অনেক ছোটবেলায় একবার হরিদ্বার গিয়েছিলাম, বেড়াতে|সেখানে একদিন গঙ্গার ঘাটে দেখি এক সাধুবাবা সামনে ধূনি জ্বালিয়ে ঈষৎ তূরীয় অবস্থায় বসে রয়েছেন| আমার মা তাঁর কাছে গিয়ে হাতে একটা সিকি দিয়ে বললেন "বাবা আমার এই ছেলেটার হাতটা একটু দেখে দাও তো"| আজকালকার ছেলেমেয়েদের জন্য বলি, সিকি হল পঁচিশ পয়সা| সে জামানায় পঁচিশ পয়সায় অনেক কিছুই পাওয়া যেত| এই ঘটনার প্রায় তিন চার বছর পরেও আমি দশ পয়সায় চারটে ফুচকা খেয়েছি সুতরাং সাধুবাবা ইচ্ছে করলে সে সময় হয়তো পঁচিশ পয়সায় ডজন খানেক ফুচকা খেতে পারতেন| অবশ্য সাধুরা ফুচকা খান কিনা আমি জানিনা - অন্তত আমি কোনদিন কোন সাধুকে ফুচকা খেতে দেখি নি| হয়তো সংসারের সমস্ত সাধ আহ্লাদ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার এটাও একটা অংশ| ফুচকা খাওয়ার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা যে কত বড় একটা আত্মত্যাগ সেটা যাঁরা ফুচকা খেয়েছেন তাঁরা হলফ করে বলতে পারবেন|
সাধুবাবা আমার ডান হাতটা একটু নেড়েচেড়ে দেখে বললেন "ইসকা লম্বা উমর হোগা|" তারপর মার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন শুধু লম্বা উমর দিয়ে এই মহিলাকে খুশি করা যাবে না| তাই যোগ করলেন "আচ্ছা নোকরি লগ যায়েগা|" হয়তো আশা করেছিলেন সেই নোকরির মাইনের কিছু অংশ মা সাধু সন্তের সেবায় অগ্রিম নিয়োজন করবে| কিন্তু মার উদ্দেশ্য ছিল অন্য| আমার দিদি পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো ছিল - আমার মায়ের আশা গগনচুম্বী করে দিয়ে সে অকালে মারা যায়| আর আমার পড়াশোনার বহর দেখে মা হয়তো তখন অবধি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, যে এ ছেলে কদ্দুর কি করবে| তাই হাত জোড় করে বাবাজীকে বলল "আশীর্বাদ কারো যেন ছেলেটার লেখাপড়া হয় " সাধুবাবা সহাস্যে আমার মাথায় হাত ঠেকিয়ে বললেন "বহুৎ পঢ়াই হোগা|" মার মুখটা খুশী খুশী দেখে উনি আরো কিছু যোগ করলেন যাতে মার আনন্দ মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল "ইয়ে লড়কা মেট্রিক পাশ করেগা|" কিন্তু আশ্চর্য সেই ভবিষ্যৎবাণী! এই ঘটনার প্রায় দশ বছর পরে আমি মেট্রিক অর্থাৎ মাধ্যমিক পাশ করলাম|
কিন্তু সে ব্যাপারে আরো একজনের একটা বড়সড় ভূমিকা ছিল| তাকে নিয়েই মূলত এই কাহিনী| সে হল আমাদের বাড়ির বিশ্বস্ত কাজের লোক - দাসীদি| দাসীদিকে কেন যে আমি দিদি বলতাম তা আমি ঠিক বলতে পারবো না| দাসীদির আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে অন্তত তিনজন আমার থেকে বয়সে বড় ছিল| তাছাড়া দাসীদি আমার মাকে বৌদি বলত| সম্ভবত আশেপাশে পাড়ার দাদারা দিদিরা যেরকম সম্বোধন করত আমিও তাই করতাম| আর তার নামটা নিয়েও আমার মনে প্রশ্ন ছিল - একজন মানুষের নাম কি করে দাসী হতে পারে! যদিও কর্মসূত্রে সে দাসীগিরি করত, কিন্তু ডাক্তারের নাম কি ডাক্তার হয়? মনে আছে কানপুর থেকে আমার এক জ্যাঠাইমা কিছুদিনের জন্য শিবপুরে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন| ফিরে যাবার আগেরদিন উনি জানতে পারলেন যে দাসীদির নাম সত্যিই দাসী| মাকে বললেন "আমি ভাবলাম তোমরা কলকাতার লোক, হয়তো শুদ্ধ বাংলায় কাজের লোককে দাসী বল|"
