Thursday, November 7, 2019

শর্মাজী

তখন এসেছিল রিয়েল এস্টেট এর স্বর্ণযুগ| লোকজনের বাড়ির খুব দরকার, আর অত বাড়ি শহরে নেই|  কিছুলোক, সেই তালে, যেন তেন প্রকারে কিছু জমি যোগাড়  করে ছোট ছোট ফ্ল্যাট  বানিয়ে বিক্রি করতে লাগলো| এদের একটা গাল ভরা নাম হলো - প্রোমোটার|এদের সাফল্য দেখে আরো কিছু ব্যবসায়ী মানুষ বড় বড় ফ্ল্যাট বানাতে লাগলেন| যখন জমির অভাব শুরু হলো, তখন খেলার মাঠগুলো, মাঠে মারা গেল| তারপর শুরু হলো পুকুর বোজানো| সে আবার এক বেআইনি ব্যাপার| তাই রাতের অন্ধকারে একটু একটু করে আবর্জনা ফেলা হতে লাগলো| দেখতে দেখতে পুকুরগুলো ঝোপ ঝাড়ের আকৃতি নিল| তারপর একদিন সেই ঝোপ পরিষ্কার করে ঝপাঝপ   করে চারতলা বাড়ি উঠে গেল| প্রত্যেক ফ্লোর-এ চারটে  করে ফ্ল্যাট| আগে লোকে পুকুর বোজানো জমিতে বাড়ি কিনতো  না, কিন্তু যখন সাপ্লাই এর চেয়ে ডিমান্ড বেড়ে গ্যালো, লোকজন সব ভুলে যা পাওয়া যায় তাই কিনতে লাগলো| এরপর এলো আবাসন প্রকল্প| দেয়াল ঘেরা ছোট্ট শহর| তার বাহার বাড়তে থাকলো| ভেতরেই খেলার মাঠ, দোকান, বাগান কি নেই! আর সেগুলোর দামও হয়ে গেল আকাশচুম্বী| ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে লোন নেবার লম্বা লাইন পড়ে গেল|
কিন্তু চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়| চারিদিকে এত ফ্ল্যাট  হয়ে গেল, যে আর কেনার লোক নেই| তারপর নানান কারচুপি, ঘুষ, চুরি এইসমস্ত ধরা পড়তে লাগলো| রিয়েল এস্টেট এর লোকজনের মাথায় হাত পড়ল|
যারা এই ব্যবসায় ছিলেন তারা সবাই যে অসৎ ছিলেন, তা হয়ত নয়| আর সবারই যে ব্যবসা লাটে  উঠে গিয়েছিল, তাও নয়| তাই আমি বলতে পারব না, শর্মাজী কিধরনের মানুষ ছিলেন| দুর্গাপুজোর চাঁদা নিতে ওনার বাড়ি যেতাম| মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতেন| বসিয়ে চা আর চানাচুরও  খাওয়াতেন| সাজানো গোছানো  ড্রয়িংরুম| বিশাল সোফা সেট | দামী কাঠের চমৎকার সেন্টার টেবিল | সেপ্টেম্বর মাসেও শর্মাজী মোজা পরে , একটা মোটা  কম্বল জড়িয়ে বসে থাকতেন| আর সে কি বাহারি কম্বল ছিল ওনার! একদম কাশ্মীরি গালিচা যেন! বৌদি বলতেন, তোমাদের দাদার আবার শীতটা বড্ড বেশি|   শর্মাজী পরিষ্কার বাংলা বলতে পারতেন| ওনার বক্তব্য ছিল, কম্বল জড়িয়ে সোফায় বসে চা খাবার মত আনন্দ খুব কম  আছে| একটু শীত বাড়লে আবার পায়ের কাছে একটা হিটার জ্বলত| সরস্বতী পুজোর চাঁদা নিয়ে বেরোনোর আগে সেবার হাত মেলালেন| আগুনে সেঁকে সেঁকে তপ্ত হাত| আমারই বেশ আরাম লাগতে শুরু করলো|
এরপর এলো সেই দুঃসময়| বছর গড়াতে লাগলো আর ক্রমশ চাঁদার অঙ্ক কমে আসতে লাগলো|  চানাচুর ছাড়া চা আসতে শুরু করলো| তারপর চাও বন্ধ হয়ে গ্যালো| কম্বলটাও  কেমন পুরোনো পুরোনো লাগত| একবার দেখলাম, একটা কোনা ছিঁড়ে গেছে| হিটারটা দেখি একপাশে  খারাপ হয়ে পড়ে আছে| শর্মাজী বললেন "একটা হিটার কিনব ভাবছি| সবচেয়ে ভালো কোনটা বলোতো? একবারই কিনব, একদম সেরা জিনিস!" 
