Tuesday, November 5, 2019

ট্রাঙ্ক

সে ছিল লোহার মস্ত একটা বাক্স। খুব ছোট হলেও দেড়ফুট বাই দেড়ফুট বাই আড়াই ফুট। আর বড়গুলো তো এর ডবল সাইজের। সে অনেক দিন আগেকার কথা। দোকানে গিয়ে দশ পয়সার বদলে এক মুঠো চানাচুর পাওয়া যেত  সে সময়ে। দেয়ালে গর্ত করে আলমারি বানানোর কায়দা বোধহয় আবিষ্কার হয় নি তখনো। দেয়ালে বড়োজোর সেল্ফ থাকতো, কিন্তু সেখানে কেউ জামাকাপড় রাখতো না। রাখতো বই, খাতা, আয়না, চিরুনি, ঘড়ি কিংবা দুটো মাটির পুতুল বা ফুলদানি । একটা খবরের কাগজ বিছিয়ে নেয়া হতো প্রথমে। সে খবরের কাগজও কত সাবধানে বাছতে হতো। কে একবার আয়নার নিচে লিরিল সাবানের বিজ্ঞাপন রেখে দিয়েছিলো বলে সে কি হুলুস্থুল সেবার আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। তবে  লোহার বা কাঠের আলমারি যে কারো বাড়িতে থাকতো না, তা নয়। কিন্তু আমার জানাশোনা বেশির ভাগ বাড়িতেই সেগুলো অনুপস্থিত ছিল কানপুরের মতো ছোট শহরে।

লোকজন বেড়াতে গেলে সঙ্গে যেত ট্রাঙ্ক । নেহাত দু একজনের সঙ্গে সুটকেস  দেখেছি  - তাও চামড়ার সুটকেস । ট্রাঙ্কের  সঙ্গে একটা বেডিং ও যেত বেড়াতে। ধন্য বটে সেসব কুলিরা, যারা দুটো ট্রাঙ্ক মাথার ওপর নিয়ে, তার ওপর একটা বেডিং চাপিয়ে টলমল করতে করতে হাওড়া স্টেশন এর ৯ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিতো। আর সে কি স্পিডে  তাদের হাঁটা! পেছন পেছন ট্রাঙ্কের মালিকরা দৌড়ত । গন্তব্যে পৌঁছে কাঁধের গামছা দিয়ে তারা প্রথমে ঘাম মুছতো আর তারপর কিছু বেশি পয়সা পাওয়ার  জন্য ঝগড়া শুরু করত। সেসমস্ত বিহারী কুলি - বাঙ্গালীদের ঘাড়  বোধহয় সেসময় অতটা শক্ত ছিল না। এখন কি হয়েছে?

চাকা লাগলো ট্রাঙ্ক দেখি নি। তাই ট্রাঙ্ক একটা ঝক্কি ছিল, এটা ঠিক। কিন্তু ট্রাঙ্ক নিয়ে ট্রেনে যাবার অনেক সুবিধেও  ছিল। হঠাৎ করে কোনো চোর ট্রাঙ্ক নিয়ে সটকে পড়তে পারতো না। কেউ একটা ছুরি দিয়ে ট্রাঙ্ক কেটে জিনিস নিয়ে নিতে পারতো না। ইঁদুরে সুটকেস ফুটো করে দিত কিন্তু ট্রাঙ্কের ক্ষেত্রে তারা ছিল জব্দ। ট্রেন আসতে  দেরি হলে প্লাটফর্ম-এ একটা ট্রাঙ্কের ওপর তিনজন অনায়াসে বসতে পারতো । ট্রাঙ্কের ভেতরের জামাকাপড়ের ভাঁজ নষ্ট হতো না। দুটো বার্থের মধ্যে দুটো ট্রাঙ্ক রেখে, তার ওপর তাস নিয়ে পেটাপেটি করা যেত। যেসব গোনাগুনতি লোক প্লেনে চড়বার ক্ষমতা রাখতো, তারা ট্রাঙ্ক নিয়ে যেত কিনা জানি না অবশ্য। আরো একটা মস্ত সুবিধে ছিল, চাবি হারিয়ে গেলে, তালাটা ভাঙলেই হতো, সুটকেসের মতো ঝঞ্ঝাট করতে হতো না।

