Sunday, January 3, 2021

পিকলুর উল্টো clue

 

ক্লু

পিকলুর মাথায় গোলমাল ছিল| সবাই না জানলেও বাড়ির লোকেরা নিশ্চিত ছিল| প্রায় বারো বছর বয়েস হল – কিন্তু সমস্যা ক্রমশই বাড়ছে বই কমছে না|

ধরা যাক পিকলু ওর ঘরে পড়াশোনা করছে| বাবা বললেন – “হয়ে গেলে আসার আগে লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে আসিস|” পিকলু কিন্তু ঠিক ভুলে যাবে| এবং একদিন বা দুদিন নয় – প্রত্যেকদিন| দিনে দশবার বললে দশবারই| আবার ধরা যাক সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছে বলে পিকলুর মা কিছু ভিজে জামাকাপড় পিকলুর ঘরের কোনে একটা আলনাতে মেলে দিয়ে ফ্যানটা চালিয়ে দিলেন| যাবার আগে পিকলুকে বলে গেলেন – “দেখিস, ফ্যানটা যেন বন্ধ করিস না|” কিন্তু ঠিক সেই দিনই পিকলু নির্ঘাত ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে আসবে| জিজ্ঞেস করলে বলবে “ওঃ, ভুলে গেছিলাম”, কিম্বা, “তুমিই তো রোজ বল ফ্যান লাইট নিভিয়ে আসতে|”

দিনের পর দিন এই ঘটনায় বাবা মা তো হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন| পিকলুর দিদি ডাক্তারি পড়ছে – ফার্স্ট ইয়ার| সে সেদিন সব দেখে শুনে বলল – “ঘরের হিউমিডিটি বেশি থাকলে ওর ব্রেন ঠিক মত কাজ করে – তখন ফ্যান বন্ধ করতে ভোলে না|”

মা বললেন – “তুই আবার এলি আরেক পন্ডিত! যেখানে ফ্যান বন্ধ করাটাই ভুল – সেটা করলে ঠিক কাজ কি করে হল?”

সেবার গরমের ছুটিতে পিকলুর মামা এসেছিলেন অনেকদিন পর| আজকাল অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন – ওখানে কোথায় যেন ফিজিক্স পড়ান| এখানে গরমের ছুটি - মানে ওনাদের শীতের ছুটি – পিকলু বলে – “সব উল্টো”| সেই শুনেই বোধহয়, ওনার মাথায় একটা নতুন থিওরী এল এবং দেখা গেল তাতে বেশ কাজ হচ্ছে| ওনার বক্তব্য – পিকলুর ব্রেন সব কিছুকে উল্টো করে ভাবে| তাই, যা বারণ করা হয়, সেটাই করে| ফটোর নেগেটিভের মত ব্যাপার আর কি! নিজের থিওরী প্রমাণ করার জন্য উনি পিকলুকে কিছু টাকা দিয়ে বললেন “যা দেখি, মোড়ের দোকান থেকে এক বোতল কোক কিনে নিয়ে আয় – দেখিস, পেপসি নিস না যেন!” পিকলু বেরিয়ে যাবার পর মামা বললেন “দেখিস, ও ঠিক পেপসি নিয়ে আসবে!” আর হলও তাই| মামা বুঝিয়ে  গেলেন – পিকলুর ব্রেন কে উল্টো ক্লু দিতে হবে, তাহলেই সব সোজা হয়ে যাবে|

এর পর থেকে পিকলুকে নিয়ে বাড়িতে ঝামেলা অনেকটা কমে গেল| যা দরকার তার উল্টো ক্লু দিলেই কাজ হয়ে যাচ্ছিল|

সেদিন ওর ঠাকুমার কোন এক গুরুদেবের আসার কথা| খুব নাকি বড় সাধুবাবা| কতরকম যে ভেল্কি জানেন!শোনা যায় অনেকদিন আগে কোনো এক শিষ্যার  ছেলের নাকি পা দুটো পোলিও তে বেঁকে গিয়েছিল| হাঁটা চলা করতে খুব কষ্ট| বাবাজী জটাটা জলে ভিজিয়ে একবার ছিটিয়ে দিয়েছিলেন ছেলেটার মাথার ওপর| পরের বছর সে ন্যাশনাল গেমস –এ হাই জাম্প এ সিলভার মেডেল পায়| গোল্ড –ই পেত - কিন্তু বাবাজীর আর এক ভক্তের ছেলেও অংশ নিয়েছিল কিনা – সে ছেলেটিই সেবার গোল্ল্ড পেল – বাবাজী তাদের নাকি কথা দিয়েছিলেন! আরও এরকম কত রটনা মুখে মুখে! অবশ্য পিকলুর মার সব যে বিশ্বাস হত তা নয় – আবার ঠিক অবিশ্বাস করার সাহস-ও ছিল না|

