ক্লু
পিকলুর মাথায় গোলমাল ছিল|
সবাই না জানলেও বাড়ির লোকেরা নিশ্চিত ছিল| প্রায় বারো বছর বয়েস হল – কিন্তু সমস্যা
ক্রমশই বাড়ছে বই কমছে না|
ধরা যাক পিকলু ওর ঘরে
পড়াশোনা করছে| বাবা বললেন – “হয়ে গেলে আসার আগে লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে আসিস|” পিকলু
কিন্তু ঠিক ভুলে যাবে| এবং একদিন বা দুদিন নয় – প্রত্যেকদিন| দিনে দশবার বললে
দশবারই| আবার ধরা যাক সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছে বলে পিকলুর মা কিছু ভিজে জামাকাপড়
পিকলুর ঘরের কোনে একটা আলনাতে মেলে দিয়ে ফ্যানটা চালিয়ে দিলেন| যাবার আগে পিকলুকে
বলে গেলেন – “দেখিস, ফ্যানটা যেন বন্ধ করিস না|” কিন্তু ঠিক সেই দিনই পিকলু নির্ঘাত
ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে আসবে| জিজ্ঞেস করলে বলবে “ওঃ, ভুলে গেছিলাম”, কিম্বা,
“তুমিই তো রোজ বল ফ্যান লাইট নিভিয়ে আসতে|”
দিনের পর দিন এই ঘটনায় বাবা
মা তো হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন| পিকলুর দিদি ডাক্তারি পড়ছে – ফার্স্ট ইয়ার| সে সেদিন
সব দেখে শুনে বলল – “ঘরের হিউমিডিটি বেশি থাকলে ওর ব্রেন ঠিক মত কাজ করে – তখন
ফ্যান বন্ধ করতে ভোলে না|”
মা বললেন – “তুই আবার এলি
আরেক পন্ডিত! যেখানে ফ্যান বন্ধ করাটাই ভুল – সেটা করলে ঠিক কাজ কি করে হল?”
সেবার গরমের ছুটিতে পিকলুর
মামা এসেছিলেন অনেকদিন পর| আজকাল অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন – ওখানে কোথায় যেন ফিজিক্স
পড়ান| এখানে গরমের ছুটি - মানে ওনাদের শীতের ছুটি – পিকলু বলে – “সব উল্টো”| সেই শুনেই
বোধহয়, ওনার মাথায় একটা নতুন থিওরী এল এবং দেখা গেল তাতে বেশ কাজ হচ্ছে| ওনার
বক্তব্য – পিকলুর ব্রেন সব কিছুকে উল্টো করে ভাবে| তাই, যা বারণ করা হয়, সেটাই
করে| ফটোর নেগেটিভের মত ব্যাপার আর কি! নিজের থিওরী প্রমাণ করার জন্য উনি পিকলুকে কিছু
টাকা দিয়ে বললেন “যা দেখি, মোড়ের দোকান থেকে এক বোতল কোক কিনে নিয়ে আয় – দেখিস,
পেপসি নিস না যেন!” পিকলু বেরিয়ে যাবার পর মামা বললেন “দেখিস, ও ঠিক পেপসি নিয়ে
আসবে!” আর হলও তাই| মামা বুঝিয়ে গেলেন –
পিকলুর ব্রেন কে উল্টো ক্লু দিতে হবে, তাহলেই সব সোজা হয়ে যাবে|
এর পর থেকে পিকলুকে নিয়ে বাড়িতে
ঝামেলা অনেকটা কমে গেল| যা দরকার তার উল্টো ক্লু দিলেই কাজ হয়ে যাচ্ছিল|
সেদিন ওর ঠাকুমার কোন এক
গুরুদেবের আসার কথা| খুব নাকি বড় সাধুবাবা| কতরকম যে ভেল্কি জানেন!শোনা যায় অনেকদিন
আগে কোনো এক শিষ্যার ছেলের নাকি পা দুটো
পোলিও তে বেঁকে গিয়েছিল| হাঁটা চলা করতে খুব কষ্ট| বাবাজী জটাটা জলে ভিজিয়ে একবার
ছিটিয়ে দিয়েছিলেন ছেলেটার মাথার ওপর| পরের বছর সে ন্যাশনাল গেমস –এ হাই জাম্প এ সিলভার
