Monday, February 26, 2018

পামেলা

আগের লেখাতে লিখেছি "হারিয়ে না যায়"| কিন্তু লিখলেই যে সব  থেকে যাবে তারও কোনো গ্যারান্টি নেই| মানে, লেখা তো কাগজে বা ইন্টারনেট এ থাকবে - কারো মাথায় থাকবে কি? কত লোকেই তো গান রেকর্ড করে গেছে - তার কতগুলো আমরা শুনেছি বা শুনতে চাই? মান ভালো না হলে এগুলো পড়েই থাকবে| তবু চেষ্টা করে যেতে ক্ষতি কি?

আসলে, লেখার জন্য এত কিছু আছে যে শেষ হতে চায় না| গত ৫০ বছরে যা স্মৃতি জমিয়েছি, যদি শুধু  তার অর্ধেক -ও লিখতে চাই তো ২০ বছর লেগে যাবে| তার থেকেও ছেঁটে ছুটে স্রেফ কিছু ভালো লাগা ঘটনা যদি আলাদা করি - ৫ বছরের কমে তো কিছুই হবে না|
আর ঘটনা কি শুধু আমার জীবনেই? কত লোকের মুখে কত গল্প শুনেছি  - সেগুলোও কি কম আকর্ষক? বেঁচে থাকতে থাকতে তার কিছুটা তো অন্তত লিখে যেতে হবে|

আজ লিখি লেডি লিটনের কথা|  ১৮৭৬ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে এসেছিলেন লর্ড রবার্ট লিটন| যদ্দুর জানি তিনি এদেশে তেমন কিছু করে যেতে পারেন নি|  এর অনেকদিন পর, তাঁর ছেলে ভিক্টর লিটন বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন| কার্যকাল ছিল ১৯২২ থেকে ১৯২৭| মাঝে কিছুদিন উনি ভারতের একটিং  গভর্নর জেনারেল হয়েও কাজ করেন| কিন্তু আমার লেখা এনাকে নিয়েও নয়| আমার লেখার মধ্যমনি এনার স্ত্রী লেডি পামেলা প্লাউডেন লিটন|

হঠাত আমি পামেলা কে নিয়ে পড়লাম কেন? ফিরে যেতে হবে বছর পাঁচেক আগে| মা আগেই মারা গেছিলেন| বাবা মারা গেলেন ২০১২ তে| ওনাদের সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হলাম আমি - একমাত্র জীবিত বংশধর| কি কি যে ওনারা রেখে গেলেন সব -ই তো বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন| শুধু কলকাতার বাড়িতে দুটো মস্ত মস্ত ট্রাঙ্ক এর ভেতরে যে কি রহস্য ছিল, পুরোটা জানতাম না| পরের  বার যখন কলকাতা গেলাম, খুলে বসলাম সেই ট্রাঙ্কগুলো| মা এর সেলাই করার নেশা ছিল - কিছু নক্সা করা টেবিল ক্লথ পাওয়া গেল| অনেক রং-বেরং এর উল বেরোলো| তারপর বেরোলো একটা ছোট মেয়ের সাইজের কিছু জামা জুতো - বুঝলাম ওগুলো আমার দিদির স্মৃতি - যে অনেক কাল আগেই চলে গেছে| কিছু পুরোনো ফটো পাওয়া গেল| বেশির ভাগ -ই হলদে হয়ে যাওয়া সাদা-কালো ফটো| তাদের মধ্যে অনেককেই চিনতে পারলাম না| এরপর পেলাম একটা বহু পুরানো সার্টিফিকেট| আমার ঠাকুমার নামে| শুনেছিলাম ঠাকুমা খুব ভালো সেলাই করতেন| রীতিমত ট্রেনিং নিয়েছিলেন| আর তারপর অনেককেই সেলাই শিখিয়েছিলেন| রংপুর এ থাকতে নাকি কোনো এক জমিদার গিন্নি না রানীমাকেও সেলাই সেখাতে যেতেন - রাজবাড়ি থেকে জুড়িগাড়ী  আসত  ঠাকুমা কে নিতে| আসলে দাদুর সঙ্গে ঠাকুমার লড়াই হয়ে গেছিল কোনো কারণে - আর সেই থেকে ঠাকুমা স্বাধীন জীবন যাপন করতেন| কিছুদিন আবার কিছু সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপেও জুড়ে গেছিলেন - স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় - সম্ভবত পুলিন দাস এর দলের সঙ্গে| ফলে পুলিশের নজরদারিতেও  কাটাতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন|
সে যাই হোক, বলছিলাম সার্টিফিকেট এর  কথা| সেই সার্টিফিকেটের -এর নিচে দেখলাম পামেলা লিটনের সই| আমার পিসিমা কনফার্ম করলেন যে এ সেই প্লাউডেন লিটনই বটে| এই সেই সার্টিফিকেট -