বাবাজী এলেন| খুব খাওয়া  দাওয়া হল – ভাত, ঘি, ডাল, সুক্ত, মন্ডা, মিঠাই ইত্যাদি| তারপর দিবা নিদ্রা| বিকেলে দু-কাপ চা আর কিঞ্চিত সিঙ্গাড়া নিমকি ভোজনের পর বাবাজী বসলেন ভক্তদের সমস্যার সমাধানে|

ভক্তেরা কেঁদে লুটিয়ে পড়ে – বাবাজী কারো মাথায় হাত ঠেকান তো কারো কানে মন্ত্র বলেন| সামনের বাড়ির রীতা বৌদি ছেলেটাকে নিয়ে এসেছেন| অদ্ভুত এক সমস্যা তার – পরীক্ষা হল–এ নাকি খালি পিঠের ঠিক মাঝখানটা চুলকোতে থাকে| এমন এক জায়গা যে হাত ও পৌঁছয় না| আর প্রায় –ই অর্ধেক পেপার ছেড়ে আসতে হয় – নম্বর কমে যায়| না হলে নাকি প্রতি বছর–ই তার ফার্স্ট হবার কথা| বাবাজী ছেলেটির পিঠের মাঝখানে নিজের ওই ফাটা ময়লা পা দুখানা একবার ঠেকিয়ে বললেন “হো জায়গা”| এই আর এক ধাঁধা – সবাই জানে যে বাবাজী বাঙালী – আদি বাড়ি আরামবাগের কাছে – কিন্তু সারাজীবন হিমালয় টিমালয় ঘুরে আজকাল আর সহজে বাংলা বলতে চান না!

পিকলুর মা বসে বসে দেখছিলেন| একবার মনে হল – ছেলেটাকে একবার বাবাজীকে দিয়ে একটু মন্তর তন্তর করালে হয় না? ক্ষতি তো আর কিছু হচ্ছে না – এ তো খানিকটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মত ব্যাপার! যদি পুরোপুরি সেরে যায়!

যা ভাবা তাই কাজ| পিকলু সামনেই ছিল| কাছে ডেকে চুপি চুপি বললেন – “যা তো বাবা পিকলু, ওই বাবাজীর গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মেরে আয় তো দেখি!”

পিকলু, মামার “নেগেটিভিটি ল” অনুযায়ী বাবাজীর সামনে গিয়ে একদম পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল| বাবাজীও ঐটুকু ছেলের ভক্তি দেখে আপ্লুত| পিকলুর মা বাবাজীর কাছে গিয়ে সমস্যাটা বললেন আর শেষ করলেন অশ্রুসিক্ত চোখে এই বলে - “বাবাজী, আপনিই পারেন ছেলেটাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলতে|”

বাবাজীর কেমন মায়া হল| একটা হাত রাখলেন পিকলুর মাথার ওপর| পিকলুর সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুত খেলে গেল| একবার মনে হল ও আকাশে উড়ছে| পরক্ষনেই মনে হলো ও মন্দারমনির সমুদ্রে সাঁতার কাটছে| তারপর সবার মাঝে ছিটকে পড়ল| বাবাজি ওনার কমন্ডলুর থেকে একটু  জল ছিটিয়ে দিলেন পিকলুর ওপর| আস্তে আস্তে পিকলু উঠে বসলো| সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষারত|

পিকলু একবার মার দিকে দেখল – তারপর সবাইকে হতভম্ব করে বাবাজীর সামনে গিয়ে ওনার গালে সজোরে এক থাপ্পড় মারলো|

পিকলু এখন সম্পূর্ন সুস্থ| বাবাজী আজকাল আর এ বাড়িতে আসেন না – কলকাতা এলে রীতা বৌদিদের ওখানেই ওঠেন|

No comments:

Post a Comment

রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...