দেবুদার একমাত্র মেয়ের বিয়ে। খুব ধুমধাম করেই হবার কথা। হচ্ছিলও তাই। বড় সড় একটা হোটেল বুক করেছিল দেবুদা। হোটেল ভর্তি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব| দেবুদার আত্মীয় মানে আমারও আত্মীয়| আর যেহেতু দেবুদা ছোটবেলা থেকে ভারতের নানান জায়গায় থেকে এসেছে, বন্ধুরাও সব সেসমস্ত জায়গা থেকে একে একে এসে পৌঁছাচ্ছিল। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও ওর এক সহকর্মী এসে হাজির। আমি যেহেতু একই শহরে থাকি, সকলের নানান প্রয়োজনের সুরাহা করছিলাম। এঘর ওঘর করে আড্ডাও চলছিল সমান তালে।
আমার সঙ্গে ছিলেন সুখেনদা, দেবুদার প্রাক্তন সহকর্মী এবং বন্ধু। উনিও আমার মতই স্থানীয়| ভারী চমৎকার সাদাসিধে মানুষ। ওনার ফটো তোলার খুব শখ| একটা দামী DSLR ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদেক যাচ্ছেন আর ফটো তুলছেন। কাঁধে একটা কালো রঙের বিরাট ব্যাগ - সম্ভবত ক্যামেরার সাজ সরঞ্জাম আছে। সময়টা ছিল গরমকাল। ওই ছোটখাটো চেহারা নিয়ে আর ভারী ব্যাগটা টানতে পারছেন না মনে হলো। বললাম, "ওটা আমায় দিন, আপনি ছবি তুলুন"। কিন্তু উনি কিছুতেই রাজি হলেন না। দেবুদা হেসে বলল "ওতে সুখেনদার অনেক শখের জিনিস আছে।"
ভেবে দেখলাম, হতেই পারে| হয়ত কামেরার স্ট্যান্ড আছে। না না, কোনো দামী লেন্সই হবে সম্ভবত। কিম্বা দুটোই বা আরো অন্য কোনো দামী জিনিস। ক্যামেরার ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আমার জ্ঞান সীমিত। সারাদিন সুখেনদা ঘুরে ঘুরে আড্ডা দিতে লাগলেন আর ছবি তুলতে লাগলেন। কিন্তু ব্যাগের লেন্সগুলো বের করলেন না, সম্ভবত রেখে দিলেন একদম বিয়ের সময়ের ফটো তোলার সময় ব্যবহার করবেন বলে। এক কাঁধে ক্যামেরা আর অন্য কাঁধে ওই ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে লাগলেন আর ঘামতে লাগলেন। আরো বার দুয়েক সাহায্যের হাত বাড়ালাম - উনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। বলেই ফেললাম, "নিজের কলজেটা ব্যাগে নিয়ে ঘুরছেন নাকি?" বৌদি, মানে ওনার স্ত্রী পাশেই ছিলেন, মুখ টিপে হেসে বললেন, "কলজেই বটে"। সত্যি, আর কাউকে এরকম ভাবে ক্যামেরার লেন্স আগলে চলতে দেখি নি আমি।
দুপুরে খেয়ে দেয়ে একটা ঘরে আমি আর সুখেনদা একটু জিরোতে বসলাম। ভদ্রলোককে আরো ভালো লাগতে শুরু করেছে আমার। অনেক গল্প করলেন। দুই পুরুষ ধরে প্রবাসী| দেবুদার সঙ্গে কিভাবে আলাপ। দেশের বাড়ির বর্তমান অবস্থা। তারপর ওনার ছবি তোলার শখ নিয়েও কথা হলো। ভাবলাম ব্যাগের মধ্যে রাখা দামী জিনিসটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। বলেই ফেললাম "আপনার ব্যাগ নিয়ে তো সবাই খুব ঠাট্টা করছে মনে হলো...."
