর হুকুম হয়ে গেল পরীক্ষার সময় কামাই করা চলবে না| আর দাসীদিরও অভ্যাস হয়ে গেল  আমি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় "ফাস্টো  হয়ে এসো" কথাটা বলার|

 আমার অবশ্য ধারণা ছিল বাবা মায়ের আশীর্বাদ এর সঙ্গে দাসীদির  আশীর্বাদ যোগ হয়ে, সঞ্জয়দের বাড়ির আশীর্বাদ কে হারিয়ে দিয়েছে| এরপর যখন দাসীদির মেয়ে খাঁদি  আমাদের বাড়িতে কাজ করা শুরু করলো তখনও আমার পরীক্ষার সময় দাসীদিকে  আসতে হতো আমার মার আদেশে| দাসীদির  আশীর্বাদে স্কুল জীবনটা ভালো ভাবে পেরিয়ে গেল আমার | এরপর শুরু হল হোস্টেল জীবন, দুঃখের বিষয়, সেখানে আমাকে পার করার জন্য কোন দাসীদি ছিল না আর সাধুবাবার ভবিষ্যৎবাণীর  আওতা থেকেও আমি বেরিয়ে এসেছি তখন!


Sunday, July 10, 2022

সাফল্য

 আমার মায়ের একটা শখ ছিল  - গরিবের ছেলে মেয়েদের একটু পড়াশোনা শেখানো| কিন্তু গরিবের ছেলে মেয়ে  তো আর চারিদিকে কিলবিল করছিল না, তাই মার নজর গিয়ে  পড়েছিল আমাদের বাড়ির কাজের লোক দাসীদির ছেলেমেয়েদের দিকে| দাসীদির অপর্যাপ্ত  সংখ্যায় ছেলেমেয়ে ছিল - সেই  বছর-কুড়ির মোহন থেকে শুরু করে একেবারে "কথা না ফোটা" সন্ধ্যা অবধি|মাঝখানে মদন, মলিনা, রানু, খাঁদি, গণেশ আর  কার্তিক| আটজন - একেই বোধহয় গণ্ডা গণ্ডা বলে|  আমার বয়স তখন বছর দশেক হবে| রানু ছিল মোটামুটি আমারই  বয়সী| হয়তো সেইজন্যই মার নজর প্রথমেই পড়ল রানুর ওপর| কিন্তু পড়াবো বললেই তো আর সবাইকে পড়ানো যায় না! প্রথম সমস্যা দেখা দিল রানুর পরিষ্কার পরিছন্নতা নিয়ে| সারা গায়ে কালিমাখা, মাথার চুলের জট, নোংরা জামা, পায়ে কাদা, কাছে গেলে গা থেকে একটা উৎকট গন্ধ বেরোয় - এমন একটা মেয়েকে ঘরে ঢুকিয়ে পড়াশোনা করানো বেশ কঠিন  ব্যাপার| মার প্রথম কাজ হলো রানুকে পরিষ্কার করা| সম্ভবত তখন আমার গরমের ছুটি| একদিন দেখি রান্না বান্না সেরে দুপুরবেলা রানুকে নিয়ে মা চলল পাতকুয়োর ধারে| তারপর বালতি বালতি জল আর একটা সাবান দিয়ে  ঘষে মেজে রানুকে যথাসম্ভব  চকচকে করার চেষ্টা হলো| বাড়ি থেকে একটা পরিষ্কার জামা আনতে বলেছিল - রানু সেটা পরল| কিন্তু শুধু পরিষ্কার করলেই তো হবে না - যে পড়বে তার মনটা তো পড়ার দিকে যেতে হবে! তার জন্য পেট খালি থাকলে চলবে না| অতএব এরপরে রানুকে নিয়ে  মার গন্তব্য হল আমাদের রান্নাঘর| সেখানে কিছু ভাত, ডাল, তরকারি খাওয়ানো  হলো রানুকে| তারপর মা তাকে নিয়ে বসল পড়াতে| অ-আ-ক-খ দিয়ে শুরু হল এবং শেষও  হলো| পড়াশোনা ব্যাপারটা নিয়ে  বিন্দুমাত্র উৎসাহ ছিল না রানুর| তিন চার দিন ভাত ডাল খেয়ে রানু হাওয়া| কিন্তু মার জেদ চেপে  গেছে ওই "দাসীর র ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা শেখাতে হবে"| এরপরে মা পাকড়াও করল গণেশকে| বয়স তখন তার পাঁচ-ছয়  হবে| মার বক্তব্য, একটু ছোটর থেকে ধরলে লেখাপড়ায় উৎসাহটা  আসবে |কিন্তু গণেশের অবস্থাও তথৈবচ - বরং রানুর চেয়ে আর এক ধাপ এগিয়ে সে ছোঁড়া| রানুর সমস্ত  গুণ গণেশের মধ্যে ছিল আর তার সঙ্গে ছিল নতুন শেখা, চোখা-চোখা কিছু গালিগালাজ| তবে  মায়ের বক্তব্য ছিল ঠিকমতন পড়াশোনা শেখাতে পারলে ছেলেটাকে হয়তো মানুষ করা যাবে| কিন্তু কোথায় মানুষ আর কোথায় গণেশ!গণেশ মন দিয়ে রুটি তরকারি খেত আর  তারপরে মন না  দিয়ে পড়াশোনা করতো|  বাইরে গিয়ে আবার সেই খিস্তিখেউড় গালিগালাজ চালাত| আমাদের বাড়ীওয়ালা শিবরামবাবু  একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন - গণেশের হঠাৎ কি  খেয়াল হল দৌড়ে এসে বলল "এই সুনুর  বাপ,  তোর পেটে এক নাতি (অর্থাৎ লাথি)" এই বার্তা চারদিকে ক্রমে ক্রমে রটে গেল - সুতরাং গণেশ আমাদের বাড়িতে এসে আসলে কি শিখছে তাই নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীর মনে হয়তো সন্দেহ দেখা দিয়ে থাকবে| গণেশ অধ্যায়ের সেখানেই সমাপন, অন্তত তখনকার মতো| 

