আমার মায়ের একটা শখ ছিল - গরিবের ছেলে মেয়েদের একটু পড়াশোনা শেখানো| কিন্তু গরিবের ছেলে মেয়ে তো আর চারিদিকে কিলবিল করছিল না, তাই মার নজর গিয়ে পড়েছিল আমাদের বাড়ির কাজের লোক দাসীদির ছেলেমেয়েদের দিকে| দাসীদির অপর্যাপ্ত সংখ্যায় ছেলেমেয়ে ছিল - সেই বছর-কুড়ির মোহন থেকে শুরু করে একেবারে "কথা না ফোটা" সন্ধ্যা অবধি|মাঝখানে মদন, মলিনা, রানু, খাঁদি, গণেশ আর কার্তিক| আটজন - একেই বোধহয় গণ্ডা গণ্ডা বলে| আমার বয়স তখন বছর দশেক হবে| রানু ছিল মোটামুটি আমারই বয়সী| হয়তো সেইজন্যই মার নজর প্রথমেই পড়ল রানুর ওপর| কিন্তু পড়াবো বললেই তো আর সবাইকে পড়ানো যায় না! প্রথম সমস্যা দেখা দিল রানুর পরিষ্কার পরিছন্নতা নিয়ে| সারা গায়ে কালিমাখা, মাথার চুলের জট, নোংরা জামা, পায়ে কাদা, কাছে গেলে গা থেকে একটা উৎকট গন্ধ বেরোয় - এমন একটা মেয়েকে ঘরে ঢুকিয়ে পড়াশোনা করানো বেশ কঠিন ব্যাপার| মার প্রথম কাজ হলো রানুকে পরিষ্কার করা| সম্ভবত তখন আমার গরমের ছুটি| একদিন দেখি রান্না বান্না সেরে দুপুরবেলা রানুকে নিয়ে মা চলল পাতকুয়োর ধারে| তারপর বালতি বালতি জল আর একটা সাবান দিয়ে ঘষে মেজে রানুকে যথাসম্ভব চকচকে করার চেষ্টা হলো| বাড়ি থেকে একটা পরিষ্কার জামা আনতে বলেছিল - রানু সেটা পরল| কিন্তু শুধু পরিষ্কার করলেই তো হবে না - যে পড়বে তার মনটা তো পড়ার দিকে যেতে হবে! তার জন্য পেট খালি থাকলে চলবে না| অতএব এরপরে রানুকে নিয়ে মার গন্তব্য হল আমাদের রান্নাঘর| সেখানে কিছু ভাত, ডাল, তরকারি খাওয়ানো হলো রানুকে| তারপর মা তাকে নিয়ে বসল পড়াতে| অ-আ-ক-খ দিয়ে শুরু হল এবং শেষও হলো| পড়াশোনা ব্যাপারটা নিয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহ ছিল না রানুর| তিন চার দিন ভাত ডাল খেয়ে রানু হাওয়া| কিন্তু মার জেদ চেপে গেছে ওই "দাসীর র ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা শেখাতে হবে"| এরপরে মা পাকড়াও করল গণেশকে| বয়স তখন তার পাঁচ-ছয় হবে| মার বক্তব্য, একটু ছোটর থেকে ধরলে লেখাপড়ায় উৎসাহটা আসবে |কিন্তু গণেশের অবস্থাও তথৈবচ - বরং রানুর চেয়ে আর এক ধাপ এগিয়ে সে ছোঁড়া| রানুর সমস্ত গুণ গণেশের মধ্যে ছিল আর তার সঙ্গে ছিল নতুন শেখা, চোখা-চোখা কিছু গালিগালাজ| তবে মায়ের বক্তব্য ছিল ঠিকমতন পড়াশোনা শেখাতে পারলে ছেলেটাকে হয়তো মানুষ করা যাবে| কিন্তু কোথায় মানুষ আর কোথায় গণেশ!গণেশ মন দিয়ে রুটি তরকারি খেত আর তারপরে মন না দিয়ে পড়াশোনা করতো| বাইরে গিয়ে আবার সেই খিস্তিখেউড় গালিগালাজ চালাত| আমাদের বাড়ীওয়ালা শিবরামবাবু একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন - গণেশের হঠাৎ কি খেয়াল হল দৌড়ে এসে বলল "এই সুনুর বাপ, তোর পেটে এক নাতি (অর্থাৎ লাথি)" এই বার্তা চারদিকে ক্রমে ক্রমে রটে গেল - সুতরাং গণেশ আমাদের বাড়িতে এসে আসলে কি শিখছে তাই নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীর মনে হয়তো সন্দেহ দেখা দিয়ে থাকবে| গণেশ অধ্যায়ের সেখানেই সমাপন, অন্তত তখনকার মতো|