একটু যেন কাঁচুমাঁচু হয়ে গেলেন সুখেনদা| মনে হলো ওনার শখ নিয়ে কেউ সেরকম কিছু বলুক উনি পছন্দ করেন না| বললেন "কি জানো ভাই, সেই সকাল থেকে সন্ধে অবধি প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি, ডেডলাইনের চাপ, বসের খিচির মিচির, রাস্তায় জ্যাম...বাড়ি যখন ফিরি কিচ্ছু ভালো লাগে না। তাই এই একটাই শখ - দেবু নিশ্চই তোমাকে বলে থাকবে।" দেবুদা সত্যই সুখেনদার ফটোগ্রাফির অনেক প্রশংসা আমার কাছে করেছিল| বললাম, "হ্যাঁ, কাল রাত্রেই বলছিল" ।
সুখেনদা একটা চাপা নিশ্বাস ফেলে বললেন "সবাই মজা করে আমার শখ নিয়ে। যে যা বলুক, একটু শান্তি পাই। সন্ধেবেলাটা এই নিয়েই কাটাই। তাও রোজ সম্ভব হয় না। সব সময় তো সঙ্গে নিয়ে ঘুরি না। ভাবলাম দেবুর মেয়ের বিয়ে ...."
উনি আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু এর মধ্যে দেবুদার শালা এসে আমাকে ধরল - "ভাই তৈরী হয়ে নাও, বর আনতে তোমাকেই যেতে হবে তো!
বর আনতে আনতে সাতটা বেজে গেল। তারপর আমি ফ্রী। নানান বৈবাহিক অনুষ্ঠান দেখতে লাগলাম আর আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হওয়ায়, গল্পে জড়িয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেবুদা এসে ধরল, "তুমি আমাকে ধুতিটা পরিয়ে দিতে পারবে? সুখেনদা পরাবে বলেছিলো, এখন যে কোথায় ফটো তুলতে চলে গেল, কে জানে!" দেবুদার সঙ্গে চললাম হোটেলের অন্য প্রান্তের একটা ঘরে। পথে সুখেনদার সঙ্গে দেখা। "আরে দেবু, তোমাকে তখন থেকে খুঁজছি - ধুতি পরতে হবে না?" উনিও আমাদের সঙ্গে চললেন। দেবুদা ধুতি পরেই দৌড়ালো| আমাদের বলে গেল, একটু অপেক্ষা কর তোমরা, এই ঘরে কিছু জিনিস রাখার আছে, আমি পাঠাচ্ছি।
সুখেনদা এসিটা বাড়িয়ে দিয়ে খাটের ওপর আরাম করে বসলেন। দিনে বোধহয় এই দ্বিতীয়বার ওনাকে ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামাতে দেখলাম। তারপর দেখি উনি ব্যাগটা খুলছেন। যা ভেবেছি তাই। ঠিক বিয়ের অনুষ্ঠানেই উনি ওই লেন্সটা ব্যবহার করবেন| কিন্তু কেমন এই লেন্স। টেলিফটো দিয়ে বিয়ের ছবি তুলবেন নাকি? নাহ, বোধহয় কোনো স্পেশাল এফেক্টওয়ালা লেন্স হবে। বিরাট বড় একটা ফ্ল্যাশ নয়তো? হয়তো বা অন্য আরেকটা ক্যামেরা| তবে যাই হোক, খুব সাংঘাতিক কিছু একটা যে হবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। ক্যামেরার দুনিয়াটাই আমার কাছে রহস্যাময়।
