Sunday, January 3, 2021

আশ্চর্য শহর

 কলকাতায় আসার পর সেই প্রথম বাবার অফিসে যাওয়া – মায়ের হাত ধরে| চিত্তরঞ্জন এভিনিউ–এর ওপর পাঁচ–ছ তলা একটা বাড়ি| মা রাস্তাঘাট সম্বন্ধে অতটা সড়গড় ছিলেন না – বাবা অফিসে যাবার আগে তাই বার বার বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন – “পঞ্চান্ন নাম্বার বাস – সামনে ধর্মতলা লেখা দেখে উঠবে কিন্তু, নইলে সে বাস হাওড়া অবধি গিয়ে আর যাবে না, মানে থাকে যেন|” তারপর ১৮ পয়সার টিকিট, মেট্রো সিনেমা পেরিয়ে আশু মুখার্জ্জীর স্ট্যাচু, কফি হাউস – সব পুংখানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দিলেন|

কলকাতা ছোট বেলায় আমার কাছে স্বপ্নপুরী ছিল – কত লোক, দোতলা বাস, ট্রাম, বিশাল এক নদী – সে  এলাহী ব্যাপার| কানপুরে তো তেমন কিছুই নেই| সেখানে বাবার অফিসটাও ছিল সাদামাটা – এমন পাঁচতলা বাড়ি – নাঃ, ছিল না সেই অফিসে |

এক জায়গায় জ্যাম ছিল – একটু দেরী হয়ে গেল| রাস্তার নামটা পড়ে দেখি ব্র্যাবোর্ন রোড| আহা – কলকাতার রাস্তার নামগুলো-ও কেমন সুন্দর! বিরহানা রোড বা পটকাপুর জাতীয় কোনো হাবিজাবি নাম নয়| ধর্মতলা, মেট্রো সিনেমা, আশু মুখার্জ্জীর স্ট্যাচু পেরোলাম| স্ট্যাচুর মাথায় একটা কাক বসেছিল – সে সময় খুব মজা লেগেছিল| এরপর কফি হাউস| দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি সব রাজা মন্ত্রীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে – অর্থাৎ চোগা চাপকান পাগড়ি পরে লোকজন সার্ভ করছে| তার পরেই বাবার অফিস| সিঁড়ির নিচের অপরিসর জায়গাটায় একজন লোক একটা টেলিফোনে নিয়ে বসে আছে| মা গিয়ে কি যেন বলতে লোকটি বলল – ওই ডিপার্টমেন্টে তো ফোন নেই – দাঁড়ান, পাশের ঘরে বলে দিচ্ছি| দাঁড়িয়েই আছি| হঠাৎ চোখ পড়ল একটা ছোট্ট ঘরের দিকে| খুবই ছোট| ভেতরে কাঠের টুলে একটা লোক বসে – সামনে কোলাপসিবল গেট বন্ধ| লোকটাকে কি জেলখানায় আটকে রেখেছে? হয়তো অফিসে পড়া না পারলে এই রকম –ই শাস্তি দেয়| এর মধ্যে আর একজন লোক এসে ওই গেটের সামনে দাঁড়িয়েছে| বন্দী লোকটা টুল থেকে নেমে গেট খুলে দিল – যাক, তাহলে তালা দেয় না| দেখি গেট একটা নয় – দু দুটো| বেশ শক্ত পোক্ত ব্যবস্থা| কিন্তু তালা নেই কেন? মানে হল একটাই কারন – যদি বাথরুম যেতে হয়! কিন্তু এটা কি নতুন বন্দী? কেউই দেখি পড়াশোনা করে না! ইতিমধ্যে নতুন বন্দী ভেতরে ঢুকে গেট বন্ধ করে দিয়েছে| এ বোধহয় মেঝেতেই বসবে| কিন্তু কোথায় কি? এরপর যা দেখলাম নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলাম না! এ কি স্বপ্ন না মায়া? ওই লোকটাই কি পি সি সরকার? এ কি অদ্ভুত ব্যাপার! লোকদুটো শুদ্ধ সমস্ত ঘরটাই ওপরের দিকে উঠে গায়েব হয়ে গেল| কয়েকটা ল্যাজের মতো জিনিস ঝুলছিল| দেখতে দেখতে সেগুলোও দৃষ্টির অগোচর হয়ে গেল| মা ব্যাপারটা খেয়াল করেন নি| বলব কি না ভাবছি – দেখি সেই ল্যাজ গুলো আবার দেখা যাচ্ছে| আবার ওই ঘরটা নিচে এসে হাজির| সেই প্রথম বন্দীটা তখনো আছে – বোধহয় মেয়াদ বেশী|  অন্য বন্দীটার ছুটি হয়ে গেছে| তার জায়গায় নতুন দুটো কয়েদী| কিন্তু তাদের –ও নিচে এসেই ছুটি হয়ে গেল| কি কম-কম শাস্তি রে বাবা! এই রকম চলতেই থাকল| সম্ভবত আমার মুখটা হাঁ হয়ে গেছিল আর ওই টুলের ওপর বসা বন্দীটা সেটা লক্ষ্য করেছিল| আমায় বলল – “খোকাবাবু লিফটে উঠবে?” হ্যাঁ, আমি উঠি আর উনি কোথাও নিয়ে গিয়ে আমায় ভ্যানিস করে দেন আর কি! যদি সত্যি কেউ তালা মেরে দেয়? প্রবল আপত্তি জানালাম| মা দেখি হাসি হাসি মুখে বলছেন “যা না – ঘুরে আয়”| ইতিমধ্যে বাবা এসে পড়েছেন এবং সব ব্যাপারটা বুঝে আমায় নিয়ে লিফটে উঠলেন| সে এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা|