শেষ যেবার গেছিলাম, বৌদি দরজা খুলে বললেন , চাঁদা আমি পাঠিয়ে দেব| বৌদি ছিলেন বাঙালি| ওনার পরিচিত  আর এক মহিলার কাছে শুনলাম যে আর চাঁদা পাবার আশা নেই| পয়সাকড়ির  খুব টানাটানি চলছে| ওনাদের নাকি ছ-সাতটা বাড়ি ছিল, এখন এই একটাতে এসে ঠেকেছে| ছেলেটাও ছোট, স্কুল এ পড়ছে তখনো| তাই অর্থাগম এর আর কোনো উপায় খোলা নেই|
কয়েকবছর আর ওদিক মাড়াই নি| হঠাত শুনলাম উনি খুব অসুস্থ| হাসপাতালে ভর্তি| লিভারের সমস্যা| কিছুদিন পর আবার সব ঠিক ঠাক| কিন্তু মাস দুই আগে শুনি আবার উনি হাসপাতালে| জানলাম যে ওনার মদ্যপান অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছিল| অর্থাভাব ভুলতে উনি মদ্যপান বাড়িয়েছিলেন নাকি মদ্যপান  বাড়িয়ে উনি অর্থাভাবে পড়েছিলেন, জানি না| সিরোসিস অফ লিভার হয়ে গেছে| লিভার-এ নাকি জল জমেছে - হাসপাতাল এ গিয়ে সেই জল বার  করতে হচ্ছে|| এদিকে পয়সাকড়ির  যা অবস্থা, প্রাইভেট হাসপাতালে আর রাখা যাচ্ছে না| পাড়ার লোকজনরা মিলে কিছু সাহায্য করল, কিন্তু তাতে আর কতদিন চলে| শর্মাজির অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হতে লাগলো| হাসপাতালেও আর রাখতে চায় না| তখন এ হাসপাতাল, ও হাসপাতাল সে হাসপাতাল ঘুরে বেড়াতে লাগলেন| মানে উনি আর ঘুরে বেড়ানোর অবস্থায় ছিলেন না - ওনার পরিবারের লোকজন ওনার দেহটাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো| সেই হোটেল বুক না করে বেড়াতে গেলে যেমন হয়, সেই অবস্থা| ঠিকমত হোটেলগুলো বড্ড দামী, সস্তার হোটেল থাকার যোগ্য নয়| ভালো ধর্মশালা খুঁজতে হয়| তাই AIIMS আর  সফদারজং -এ   চেষ্টা চলতে লাগলো| তারাও ওই অবস্থার রুগী নিতে নারাজ| শেষপর্যন্ত চেনাজানা কাউকে ধরে কিছুদিন সফদারজং আর কিছুদিন AIIMSএ রাখা হলো| জ্ঞান নেই| ICU তে পড়ে আছেন|
নভেম্বর এর শুরুতে একদিন দেখতে গেলাম| AIIMSএ গিয়ে দেখি ওখানে কেউ নেই| ফোন করে জানলাম, AIIMS আর রাখবে না বলে আবার সফদারজং এ ফিরে গেছেন| ছেলে আর বৌ দেখি ওই ঠান্ডা ভোরে হাসপাতাল এর সিড়িতে বসে বসে ঢুলছে| যাক , শর্মাজী অন্তত ICU তে কম্বল চাপা দিয়ে আছেন - যা শীত কাতুরে মানুষ|
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে খবর পেলাম, শর্মাজী দেহ রেখেছেন| অনেকদিন পর ওনার বাড়ি গেলাম| সেই জৌলুস আর নেই| সোফাগুলো ছিঁড়ে গেছে| দেয়ালে বহুদিন পেন্টিং হয় নি | অগোছালো ঘর| মাটিতে একটা চাদরের ওপর শর্মাজির দেহ| গায়ের ওপরেও একটা চাদর - পাতলা আর পুরোনো| কিন্তু শর্মাজির এখন আর শীত লাগবে না|
আর একটু পরেই উনি যে হিটারের কাছে যাবেন, সেখানে মানুষ একবারই যায়|

No comments:

Post a Comment

রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...