এই ঘটনার  আরো চার-পাঁচ বছর পরের কথা| আমরা তখন একটা নতুন বাড়িতে ভাড়া উঠে গেছি - অন্য এক পাড়ায়| সেখানে মা সুবিধা মতন ছোট ছেলে মেয়ে খুঁজে পাচ্ছিল না | ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটল যেটা মার কাজের  খুব সুবিধা করে দিল| দাসীদিরাও পাড়া বদল  করে আমাদের পাড়ার কাছে চলে এল এবং দাসীদি আবার আমাদের বাড়ির কাজে বহাল হল| এতদিনে কার্তিক-ও  একটু বড় হয়েছে| একসঙ্গে গণেশ আর কার্তিককে আবার পাকড়ালো আমার মা| আবার তাদের কুয়োতলায়  নিয়ে গিয়ে সেই চান করানো|  আমার ছোট হয়ে যাওয়া কিছু জামাকাপড় গণেশের দিব্যি ফিট হয়ে গেল| কার্তিক ও সেরকম এক সেট জামা প্যান্ট পেল - যদিও প্যান্টটাকে হাত দিয়ে ধরে থাকতে হচ্ছিল| অবশ্য তাতে কিছু এসে যেত না ওদের, কারণ বেশির ভাগ সময়-ই ওদের দেখেছি ন্যাংটো হয়ে  মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াতে| আর ওই দুজনেরই সব সময় সর্দি লেগে থাকতো| তাই চান করানোর সময় ওদের দিয়ে ভালো করে নাক ঝাড়ানো হত| কখনো কোনো হোমিওপ্যাথিক ওষুধও খাওয়াতে দেখেছি| কতটা কাজ হত জানি না| যাই হোক,  পড়াশোনা শুরু হল| কার্তিক গণেশ অ-আ,   এবিসিডি ইত্যাদি একটু শিখে ফেলল তারপর এল অঙ্ক| সংখ্যা পরিচয় হল| যোগ করতে শিখলো গণেশ - তিনের  সঙ্গে চার  যোগ করলে কত হয় জিজ্ঞেস করলে দিব্যি বলে দিতে পারতো| এরপর বিয়োগের পালা - যেটা আমি কোনদিন  ভুলবো না| ইতিমধ্যে আমার ঠাকুমা আমাদের শিবপুরের বাড়িতে এসেছেন অনেক দিন পর  | ঠাকুমা তখন  তিনটে জায়গায় ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন| কানপুর- যেখানে বহু দিন  থেকেছেন এবং চাকরিও করেছেন,  তারপর জব্বলপুর - আমার পিসির বাড়ি আর আমাদের ওই শিবপুর| আমাদের বাড়ির ভেতরের দিকে একটা রক ছিল তার সামনে একটু উঠোন| সেই রকে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোদ্দুর আসত| সেখানে বসে কখনো  চা খেতাম,  কখনো রোদ পোয়াতাম,  কখনো বা জুতো পালিশ করতাম আমার বাবার কড়া "নিজে কর" শাসনে| সেদিন ঠাকুমা রোদ্দুরে বসে আছেন, পাশেই  গণেশ কার্তিকের  পড়াশোনা চলছে| মা ঠাকুমাকে বলল "আপনি একটু ওদের বিয়োগটা দেখিয়ে দিন তো, আমি একবার রান্নাঘর থেকে আসছি"| রান্নাঘর ছিল সামনেই উঠনের