দাসীদি মাঝে মধ্যে আশ্চর্য সব প্রবচন ব্যবহার করত| তার অর্থ বুঝতে অসুবিধে হত না কিন্তু পুরো বাক্যটাতেই কোনো একটা সাম্প্রতিক ঘটনার রেশ থাকতো| তার মধ্যে একটা এখনো আমার মনে আছে| দাসীদির কোনো মেয়ে সম্ভবত খুব দামী কোনো জামাকাপড় কেনার কথা বলে থাকবে, যেটা দাসীদির পছন্দ হয় নি| আমার মার কাছে তাই নিয়ে নালিশ করতে করতে বলেছিল - "ওই যে কথা আছে না - বড়লোকের বিটি লো তোর নম্বা নম্বা চুল|" সে সময় একটা গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল "বড়লোকের বিটি লো, লম্বা লম্বা চুল|" -সেটাকেই দাসীদি প্রবচন বানিয়ে ফেলেছিল| হয়তো বলতে চেয়েছিল "ছোট মুখে বড় কথা|"
সেবার কোনো কারণে আমাকে দাসীদির বাড়ি যেতে হয়েছিল| সেই প্রথমবার| গিয়ে দেখি একটা আট ফিট বাই আট ফিট ঘর আর তার সামনে তার চেয়েও ছোট একটা খোলা বারান্দা| ভেবে পেলাম না এরা দশজন এই বাড়িতে ঘুমোয় কি করে!" জিজ্ঞেস করেছিলাম| শুনলাম কয়েকজন ওই বাইরের বারান্দায় শোয়|
দাসীদির বরের নাম ছিল ভরত| কোনো কাজ কর্ম করত না| এর ওর কাছে এক টাকা দু টাকা চেয়ে বেড়াত| দাসীদির কাছেও চাইত - যদিও পেত না| দাসীদির বক্তব্য ছিল "খালি নেশা ভাং করবে|" অবশ্য নেশা করে ভরত তার বাড়ির লোকেদের মারধর করত বলে শুনি নি কখনো|
সেবার চুরির দায়ে ধরা পড়ল দাসীদির ছেলে| কিছুদিন জেলে ছিল| সে সময়ে একদিন তার দুই বোন খুব সেজে গুজে রাস্তা দিয়ে চলেছে - আমার মা জিজ্ঞেস করল "কোথায় যাচ্ছিস তোরা?"
-"দাদার সঙ্গে দেখা করতে|"
মা যেন আকাশ থেকে পড়ল - "জেলখানায় যাবি তো অত সেজেগুজে যাবার কি হয়েছে?"
দাসীদির কিঞ্চিত পরিচয় দিলাম এটা বোঝানোর জন্য যে তারা ছিল আর পাঁচটা গরীব পরিবারের মত| আর আমার মায়ের কোন কারণে একটা ধারণা ছিল যে গরিব মানুষদের আশীর্বাদের খুব জোর|
এবার মূল গল্পে ফিরে আসি| সে সময়ে আমরা গুরুজনদের প্রণাম করে পরীক্ষা দিতে যেতাম| আমি ভাবতাম, যাদের বাড়ির গুরুজনদের আশীর্বাদ-এর শক্তি যত বেশি তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় তত বেশী নম্বর পায়| আমার বাড়িতে গুরুজনের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না| বেশিরভাগ সময়ে শুধু বাবা আর মা| কখনও সখনও ঠাকুমাও থাকতেন | ওদিকে সঞ্জয়ের বাড়ীতে ওর বাবা, মা আর দিদি ছাড়া আরো কত গুরুজন ছিলেন, সে সম্বন্ধে আমার কোন জ্ঞান ছিল না| তবে ওর বাড়ির সম্মিলিত আশীর্বাদ বরাবরই আমার বাড়ির আশীর্বাদকে অনায়েসে হারিয়ে এসেছে - এ ব্যাপারে আমি ভুক্তভোগি |
