অফিসের লন-এ ঘুরছিলাম। হঠাত ই চোখে পড়ল লেখাটা - 'Cineraria'.
ছোট ছোট বেশ সুন্দর ফুলগুলো| নানারকম রঙের| বাকি অনেক নাম না জানা ফুলের ভিড়ে ওরাও রয়েছে| আর নাম না জানা বলেই, ওদের সবার সামনে একটা করে বোর্ড আর তাতে লেখা তাদের নাম| কিন্তু ফুলের নামে কিবা আসে যায়? সেক্সপিয়ার না কে যেন কোথায় একটা লিখেছিলেন না "গোলাপ কে যে নামেই ডাক না কেন সে তো গোলাপ ই"! Cineraria গুলোও শেষ শীতের রোদ্দুরে বেশ ঝলমল করছে| যেন কিছু বাচ্ছা ছেলে মেয়ে রং-বেরঙের জামাকাপড় পরে রোদ্দুরে খেলে বেড়াচ্ছে|
কিন্তু আরো তো অনেক সুন্দর সুন্দর ফুল ছিল| এই Cineraria -ই কেন আমার নজর কাড়ল?
কারনটা লুকিয়ে ছিল স্মৃতির অতলে| প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে শোনা এই নাম| তখন কি আর জানতাম যে এটা একটা ফুলের নাম! আর এই নামটা আমার প্রত্যেক দিনের সঙ্গী ছিল প্রায় পঁচিশ বছর - যতদিন ঠাকুমা বেঁচে ছিল|
ছোটর থেকেই ঠাকুমার মুখে শুনে আসছি "চোখ দুটো একেবারে গেছে| ছানি পড়ার পর থেকে আর বেশিক্ষণ পড়ার ক্ষমতা নেই |"
"ছানির ওষুধ হয় না?" আমার স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল|
"বলছে তো অপারেশন করে নিতে| কিন্তু আমার বড় ভয় হয় রে| কি জানি কি করে দেবে! ডক্টর মজুমদার অবশ্য এই ওষুধটা ব্যবহার করে যেতে বলেছেন| বেশ উপকার পাচ্ছি" - ঠাকুমা একটা ছোট্ট শিশি দেখালো আমাকে| সবুজ রঙের বাক্সের মধ্যে রাখা ছিল| ওপরে একটা চোখের ছবি| ওটাই নাকি রোজ দিনে দুফোঁটা করে দু চোখে দিয়ে যেতে হয়|
এর পর থেকে আমি রোজ ঠাকুমার চোখে ওই আই ড্রপ দেবার ব্যাপারটা লক্ষ্য রাখতাম| একটু বড় হবার পর একদিন ঠাকুমা আমায় বলল "চোখের ড্রপ টা একটু দিয়ে দিতে পারবি রে?" এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজার যোগ্য হয়ে গেছি ভেবেই তো বেশ গর্বিত লাগলো| আর সেই থেকে ঠাকুমার চোখে রোজ দুই-দুই চার ফোঁটা ড্রপ দেবার কাজটা আমার ওপর এসে পড়ল| তখন মন দিয়ে ওষুধের নামটা দেখলাম "Cineraria Maritima"| আর একটা জিনিস লেখা ছিল শিশিটার ওপর - 'Schwabe'. ঠাকুমা বলল, ওটা হলো ওষুধটা যারা বানায়, সেই কোম্পানির নাম| খুব বড় জার্মান কোম্পানি| আরো জানলাম যে ওটা নাকি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ| অবাক লেগেছিল জেনে| আমার ধারণা ছিল হোমিওপ্যাথিক ওষুধ মানেই সাদা রঙের ছোট ছোট, মিষ্টি মিষ্টি গুলি|
ঠাকুমার ওই ওষুধটা কিনে আনত বাবা| মাঝে কিছুদিন ওটা পাওয়া যাচ্ছিল না| ওই এক-ই ওষুধ, কিন্তু অন্য কোনো কোম্পানি-র তৈরী, সেইটা আনছিল বাবা| সাদা রঙের বাক্সের মধ্যে এক-ই সাইজের শিশি| কোনো চোখের ছবি অবশ্য ছিল না সেটাতে| ঠাকুমা বলত "এ হলো আমেরিকান ওষুধ, তেমন কাজ হয় না| আসলে আমেরিকানরা চায় না যে জার্মান রা এগিয়ে যাক| সেই যুদ্ধের সময় থেকেই তো দেখছি|" ঠাকুমার মন চলে যেত চল্লিশের দশকের গোড়ায়|
আবার কিছুদিন পর থেকে Schwabe -র ওষুধ পাওয়া যেতে লাগলো| ঠাকুমার জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক হয়ে গেল| স্বাভাবিক মানে ওই আমেরিকা আর জার্মানি নিয়ে আলোচনা ছেড়ে, বারান্দায় রোদ পোয়াতে পোয়াতে আবার সেই এক -ই কথা "ছানি পড়ে চোখদুটো গেছে| ওই ডক্টর মজুমদার -এর ওষুধটায় তাও যেটুকু দেখি| দে তো রে চোখে দুটো ড্রপ দিয়ে|"
আজ Phacoemulsification করে কত সহজে হয়ে যাচ্ছে ছানির অপারেশন| একদিনেই হাসপাতাল থেকে ছুটি|| ঠাকুমা বেঁচে থাকলে Phaco করিয়ে দিতাম|
১৯৮৮ এর পর থেকে আমাদের বাড়িতে আর Cineraria Maritima আসে নি| ভাবছি একটা গাছ লাগাবো| আফ্রিকান ফুল আমার ফ্লাটের ব্যালকনি তে রোদ পোয়াবে| আর সেই রং এসে লাগবে আমার চোখে|


No comments:
Post a Comment