সুখেনদা গল্পের মেজাজে চলে এসেছেন। ব্যাগ খুলতে খুলতেই বলছেন "সেই যে কথাটা বলছিলাম, একটা শখ নিয়েই মনটা একটু ভালো রাখি| তাও তো রোজ হয় না।" এদিকে ব্যাগ খোলা হয়ে গেছে।উনি বার করে আনলেন একটা পেল্লায় সাইজের হুইস্কির বোতল আর একটা বাদামের প্যাকেট। টেবিলের ওপর দুটো গ্লাস আগেই রেখে দিয়েছিলেন| আমাকে বললেন "দেখ তো, ফ্রিজে একটা কোক রেখে গিয়েছিলাম, ঠান্ডা হয়েছে কিনা। বরফটাও বের কর। একটাই তো শখ - কোনো রকম খামতি থাকলে মনটা ভেঙ্গে যায়।
আমার সঙ্গে ছিলেন সুখেনদা, দেবুদার প্রাক্তন সহকর্মী এবং বন্ধু। উনিও আমার মতই স্থানীয়| ভারী চমৎকার সাদাসিধে মানুষ। ওনার ফটো তোলার খুব শখ| একটা দামী DSLR ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদেক যাচ্ছেন আর ফটো তুলছেন। কাঁধে একটা কালো রঙের বিরাট ব্যাগ - সম্ভবত ক্যামেরার সাজ সরঞ্জাম আছে। সময়টা ছিল গরমকাল। ওই ছোটখাটো চেহারা নিয়ে আর ভারী ব্যাগটা টানতে পারছেন না মনে হলো। বললাম, "ওটা আমায় দিন, আপনি ছবি তুলুন"। কিন্তু উনি কিছুতেই রাজি হলেন না। দেবুদা হেসে বলল "ওতে সুখেনদার অনেক শখের জিনিস আছে।"
ভেবে দেখলাম, হতেই পারে| হয়ত কামেরার স্ট্যান্ড আছে। না না, কোনো দামী লেন্সই হবে সম্ভবত। কিম্বা দুটোই বা আরো অন্য কোনো দামী জিনিস। ক্যামেরার ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আমার জ্ঞান সীমিত। সারাদিন সুখেনদা ঘুরে ঘুরে আড্ডা দিতে লাগলেন আর ছবি তুলতে লাগলেন। কিন্তু ব্যাগের লেন্সগুলো বের করলেন না, সম্ভবত রেখে দিলেন একদম বিয়ের সময়ের ফটো তোলার সময় ব্যবহার করবেন বলে। এক কাঁধে ক্যামেরা আর অন্য কাঁধে ওই ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে লাগলেন আর ঘামতে লাগলেন। আরো বার দুয়েক সাহায্যের হাত বাড়ালাম - উনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। বলেই ফেললাম, "নিজের কলজেটা ব্যাগে নিয়ে ঘুরছেন নাকি?" বৌদি, মানে ওনার স্ত্রী পাশেই ছিলেন, মুখ টিপে হেসে বললেন, "কলজেই বটে"। সত্যি, আর কাউকে এরকম ভাবে ক্যামেরার লেন্স আগলে চলতে দেখি নি আমি।
দুপুরে খেয়ে দেয়ে একটা ঘরে আমি আর সুখেনদা একটু জিরোতে বসলাম। ভদ্রলোককে আরো ভালো লাগতে শুরু করেছে আমার। অনেক গল্প করলেন। দুই পুরুষ ধরে প্রবাসী| দেবুদার সঙ্গে কিভাবে আলাপ। দেশের বাড়ির বর্তমান অবস্থা। তারপর ওনার ছবি তোলার শখ নিয়েও কথা হলো। ভাবলাম ব্যাগের মধ্যে রাখা দামী জিনিসটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। বলেই ফেললাম "আপনার ব্যাগ নিয়ে তো সবাই খুব ঠাট্টা করছে মনে হলো...."