বাড়িতেও ট্রাঙ্ক -এর নানান  ব্যবহার ছিল। ট্রাঙ্ককে টেবিলের মতো ব্যবহার করা যেত। তিনটে  ট্রাঙ্ক একটার ওপর আর একটা রেখে তার ওপর দাঁড়িয়ে ফ্যান পরিস্কার  করা যেত। আমাদের বাড়িতে যখন প্রথম টিভি এলো, টিভি কিনেই পয়সা শেষ। সেটা রাখার টেবিল কোত্থেকে আসবে? তখন দুটো ট্রাঙ্ক রেখে, তার ওপর একটা টেবিল ক্লথ পেতে  টিভি রাখা হল। একবার দরজার ছিটকিনি ভেঙে গ্যালো, পুরো একদিন সেই দরজাটার পেছনে দুটো ট্রাঙ্ক দাঁড়িয়ে রইলো পাহারাদারের মতো। আর যে সব ট্রাঙ্কের সেরকম কোনো কাজ থাকতো না, তারা খাটের  তলায় ধুলো শুঁকত।

সে যাই হোক, প্রশ্ন হচ্ছে তখনকার লোকজনের জামাকাপড় কোথায় থাকতো? সেসব থাকতো আলনাতে । একটা কাঠের স্ট্যান্ড গোছের ব্যাপার আর কি । আমাদের আলনা ছিল না । তাই যেখানে পারা যেত, সেখানেই জামাকাপড় রাখা হতো। খাটের পাশে, ট্রাঙ্কের ওপরে, দরজার ওপরে, দেয়ালের হুকে, দড়ির ওপর । ট্রাঙ্কের ভেতরেও থাকতো। কিন্তু রোজ রোজ তো আর ট্রাঙ্ক খোলা হতো না। তাই রোজকার প্রয়োজনের বাইরের জিনিসগুলোই ট্রাঙ্কের ভেতরে যেত। যেমন এক্সট্রা চাদর, সোয়েটার, কোনো দামি জামা যেটা বিশেষ অনুষ্ঠানেই পরা  হবে - এইসব।

আমাদের বাড়িতে অনেকগুলো ট্রাঙ্ক ছিল। একটা বাবার, একটা মায়ের, একটা ঠাকুমার - এছাড়াও দু একটা এক্সট্রা ট্রাঙ্কও ছিল। যেদিন ট্রাঙ্ক খোলা হতো, হামলে পড়তাম দেখার জন্যে। প্রথমেই একটা ন্যাপথলিনের গন্ধ নাকে ধাক্কা মারতো। তারপর একে একে বেরিয়ে আসত বাবার কোনো পুরোনো কোট, কিম্বা ঠাকুমার বোনা একটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের সোয়েটার। মা বলতো প্যাটার্নটা খুব ভালো, তাই রেখে দিয়েছে। মায়ের বিয়ের শাড়ী কিংবা একটা লক্ষীর ঝাঁপি বেরোতো কোনো ট্রাঙ্ক থেকে । একটা ভোঁতা নেপালি কুকরিও ছিল - কে যেন বাবাকে প্রেজেন্ট করেছিল। একটা কাশ্মীরি শাল দেখেছিলাম - মা বলেছিলো ওটা নাকি খুব দামি জিনিস। কদাচিৎ সেটা ব্যবহার হতে দেখেছি  - কখনো মায়ের গায়ে আবার কখনো ঠাকুমার গায়ে - যার যখন দরকার।