ধারে| সেখানে ঢুকে মা আলু না বেগুন কিছু একটা কাটতে শুরু করলো| আমি রকের অন্য প্রান্তে বসে ঠাকুমা কি করেন  দেখতে লাগলাম| ঠাকুমা গণেশকে বললেন  "বলতো দেখি চারের থেকে দুই চলে গেলে কত থাকে?" পড়া না করা ছাত্ররা যেমন করে,  গণেশ সেইরকমভাবে আকাশ, গাছ , বারান্দার উপরের সিলিং ইত্যাদি দেখতে লাগল আর বিড় বিড়  করতে লাগলো| ঠোঁট নড়ছে কিন্তু আওয়াজ নেই| কার্তিক ওদিকে চেষ্টা করতে থাকলো  কোনোভাবেই ঠাকুমার দিকে না তাকানোর| ঠাকুমা বোঝালেন  "এই যে তোর হাতে চারটে বিস্কুট রয়েছে এর থেকে যদি আমি দুটো নিয়ে নিই .... " এতটা  বলার পরেই  গণেশ চটপট চারটে বিস্কুট নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল| এরপরও  ঠাকুমা নানাভাবে গনেশ কার্তিককে  বিয়োগ বোঝানোর চেষ্টা করে চললেন | শেষ পর্যন্ত ঠাকুমার মনে পড়ল কানপুরের সেই স্কুলের কথা যেখানে বহু বছর বহু বাঙালি অবাঙ্গালীকে উনি পড়িয়েছেন | তাই আদর করে গণেশ কে বললেন  "দেখ, চারের   থেকে দুই গেলে থাকে দুই  - কেননা ওটা তো কমে গেল | আর এই জন্যেই বিয়োগকে  সহজ ভাষায় বলে 'ঘাটানো'| যদিও বা গণেশ কিছুটা বুঝেছিল এই 'ঘাটানো'  শুনে ওর  সমস্ত কিছুই কেমন ঘেঁটে গেল| এরপর কার্তিক গণেশকে নিয়ে বেশিদূর  এগোতে হয়নি মাকে| গুণ ভাগ আর হয়ে উঠল না| ওদের আর  বিশেষ দেখি নি কোনদিন| শুধু একবার মা কোথা থেকে যেন রিকশা করে বাড়ি ফিরল| আমি জানলা দিয়ে দেখি মা দু টাকা না পাঁচ টাকা রিকশাওয়ালাকে দিতে চাইছে  আর রিকশাওয়ালা তাতে ঘোরতর আপত্তি জানাচ্ছে| ভাবলাম হয়তো বেশী পয়সা চায়| বাইরে বেরোতেই শুনি মা বলছে "আরে পয়সা নেবে না কেন?" রিকশাওয়ালা ততক্ষণে খানিকটা এগিয়ে গেছে| হঠাৎ মা বলল "আরে, তুই গণেশ না?" আর দেখে কে - গণেশ তড়িঘড়ি সে তল্লাট ছেড়ে হাওয়া| কি জানি কেন - বোধহয় ভেবেছিল মা যদি আবার পড়তে বসিয়ে দেয়| কিম্বা যেটুকু পড়াশোনা শিখেছিল হয়তো তারই গুরুদক্ষিণা দিয়ে গেল|  ততদিনে পয়সাকড়ির  হিসেব রাখার মত যোগ বিয়োগ করতে পারতো নিশ্চই | কার্তিক কি করত  বা আজ কি করে আমি জানিনা| কেউ যেন বলেছিল গণেশ রিকশা ছেড়ে এখন ট্যাক্সি চালায়| গণেশ কার্তিক জীবনে উন্নতি করুক কিন্তু মার উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি| 