তখন বোধহয় ক্লাস সেভেনে পড়ি| আমার পড়াশোনার গতি প্রকৃতি তেমন ভালোর দিকে যাচ্ছিল না| মনে আছে, সহজ সহজ ফ্যাক্টোরাইজেশনের অঙ্ক করতে হিমশিম খেয়ে যেতাম| আমার হোম টাস্কের খাতা দেখে একদিন নির্মলবাবু এতটাই ক্ষেপে গিয়েছিলেন যে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন| খাতাটা পাখির মত ডানা মেলে উড়তে উড়তে ক্লাসরুমের দরজার কাছে গিয়ে পড়েছিল| আমার বন্ধু বান্ধবেরা ভারী আনন্দ পেয়েছিল সেদিন - ছোটরা বোধহয় পরের দুঃখে আনন্দ পেতে ভালোবাসে| সেবার ভয়ের চোটে পরীক্ষার আগের রাত্রে আমার জ্বর এসে গেল - সমস্ত কিছু গুলিয়ে যেতে লাগল| মা ডেকে পাঠালেন তাঁর বন্ধু বিমলা মাসীমাকে| বিমলা মাসীমা পাড়ার এক নামী স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন|উনি এসে আমার বিছানার পাশে বসে আমাকে বোঝাতে লাগলেন যে ফ্যাক্টোরাইজেশন মোটেই কঠিন নয়| "এই দ্যাখ না - এইরকম করে মিডল টার্ম ভাঙ্গবি|" দেখে শুনে তো আমার আক্কেল গুড়ুম | আমি আরো ঘাবড়ে গেলাম - এত সহজ জিনিসও আমি বুঝতে পারছি না! জীবনে প্রথমবার ফেল করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে লাগলাম| পরের দিন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি - দাসীদি তখন ঘর মুছছে| মাকে প্রণাম করে বেরোবো, মা বলল "দাসীদিকেও প্রণাম করো, বড়দের প্রণাম করার সময় সামনে যত গুরুজন থাকেন সবাইকে প্রণাম করতে হয়|" বাড়ির কাজের লোককে প্রণাম করতে হবে এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অদ্ভুত লেগেছিল কিন্তু কি আর করা - মা বলেছে, কোনো উপায় নেই| দাসীদি প্রথমটায় ঘোরতর আপত্তি জানালো| শেষমেষ মায়ের চাপে পড়ে খুব সংকুচিত ভাবে প্রণাম গ্রহণ করলো| তারপর বললো "পাস করে এসো|" মা বললো "পাস করে এসো কিগো? বল, ফার্স্ট হয়ে এসো|" দাসীদি কি বুঝলো কে জানে, বলল "ফাস্টো হয়ে এসো|" কিভাবে জানি না অঙ্ক পরীক্ষাটা বেশ ভালোভাবেই উতরে গেল সেদিন | রেজাল্ট বেরলে দেখা গেল যে জীবনে প্রথমবার আমি ফার্স্ট হয়েছি| এরপর থেকে মায়ের বদ্ধ ধারণা হয়ে গেল দাসীদির আশীর্বাদের জোরেই আমার এই পরিবর্তন| দাসীদির ওপর হুকুম হয়ে গেল পরীক্ষার সময় কামাই করা চলবে না| আর দাসীদিরও অভ্যাস হয়ে গেল আমি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় "ফাস্টো হয়ে এসো" কথাটা বলার|
আমার অবশ্য ধারণা ছিল বাবা মায়ের আশীর্বাদ এর সঙ্গে দাসীদির আশীর্বাদ যোগ হয়ে, সঞ্জয়দের বাড়ির আশীর্বাদ কে হারিয়ে দিয়েছে| এরপর যখন দাসীদির মেয়ে খাঁদি আমাদের বাড়িতে কাজ করা শুরু করলো তখনও আমার পরীক্ষার সময় দাসীদিকে আসতে হতো আমার মার আদেশে| দাসীদির আশীর্বাদে স্কুল জীবনটা ভালো ভাবে পেরিয়ে গেল আমার | এরপর শুরু হল হোস্টেল জীবন, দুঃখের বিষয়, সেখানে আমাকে পার করার জন্য কোন দাসীদি ছিল না আর সাধুবাবার ভবিষ্যৎবাণীর আওতা থেকেও আমি বেরিয়ে এসেছি তখন!
No comments:
Post a Comment