এবার আমি নেট ঘাঁটতে বসলাম লেডি লিটনকে নিয়ে| নাঃ, উনি ভালো সেলাই করতেন বলে কথাও কিছু বলা নেই| সার্টিফিকেট এর সইটা উনি স্রেফ ছোটলাটের গিন্নি হিসেবেই করেছিলেন| রাজনৈতিক ভাবে উঁচু পদে থাকলে কে যে কাকে কিসের সার্টিফিকেট দিতে পারে - ভাবলে আশ্চর্য লাগে|
কিন্তু এই মহিলার সম্বন্ধে অন্য একটা চমকপ্রদ তথ্য পেলাম| উনি নাকি ছিলেন উইনস্টন চার্চিলের প্রথম প্রেম| ওনার সঙ্গে চার্চিলের আলাপ হয় চার্চিল যখন হায়দ্রাবাদে আসেন, ১৮৯৬ সালে| পামেলা ছিলেন ওখানকার ব্রিটিশ রেসিডেন্ট  স্যার ট্রেভর জন প্লাউডেনের এর ছোট মেয়ে|  চার্চিল এই সময় তাঁর মা কে চিঠিতে লেখেন

“I was introduced yesterday to Miss Plowden, who lives here in Hyderabad, about eight miles from Secunderabad.....I must say that she is the most beautiful girl that I have ever seen - bar none. We are going to try and do the city of Hyderabad together, on an elephant......You dare not walk on the roads here as the natives spit at Europeans – which provoke retaliation leading to riots”**

চার্চিল ভারতীয়দের দু চক্ষে দেখতে পারতেন না - এই চিঠিতেও তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়|
চার্চিল পামেলাকে অনেকদিন ভুলতে পারেন নি| বিয়ের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় কারণ চার্চিলের আর্থিক অবস্থা তখন তেমন ভালো ছিল না| ১৮৯৯ সালে কলকাতা থেকে চার্চিল পামেলাকে লেখেন

“My dear Miss Pamela, I have lived all my life seeing the most beautiful women London produces.......Never I have seen one for whom I would forgo the business of life...... Then I met you....For marriage, two conditions are necessary - money and the consent of both the parties. One certainly, both probably are absent.”**

কেমন দেখতে ছিলেন এই পামেলা? খুব বেশি ছবি খুঁজে পাই নি| তবুও সুন্দরী ছিলেন নিঃসন্দেহে|
Photo: Copyright: DailyMail.co.uk

এইবার আসল কথায় আসি| চিন্তা করুন তো, ওপরের  সার্টিফিকেট এ যে কোমল হাতের সই, সেই হাতকে  চুরুটের গন্ধওলা নিজের হাতে নিয়ে, হাতির পিঠে চড়ে উইনস্টন চার্চিল ঘুরে বেড়াচ্ছেন হায়দ্রাবাদ শহরে! হয়ত চারমিনারের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকাও খেয়েছিলেন| কে জানে?

**Thanks to "The Hindu" for the information.

No comments:

Post a Comment

রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...