মার পরবর্তী আকর্ষণ ছিল খাঁদি | খাঁদির বেলায়  কিছু কিছু  সুবিধে ছিল| প্রথমত খাঁদি ততদিনে একটু বড় হয়েছে এবং ওর মায়ের দু-একটা বাড়ির বাসন মাজার কাজ নিজের হাতে নিয়েছে| তার মধ্যে একটা ছিল  আমাদেরই বাড়ির কাজ| তাই  ওর ভালো লাগুক বা না লাগুক আমাদের বাড়িতে আসতেই হত| দ্বিতীয়ত, সে  খুব একটা নোংরা ছিল না সুতরাং পাতকুয়োতলার  কাজটা মাকে আর করতে হলো না| আর সবচেয়ে যেটা বড় ব্যাপার,  খাঁদি পড়াশোনা করা যখন শুরু করল ওর মধ্যে যেন একটু শেখার ইচ্ছে দেখা দিল| খাওয়ার লোভে পড়াশোনা করত না| কিন্তু বাংলা লেখার সময় খাঁদি কিছুতেই ঠিকমত মাত্রা দিতে পারতো না| মা খালি  বলত "আরে বোকা মেয়ে, একটা সোজা লাইন টানতে পারিস না?"  খাঁদি কিন্তু সেই ট্যারা বাঁকা একটা মাত্রা টানতো| মাঝে মধ্যে তো মনে হত যেন সিসমোগ্রাফের আঁকি বুকি দেখছি| দু-তিন   বছর লেগেছিল খাঁদিকে গড়ে তুলতে| বাংলা  পড়তে শিখল  গড়গড়িয়ে| লিখতেও  পারতো দিব্যি| ইংরেজি অক্ষর জ্ঞান হয়েছিল| যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ জানতো| সবথেকে বড় ব্যাপার হল, খাঁদি  নিজের নাম লিখতে খুব ভালবাসত | তাই দেখে আমার বাবা খাঁদিকে বললেন "লিখতে পড়তে  শিখেছিস, এবার তোর  একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে দেব|" খাঁদিকে  জিজ্ঞেস করলেন "তোর ভালো নাম কি রে ?" খাঁদি বলল "খাঁদি মণ্ডল"| তারপর কি যেন ভেবে বলল, "না মামা, ওটা আমার নাম নয়| আমার নাম কালকে বলব|"  সেদিন হয়তো  সারারাত্তির বাড়িতে শুয়ে খাঁদি ভেবেছিল নিজের একটা চমৎকার নাম কি হতে পারে যেটা লেখাও বেশ সহজ হবে| পরের দিন এসে আমার বাবাকে বলল "মামা, আমার নাম দিয়েছি ডলি|" তখন আবার মা তাকে  দু চারদিন ডলি মন্ডল সই করা অভ্যাস করাল | খুলল ডলির  ব্যাঙ্ক একাউন্ট| মাসের শুরুতে মাইনে পেলেই  কিছুটা ব্যাঙ্কে জমা করতে যেত সে|  কদাচিৎ  টাকা তুলত| আমাকেও বোধহয়  তখন অবধি আমার বাবা ভরসা করে একা ব্যাঙ্কের কোনো কাজে পাঠাতেন না| 

বহুদিন দাসীদির পরিবারের কারও সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই| আশা করি ডলি মণ্ডলের ব্যাঙ্ক  ব্যালেন্স এখন বেশ মোটাসোটা অঙ্কে  দাঁড়িয়েছে| হয়তো সে চেক কাটতেও শিখেছে এবং বেশ সোজা সোজা লাইন টেনে চেক ক্রস করতেও পারে| 

একজনের জন্য হলেও, মার পরিশ্রম সফল হয়েছে|

রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...