একটু যেন কাঁচুমাঁচু হয়ে গেলেন সুখেনদা| মনে হলো ওনার শখ নিয়ে কেউ সেরকম কিছু বলুক উনি পছন্দ করেন না| বললেন "কি জানো ভাই, সেই সকাল থেকে সন্ধে অবধি প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি, ডেডলাইনের চাপ, বসের খিচির মিচির, রাস্তায় জ্যাম...বাড়ি যখন ফিরি কিচ্ছু ভালো লাগে না। তাই এই একটাই শখ - দেবু নিশ্চই তোমাকে বলে থাকবে।" দেবুদা সত্যই সুখেনদার ফটোগ্রাফির অনেক প্রশংসা আমার কাছে করেছিল| বললাম, "হ্যাঁ, কাল রাত্রেই বলছিল" ।
সুখেনদা একটা চাপা নিশ্বাস ফেলে বললেন "সবাই মজা করে আমার শখ নিয়ে। যে যা বলুক, একটু শান্তি পাই। সন্ধেবেলাটা এই নিয়েই কাটাই। তাও রোজ সম্ভব হয় না। সব সময় তো সঙ্গে নিয়ে ঘুরি না। ভাবলাম দেবুর মেয়ের বিয়ে ...."
উনি আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু এর মধ্যে দেবুদার শালা এসে আমাকে ধরল - "ভাই তৈরী হয়ে নাও, বর আনতে তোমাকেই যেতে হবে তো!
বর আনতে আনতে সাতটা বেজে গেল। তারপর আমি ফ্রী। নানান বৈবাহিক অনুষ্ঠান দেখতে লাগলাম আর আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হওয়ায়, গল্পে জড়িয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেবুদা এসে ধরল, "তুমি আমাকে ধুতিটা পরিয়ে দিতে পারবে? সুখেনদা পরাবে বলেছিলো, এখন যে কোথায় ফটো তুলতে চলে গেল, কে জানে!" দেবুদার সঙ্গে চললাম হোটেলের অন্য প্রান্তের একটা ঘরে। পথে সুখেনদার সঙ্গে দেখা। "আরে দেবু, তোমাকে তখন থেকে খুঁজছি - ধুতি পরতে হবে না?" উনিও আমাদের সঙ্গে চললেন। দেবুদা ধুতি পরেই দৌড়ালো| আমাদের বলে গেল, একটু অপেক্ষা কর তোমরা, এই ঘরে কিছু জিনিস রাখার আছে, আমি পাঠাচ্ছি।
সুখেনদা এসিটা বাড়িয়ে দিয়ে খাটের ওপর আরাম করে বসলেন। দিনে বোধহয় এই দ্বিতীয়বার ওনাকে ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামাতে দেখলাম। তারপর দেখি উনি ব্যাগটা খুলছেন। যা ভেবেছি তাই। ঠিক বিয়ের অনুষ্ঠানেই উনি ওই লেন্সটা ব্যবহার করবেন| কিন্তু কেমন এই লেন্স। টেলিফটো দিয়ে বিয়ের ছবি তুলবেন নাকি? নাহ, বোধহয় কোনো স্পেশাল এফেক্টওয়ালা লেন্স হবে। বিরাট বড় একটা ফ্ল্যাশ নয়তো? হয়তো বা অন্য আরেকটা ক্যামেরা| তবে যাই হোক, খুব সাংঘাতিক কিছু একটা যে হবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। ক্যামেরার দুনিয়াটাই আমার কাছে রহস্যাময়।
সুখেনদা গল্পের মেজাজে চলে এসেছেন। ব্যাগ খুলতে খুলতেই বলছেন "সেই যে কথাটা বলছিলাম, একটা শখ নিয়েই মনটা একটু ভালো রাখি| তাও তো রোজ হয় না।" এদিকে ব্যাগ খোলা হয়ে গেছে।উনি বার করে আনলেন একটা পেল্লায় সাইজের হুইস্কির বোতল আর একটা বাদামের প্যাকেট। টেবিলের ওপর দুটো গ্লাস আগেই রেখে দিয়েছিলেন| আমাকে বললেন "দেখ তো, ফ্রিজে একটা কোক রেখে গিয়েছিলাম, ঠান্ডা হয়েছে কিনা। বরফটাও বের কর। একটাই তো শখ - কোনো রকম খামতি থাকলে মনটা ভেঙ্গে যায়।
No comments:
Post a Comment