এই ঘটনার আরো চার-পাঁচ বছর পরের কথা| আমরা তখন একটা নতুন বাড়িতে ভাড়া উঠে গেছি - অন্য এক পাড়ায়| সেখানে মা সুবিধা মতন ছোট ছেলে মেয়ে খুঁজে পাচ্ছিল না | ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটল যেটা মার কাজের খুব সুবিধা করে দিল| দাসীদিরাও পাড়া বদল করে আমাদের পাড়ার কাছে চলে এল এবং দাসীদি আবার আমাদের বাড়ির কাজে বহাল হল| এতদিনে কার্তিক-ও একটু বড় হয়েছে| একসঙ্গে গণেশ আর কার্তিককে আবার পাকড়ালো আমার মা| আবার তাদের কুয়োতলায় নিয়ে গিয়ে সেই চান করানো| আমার ছোট হয়ে যাওয়া কিছু জামাকাপড় গণেশের দিব্যি ফিট হয়ে গেল| কার্তিক ও সেরকম এক সেট জামা প্যান্ট পেল - যদিও প্যান্টটাকে হাত দিয়ে ধরে থাকতে হচ্ছিল| অবশ্য তাতে কিছু এসে যেত না ওদের, কারণ বেশির ভাগ সময়-ই ওদের দেখেছি ন্যাংটো হয়ে মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াতে| আর ওই দুজনেরই সব সময় সর্দি লেগে থাকতো| তাই চান করানোর সময় ওদের দিয়ে ভালো করে নাক ঝাড়ানো হত| কখনো কোনো হোমিওপ্যাথিক ওষুধও খাওয়াতে দেখেছি| কতটা কাজ হত জানি না| যাই হোক, পড়াশোনা শুরু হল| কার্তিক গণেশ অ-আ, এবিসিডি ইত্যাদি একটু শিখে ফেলল তারপর এল অঙ্ক| সংখ্যা পরিচয় হল| যোগ করতে শিখলো গণেশ - তিনের সঙ্গে চার যোগ করলে কত হয় জিজ্ঞেস করলে দিব্যি বলে দিতে পারতো| এরপর বিয়োগের পালা - যেটা আমি কোনদিন ভুলবো না| ইতিমধ্যে আমার ঠাকুমা আমাদের শিবপুরের বাড়িতে এসেছেন অনেক দিন পর | ঠাকুমা তখন তিনটে জায়গায় ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন| কানপুর- যেখানে বহু দিন থেকেছেন এবং চাকরিও করেছেন, তারপর জব্বলপুর - আমার পিসির বাড়ি আর আমাদের ওই শিবপুর| আমাদের বাড়ির ভেতরের দিকে একটা রক ছিল তার সামনে একটু উঠোন| সেই রকে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোদ্দুর আসত| সেখানে বসে কখনো চা খেতাম, কখনো রোদ পোয়াতাম, কখনো বা জুতো পালিশ করতাম আমার বাবার কড়া "নিজে কর" শাসনে| সেদিন ঠাকুমা রোদ্দুরে বসে আছেন, পাশেই গণেশ কার্তিকের পড়াশোনা চলছে| মা ঠাকুমাকে বলল "আপনি একটু ওদের বিয়োগটা দেখিয়ে দিন তো, আমি একবার রান্নাঘর থেকে আসছি"| রান্নাঘর ছিল সামনেই উঠনের ধারে| সেখানে ঢুকে মা আলু না বেগুন কিছু একটা কাটতে শুরু করলো| আমি রকের অন্য প্রান্তে বসে ঠাকুমা কি করেন দেখতে লাগলাম| ঠাকুমা গণেশকে বললেন "বলতো দেখি চারের থেকে দুই চলে গেলে কত থাকে?" পড়া না করা ছাত্ররা যেমন করে, গণেশ সেইরকমভাবে আকাশ, গাছ , বারান্দার উপরের সিলিং ইত্যাদি দেখতে লাগল আর বিড় বিড় করতে লাগলো| ঠোঁট নড়ছে কিন্তু আওয়াজ নেই| কার্তিক ওদিকে চেষ্টা করতে থাকলো কোনোভাবেই ঠাকুমার দিকে না তাকানোর| ঠাকুমা বোঝালেন "এই যে তোর হাতে চারটে বিস্কুট রয়েছে এর থেকে যদি আমি দুটো নিয়ে নিই .... " এতটা বলার পরেই গণেশ চটপট চারটে বিস্কুট নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল| এরপরও ঠাকুমা নানাভাবে গনেশ কার্তিককে বিয়োগ বোঝানোর চেষ্টা করে চললেন | শেষ পর্যন্ত ঠাকুমার মনে পড়ল কানপুরের সেই স্কুলের কথা যেখানে বহু বছর বহু বাঙালি অবাঙ্গালীকে উনি পড়িয়েছেন | তাই আদর করে গণেশ কে বললেন "দেখ, চারের থেকে দুই গেলে থাকে দুই - কেননা ওটা তো কমে গেল | আর এই জন্যেই বিয়োগকে সহজ ভাষায় বলে 'ঘাটানো'| যদিও বা গণেশ কিছুটা বুঝেছিল এই 'ঘাটানো' শুনে ওর সমস্ত কিছুই কেমন ঘেঁটে গেল| এরপর কার্তিক গণেশকে নিয়ে বেশিদূর এগোতে হয়নি মাকে| গুণ ভাগ আর হয়ে উঠল না| ওদের আর বিশেষ দেখি নি কোনদিন| শুধু