মেডেল পায়| গোল্ড –ই পেত - কিন্তু বাবাজীর আর এক ভক্তের ছেলেও অংশ নিয়েছিল কিনা –
সে ছেলেটিই সেবার গোল্ল্ড পেল – বাবাজী তাদের নাকি কথা দিয়েছিলেন! আরও এরকম কত
রটনা মুখে মুখে! অবশ্য পিকলুর মার সব যে বিশ্বাস হত তা নয় – আবার ঠিক অবিশ্বাস
করার সাহস-ও ছিল না|
বাবাজী এলেন| খুব
খাওয়া দাওয়া হল – ভাত, ঘি, ডাল, সুক্ত,
মন্ডা, মিঠাই ইত্যাদি| তারপর দিবা নিদ্রা| বিকেলে দু-কাপ চা আর কিঞ্চিত সিঙ্গাড়া
নিমকি ভোজনের পর বাবাজী বসলেন ভক্তদের সমস্যার সমাধানে|
ভক্তেরা কেঁদে লুটিয়ে পড়ে –
বাবাজী কারো মাথায় হাত ঠেকান তো কারো কানে মন্ত্র বলেন| সামনের বাড়ির রীতা বৌদি
ছেলেটাকে নিয়ে এসেছেন| অদ্ভুত এক সমস্যা তার – পরীক্ষা হল–এ নাকি খালি পিঠের ঠিক
মাঝখানটা চুলকোতে থাকে| এমন এক জায়গা যে হাত ও পৌঁছয় না| আর প্রায় –ই অর্ধেক পেপার
ছেড়ে আসতে হয় – নম্বর কমে যায়| না হলে নাকি প্রতি বছর–ই তার ফার্স্ট হবার কথা| বাবাজী
ছেলেটির পিঠের মাঝখানে নিজের ওই ফাটা ময়লা পা দুখানা একবার ঠেকিয়ে বললেন “হো
জায়গা”| এই আর এক ধাঁধা – সবাই জানে যে বাবাজী বাঙালী – আদি বাড়ি আরামবাগের কাছে –
কিন্তু সারাজীবন হিমালয় টিমালয় ঘুরে আজকাল আর সহজে বাংলা বলতে চান না!
পিকলুর মা বসে বসে
দেখছিলেন| একবার মনে হল – ছেলেটাকে একবার বাবাজীকে দিয়ে একটু মন্তর তন্তর করালে হয়
না? ক্ষতি তো আর কিছু হচ্ছে না – এ তো খানিকটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মত ব্যাপার!
যদি পুরোপুরি সেরে যায়!
যা ভাবা তাই কাজ| পিকলু
সামনেই ছিল| কাছে ডেকে চুপি চুপি বললেন – “যা তো বাবা পিকলু, ওই বাবাজীর গালে
কষিয়ে একটা থাপ্পড় মেরে আয় তো দেখি!”
পিকলু, মামার “নেগেটিভিটি
ল” অনুযায়ী বাবাজীর সামনে গিয়ে একদম পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল| বাবাজীও ঐটুকু ছেলের
ভক্তি দেখে আপ্লুত| পিকলুর মা বাবাজীর কাছে গিয়ে সমস্যাটা বললেন আর শেষ করলেন
অশ্রুসিক্ত চোখে এই বলে - “বাবাজী, আপনিই পারেন ছেলেটাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে
তুলতে|”
বাবাজীর কেমন মায়া হল| একটা
হাত রাখলেন পিকলুর মাথার ওপর| পিকলুর সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুত খেলে গেল| একবার মনে
হল ও আকাশে উড়ছে| পরক্ষনেই মনে হলো ও মন্দারমনির সমুদ্রে সাঁতার কাটছে| তারপর সবার
মাঝে ছিটকে পড়ল| বাবাজি ওনার কমন্ডলুর থেকে একটু
জল ছিটিয়ে দিলেন পিকলুর ওপর| আস্তে আস্তে পিকলু উঠে বসলো| সবাই রুদ্ধশ্বাসে
অপেক্ষারত|
পিকলু একবার মার দিকে দেখল –
তারপর সবাইকে হতভম্ব করে বাবাজীর সামনে গিয়ে ওনার গালে সজোরে এক থাপ্পড় মারলো|
পিকলু এখন সম্পূর্ন সুস্থ| বাবাজী
আজকাল আর এ বাড়িতে আসেন না – কলকাতা এলে রীতা বৌদিদের ওখানেই ওঠেন|
No comments:
Post a Comment