কিন্তু এখানেই শেষ নয়| সেদিন আমার জন্য আরো দুটো স্মরনীয় ঘটনা অপেক্ষা করছিল| খানিক পরে বাবার অফিস থেকে বেরিয়ে আমার বেশ ক্ষিধে পেয়ে গেল| দু-একটা বাড়ি পেরিয়ে একটা রেস্টুরেন্ট-এ গিয়ে বসা হল| এর আগে বাইরে থেকে রেস্টুরেন্ট দেখেছি – ভেতরে গিয়ে টেবিল চেয়ার জুড়ে বসা সম্ভবত সেই প্রথম| বাবা কি যেন একটা অর্ডার করলেন| একটু পরে তিনটে থালা আর ছটা বাটি এসে হাজির| একটা বাটিতে ডালের মতো কি যেন| অন্য বাটিতে পোস্তবাটার মত কিছু একটা| কিন্তু থালায় ওটা কি? কে যেন একটা বিরাট পিজবোর্ডকে গোল পাকিয়ে রেখে দিয়েছে| শুনলাম ওটাকে নাকি ধোসা বলে| ম্যাড্রাসী খাবার| নামটা ভারী মাজার| খেয়ে তো এত ভালো লাগলো কি বলব| মা ভেবেছিলেন আমি অতটা খেতে পারব না| উল্টে মায়ের পক্ষেই সম্ভব হলো না আর আমি নিজেরটা শেষ করে মায়েরটায় ভাগ বসালাম| এর পরেও বেশ কয়েকবার ওখানে ধোসা খেতে গেছি| নামটা সম্ভবত ছিল ম্যাড্রাস কাফে| বহুদিন পরে, বছর পাঁচেক আগে ওখানে শেষবার যাই| চেয়ার টেবিল থেকে ধোসা সাম্বার (এখন আর ডাল বালি না) সবই একরকম আছে – এয়ার কন্ডিশনারটাই নতুন আমদানী - আগে তো কটা ফ্যান মাত্র ছিল|

এরপর কি সব কেনা কাটা করে বাড়ি ফেরার পালা| হাওড়া স্টেশন–এ এসে বাস বদলাতে হবে| হাওড়া ব্রিজের পরেই দেখি বালির বস্তা দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা| কিছু মিলিটারী বসে আছে| বাবা কাছে নিয়ে গিয়ে দেখালেন – “ঐ দেখ, ওটা হল এন্টি-এয়ারক্রাফট গান| এখন পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হচ্ছে তো – যদি ওদের এরোপ্লেন হাওড়া ব্রিজ ভেঙ্গে আমাদের অসুবিধা করতে আসে তাহলে এই কামান দেগে প্লেনকে নামিয়ে দেওয়া হবে| শুনে খুব খুশী হলাম| হাওড়া ব্রিজ ভেঙ্গে গেলে কলকাতা যেতে খুব অসুবিধে হবে – আর সেই অসুবিধের মধ্যে কি আর কখনো ধোসা খেতে পারব? কিন্তু প্লেন নামিয়ে কেন দেবে? ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবে না? আর নামাবেই বা কোথায়? নদীর জলে? স্টেশন–এর প্লাটফর্ম-এ? এই সমস্ত সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে এন্টি-এয়ারক্রাফট গান দেখছিলাম| এক জওয়ান –এর নজর পড়ল আমার দিকে| ইয়া এক সর্দারজী| হেসে বললেন – “আ যাও – তুম অন্দর যা সকতে হো”| বাবা আমাকে ঠেলে দিলেন|আমি ভয়ে ভয়ে বেশি কাছে গেলাম না| কি জানি, কখন গুড়ুম করে একটা গোলা বেরিয়ে যাবে! কিন্তু সর্দারজী নাছোড়বান্দা – “আরে নজদিক যাও| কুছ নহী হোগা| ছুঁ সকতে হো|” – পাগল আর কি? কোথায় না কোথায় হাত লেগে শেষে কেলেঙ্কারী বাধবে| পরের দিন হয়ত আনন্দবাজারে আমার ছবি-ই বেরিয়ে যাবে – জেলখানায় বন্দী – হাওড়া ব্রিজ উড়িয়ে দেবার অপরাধে – নাকি, নামিয়ে দেবার অপরাধে?

No comments:

Post a Comment

রাজনীতির ধাক্কা

রাজনীতি নিয়ে    আমার জ্ঞান ছিল খুবই সামান্য।    এবং আজ যে সেটা কিছু মাত্র বেড়েছে সে দাবি আমি করি না।ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা ভা...