Friday, February 23, 2018

হারিয়ে না যায়

কত কথাই তো মনে আসে| সুযোগ পেলে বলে ফেলি| কখনো হয়ত একই কথা একজনকে একাধিক বার বলি| তারা সবসময় মুখে কিছু বলতে পারে না - কিন্তু হয়ত বিরক্ত হয়| আমাকে যখন কেউ একই গল্প তিনবার শোনায় , আমার-ই  কি ভালো লাগে? বড়জোর বলি "হ্যাঁ হ্যাঁ - এটা আপনি সেদিন বলেছিলেন বটে!"

কিন্তু বলতেও তো হবে| নইলে গল্পগুলো হারিয়ে যাবে যে! তারপর যেদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেব, গল্পগুলো চিরতরে লুপ্ত হয়ে যাবে| এত বছর ধরে এত জায়গা ঘুরে, এত মানুষের সঙ্গে মিশে যে ঘটনাগুলো মনের মনিকোঠায় গেঁথে রেখেছি, সেই মালাগুলো কাকে পরিয়ে  দিয়ে যাব? প্রত্যেকদিনই তো এইভাবে কত গল্প ধ্বংশ হয়ে যাচ্ছে| বাবা, মা বা ঠাকুমা যে গল্পগুলো বলে যেতে পেরেছিল, সেগুলো আমি কিছুদিন অন্তত বয়ে বেড়াতে পারব| যেগুলো বলে নি - সেগুলো হারিয়ে গেছে|

কিন্তু লেখকরা একটা পাকা বন্দোবস্ত করে যান| যতক্ষণ লিখতে পারা যাচ্ছে, চিন্তা কি? আজ থেকে ৫০ বছর পরেও যদি এগুলোর মধ্যে একটা কারো ভালো লাগে, জীবন সার্থক| নইলে কি লাভ এ জীবনে? ছোট থেকে খেলাধুলা করলাম কিন্তু পেলে বা সোবার্স তো হই নি| পড়াশোনা করলাম, আইনস্টাইন  হলাম না| গান করলাম, মহম্মদ রফি হওয়া হলো না| পরীক্ষায় নম্বর পেলাম, সে মার্কশিটগুলো একসময় মুল্য থাকলেও আর দুদিন বাদে ওজন দরে বেচে  দেয়া যেতে পারে| চাকরি করলাম, পয়সা কিছু খরচা হলো বাজে কাজে, সামান্য খরচা হলো ভালো কাজে আর কিছুটা হয়ত পড়েই থাকবে| আমার কোম্পানি দুদিন বাদে ভুলে যাবে আমি কাজ ছাড়লে| তারপর একদিন দেহটা পুড়িয়ে ফেলবে সবাই মিলে - খেল খতম|

কিন্তু এতগুলো বছর অনেক কিছু দেখবার আর শোনবার সুযোগ পেলাম| অভিজ্ঞাতাগুলো শেয়ার করলে কারো হয়ত কোনদিন কাজে লেগে যাবে| কিম্বা কারো কোনো কাজে লাগবে না, স্রেফ পড়তে ভালো লাগবে| এক মিনিটের জন্যও যদি এসব পড়ে কেউ একটু হাসে, কোনো শ্মশানে, কোনো শ্যাওড়া গাছের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে, বাকি সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে নাকি সুরে গাইতে পারব - "সাঁর্থক  জঁনম আঁমার"।

শুরু করা যাক। যেদিন যেমন মনে আসবে লিখে যাব। সাথী কে দিয়েই শুর করি আজ?

আমার স্কুল জীবন  শুরু হয়েছিল বেশ দেরিতে। ক্লাস থ্রি তে  ভর্তি হলাম ভরদ্বাজ শিক্ষাশ্রম -এ।  সেকালে কলকাতায় কো-এডুকেসন  স্কুল খুব কম-ই ছিল| কিন্তু ভরদ্বাজ এর মত কিছু  স্কুল ছিল যেখানে ক্লাস ফোর পর্যন্ত কো-এডুকেসন চালু ছিল| আমাদের ক্লাস-এ আমি নতুন ছেলে - বাকিরা প্রায় সবাই  ক্লাস ওয়ান থেকে পড়ে আসছে | আমাকে কেউ বিশেষ পাত্তা দিত না| তবু সাথী আমাকে খুব-ই ভালবাসত | মাঝে মধ্যে টিফিনের সময় বাড়ি থেকে আনা আচারও  খেতে দিত| আর এসবের পেছনে কারন ছিল একটা সিনেমা  - "হাতি মেরে সাথী"| সে বছর-ই রিলিজ হয়েছিল - মারাত্মক হিট  ছবি| একটা গান  ছিল "চল চল চল মেরে  হাতি - ও মেরে সাথী"| ক্লাস এর বেশির ভাগ পাজি ছেলেমেয়েরা সাথীকে দেখলেই  ওই গানটা  গাইতে শুরু করত| বলতে ভুলে গেছি  - সাথীর চেহারাটা একটু মোটাসোটা ছিল| সাথী সাঙ্ঘাতিক রেগে যেত ওই গানটা  শুনলে| কিন্তু আমি কোনদিন  ওই গানটা সাথী কে শোনাই নি - আর সেই জন্যই এত প্রেম|
দিব্বি আচার খেয়ে দিন কাটছিল -  কিন্তু কয়েক মাস  ভরদ্বাজ শিক্ষাশ্রমে  শিক্ষালাভের জন্য শ্রম  করার পর আমার ডানা গজাল| সেদিন দিব্বি কুলের আচার খাচ্ছি| সাথী আমাকে বোঝাচ্ছিল যে কেন ও আমাকে এত পছন্দ করে - আমি বাকিদের মত নই ইত্যাদি| কি যে দুর্বুদ্ধি  হল, হঠাৎ সাথী কে বললাম "তুই আমার খুব বন্ধু|" তারপর সিনেমার নামটা একটু ঘুরিয়ে বললাম "সাথী মেরে হাতি"| ব্যাস আর যায় কোথায়? সাথী রেগে, কেঁদে  একাক্কার কান্ড| তারপর একটু  সামলে নিয়ে  বলল "তোকে  আমি ভাল ছেলে  বলে জানতাম আর শেষকালে  তুইও?"
এরপর থেকে সাথী আমার সঙ্গে আর কথা বলত না| ওই স্কুলে আমরা আরো  এক বছর ছিলাম  - টিফিনে আর কোনদিন  আচার খাই নি| ভরদ্বাজ  ছাড়ার পর থেকে কোনদিন সাথীর সঙ্গে দেখাও হয় নি| আজ দেখা হলেও চিনতে  পারব না| হয়ত সেবার ট্রেনে আমার সামনের  বার্থে এ বসে বসে যে বৌটা আচার  চাটছিল - সেটাই সাথী| কে জানে?

No comments:

Post a Comment

রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...