একবার মা কোথা থেকে যেন রিকশা করে বাড়ি ফিরল| আমি জানলা দিয়ে দেখি মা দু টাকা না পাঁচ টাকা রিকশাওয়ালাকে দিতে চাইছে আর রিকশাওয়ালা তাতে ঘোরতর আপত্তি জানাচ্ছে| ভাবলাম হয়তো বেশী পয়সা চায়| বাইরে বেরোতেই শুনি মা বলছে "আরে পয়সা নেবে না কেন?" রিকশাওয়ালা ততক্ষণে খানিকটা এগিয়ে গেছে| হঠাৎ মা বলল "আরে, তুই গণেশ না?" আর দেখে কে - গণেশ তড়িঘড়ি সে তল্লাট ছেড়ে হাওয়া| কি জানি কেন - বোধহয় ভেবেছিল মা যদি আবার পড়তে বসিয়ে দেয়| কিম্বা যেটুকু পড়াশোনা শিখেছিল হয়তো তারই গুরুদক্ষিণা দিয়ে গেল| ততদিনে পয়সাকড়ির হিসেব রাখার মত যোগ বিয়োগ করতে পারতো নিশ্চই | কার্তিক কি করত বা আজ কি করে আমি জানিনা| কেউ যেন বলেছিল গণেশ রিকশা ছেড়ে এখন ট্যাক্সি চালায়| গণেশ কার্তিক জীবনে উন্নতি করুক কিন্তু মার উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি|
মার পরবর্তী আকর্ষণ ছিল খাঁদি | খাঁদির বেলায় কিছু কিছু সুবিধে ছিল| প্রথমত খাঁদি ততদিনে একটু বড় হয়েছে এবং ওর মায়ের দু-একটা বাড়ির বাসন মাজার কাজ নিজের হাতে নিয়েছে| তার মধ্যে একটা ছিল আমাদেরই বাড়ির কাজ| তাই ওর ভালো লাগুক বা না লাগুক আমাদের বাড়িতে আসতেই হত| দ্বিতীয়ত, সে খুব একটা নোংরা ছিল না সুতরাং পাতকুয়োতলার কাজটা মাকে আর করতে হলো না| আর সবচেয়ে যেটা বড় ব্যাপার, খাঁদি পড়াশোনা করা যখন শুরু করল ওর মধ্যে যেন একটু শেখার ইচ্ছে দেখা দিল| খাওয়ার লোভে পড়াশোনা করত না| কিন্তু বাংলা লেখার সময় খাঁদি কিছুতেই ঠিকমত মাত্রা দিতে পারতো না| মা খালি বলত "আরে বোকা মেয়ে, একটা সোজা লাইন টানতে পারিস না?" খাঁদি কিন্তু সেই ট্যারা বাঁকা একটা মাত্রা টানতো| মাঝে মধ্যে তো মনে হত যেন সিসমোগ্রাফের আঁকি বুকি দেখছি| দু-তিন বছর লেগেছিল খাঁদিকে গড়ে তুলতে| বাংলা পড়তে শিখল গড়গড়িয়ে| লিখতেও পারতো দিব্যি| ইংরেজি অক্ষর জ্ঞান হয়েছিল| যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ জানতো| সবথেকে বড় ব্যাপার হল, খাঁদি নিজের নাম লিখতে খুব ভালবাসত | তাই দেখে আমার বাবা খাঁদিকে বললেন "লিখতে পড়তে শিখেছিস, এবার তোর একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে দেব|" খাঁদিকে জিজ্ঞেস করলেন "তোর ভালো নাম কি রে ?" খাঁদি বলল "খাঁদি মণ্ডল"| তারপর কি যেন ভেবে বলল, "না মামা, ওটা আমার নাম নয়| আমার নাম কালকে বলব|" সেদিন হয়তো সারারাত্তির বাড়িতে শুয়ে খাঁদি ভেবেছিল নিজের একটা চমৎকার নাম কি হতে পারে যেটা লেখাও বেশ সহজ হবে| পরের দিন এসে আমার বাবাকে বলল "মামা, আমার নাম দিয়েছি ডলি|" তখন আবার মা তাকে দু চারদিন ডলি মন্ডল সই করা অভ্যাস করাল | খুলল ডলির ব্যাঙ্ক একাউন্ট| মাসের শুরুতে মাইনে পেলেই কিছুটা ব্যাঙ্কে জমা করতে যেত সে| কদাচিৎ টাকা তুলত| আমাকেও বোধহয় তখন অবধি আমার বাবা ভরসা করে একা ব্যাঙ্কের কোনো কাজে পাঠাতেন না|
বহুদিন দাসীদির পরিবারের কারও সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই| আশা করি ডলি মণ্ডলের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স এখন বেশ মোটাসোটা অঙ্কে দাঁড়িয়েছে| হয়তো সে চেক কাটতেও শিখেছে এবং বেশ সোজা সোজা লাইন টেনে চেক ক্রস করতেও পারে|
একজনের জন্য হলেও, মার পরিশ্রম সফল হয়েছে|
No comments:
Post a Comment