যে ট্রাঙ্ক টার প্রতি আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল, সেটার মধ্যে ছিল দু একটা খেলনা। একটা পুতুল - তার সম্ভবত  একটা পা ছিল না। আর একটা পুতুল, যেটায় দম দিয়ে দিলে সে একটা বলকে মাটিতে ধাপাতে থাকতো । ওটাই ছিল আমার প্রধান আকর্ষণ। তখন তো এতো ব্যাটারিচালিত খেলনা পাওয়া যেত না - তাই দম দেয়া প্রায় অটোমেটিক সেই সমস্ত খেলনা দেখলে আর নিজেকে সামলানো যেত না। অবশ্য দম দেয়া খেলনার থেকেও বেশি আকর্ষণীয় একটা খেলনা তখন পাওয়া যেত - একরকম টিনের তৈরী মোটর বোট - ভেতরে একটা ছোট্ট প্রদীপ জ্বেলে দিলে সেটা জলের ওপর ফটফটিয়ে  চলতো। সে যাই হোক, প্রত্যেকবার ওই ট্রাঙ্কটা খোলা হলে আমার দাবিতে সেই পুতুলটা একবার চালানো হতো। আশ মিটতো না দেখে দেখে। কতবার বলেছি ওটা আমায় দিয়ে দিতে, কিন্তু কোনোবার ওটা পেতে সফল হই  নি। এছাড়াও সেই ট্রাঙ্ক থেকে বেরোতো একটা টিনের  সুটকেস - যেরকম সুটকেসে করে একসময় বাচ্ছারা স্কুলএর  বই খাতা নিয়ে যেত। সেটার ভেতরে ছিল একটা  চমৎকার ছবির বই। পড়তে শেখার পর দেখেছি তার প্রথম পাতায় লেখা ছিল :
Shilpika Mukherjee
First Prize
Class I

আর ছিল দু একটা ফ্রক - আমার সেগুলোর প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। এক জোড়া প্রায় নতুন কালো রঙের চামড়ার জুতোও ছিল।মন্দ নয় - তবে সেটা মেয়েদের জুতো বলে সেটা নিয়েও আমার কোনো লোভ ছিল না।
বছরে কমবেশি একবার এই বিশেষ ট্রাঙ্কটা  খোলা হত। বাবা ওটার কাছে বিশেষ ঘেঁষতো না। মা খুলত। তারপর খানিক্ষন বসে বসে কাঁদত। শেষমেশ কিছুক্ষণ  জিনিসপত্র রোদ্দুরে দিয়ে, ন্যাপথলিন জড়িয়ে সব আবার ট্রাঙ্ক বন্দী করে ফেলতো । তার পর সেই ট্রাঙ্ক এর ওপর অন্য একটা ট্রাঙ্ক চাপিয়ে রাখত। বুকের ওপর পাথর রাখার মতো। তারপর অনেকদিন চলতো আবার স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবন ।

আজও সেই ট্রাঙ্কটা  আমাদের শিবপুরের বাড়িতে পড়ে  আছে। শেষ খুলেছিলাম প্রায় বছর পাঁচেক আগে যখন গেছিলাম । সেই দম দেয়া পুতুলটা এখনো চলে। ইচ্ছে করলে নিয়ে নিতে পারতাম - বাবা মা কেউ নেই বাধা দেবার জন্য । কিন্তু আমার মহত্ম, যে আমি নিই নি। সব আবার গুছিয়ে তুলে রেখেছি । ওই ট্রাঙ্কটা খুলে কাঁদবার আজ আর কেউ নেই । ওগুলো ব্যবহার করার লোক তো তার আগেই হাওয়া হয়ে গেছে । কিছুদিন পর ওই ট্রাঙ্কটা খোলার লোকও থাকবে না । হয়তো কোনো পুরোনো লোহালক্কড়ের দোকানে ওটার ঠাঁই হবে । সেই দোকানদারটা জানতেও পারবে না যে ওটা খুললে একটা  চমৎকার দম দেয়া পুতুল পাওয়া যেতে পারে ।



No comments:

Post a Comment

রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...