দ্বিতীয় বা শেষ পর্ব লিখতে বসে, প্রথমেই মনে হল যে এগুলো পর্ব নয়| এগুলো হল সর্গ - যা কিনা স্বর্গের খুব কাছাকাছি| তাই প্রথম পর্বকে বদলে, প্রথম সর্গ করে দিলাম|
তা ছাড়া, ভেবেছিলাম যে দু একটা ছবি যোগ করব| কিন্তু সে ব্যাপারেও মত পাল্টালাম| প্রথমত, যে স্বর্গ দেখেছি, মোবাইলে তোলা গুটিকতক ছবি সেটাকে তুলে ধরতে পারবে না| সেই আলো, সেই অন্ধকার, জলের শব্দ, পাখির ডাক, সেই নৈশব্দ, বুনো গন্ধ, লোকজনের জঙ্গলের প্রতি ভালোবাসা - যদি পারি, তো সেটা খানিকটা লিখেই বোঝাতে পারব| আর দ্বিতীয়ত, যারা পড়ছেন, তাদের কল্পনার রাশও আমি কয়েকটা ছবি দিয়ে বেঁধে রাখতে চাই না|
এবার শুরু করি এই স্বর্গ রাজ্যের দ্বিতীয় অধ্যায়|
পরেরদিন ভোরের রুটিনটা একই রকম| সকাল সকালে ওঠা, হাত মুখ ধুয়ে চা খেয়ে তৈরি হয়ে নেওয়া| আজ আমাদের সঙ্গে চলেছে ভূপি আর আশীস| ভেলা পেরিয়ে একই রাস্তা ধরে সেই এম্ফিথিয়েটার এর মত জায়গাটা অবধি পৌঁছলাম| আজ যেন পাখির সংখ্যা অনেক বেশী| কোথাও থেকে হর্ণবিলের ডাক আসছে| দুটো ফিঙ্গে লাফালাফি করছে| এক ঝাঁক বুলবুল আসতে, তারা সরে পড়ল|
আশিস বলল-আজ এখান থেকেই জঙ্গলের ভেতরে ঢোকা যাক| রাস্তাটা ওপর দিকে চলে গেছে, ক্রমশ নদীর থেকে দূরে| ওর জানা রাস্তায় এক চক্কর ঘুরে আসতে ঘন্টা তিনেক লাগবে| কিন্তু না, আজ আর ঘোরাঘুরি নয়| আমরা ঠিক করলাম আজ এক জায়গায় বসে জঙ্গলটা উপভোগ করব| সামনে কিছু বড় বড় গাছ| অনেক নিচে রামগঙ্গা বয়ে চলেছে, যদিও গাছ থাকার কারণে পুরোটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না | তবে পাথর ভেঙে জল যাবার আওয়াজ এখান থেকেও পরিষ্কার শোনা যায়| দুপাশে আর পেছনে ঘন জঙ্গল - পায়ে চলা একটা আবছা পথ পেছন দিকে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে | তবে প্রায় পঞ্চাশ মিটার পর্যন্ত গাছের ঘনত্ব অতো বেশী নয়| হঠাৎ কোনো জন্তু জানোয়ার এলে দেখতে পাব| দুটো হরিণ এইমাত্র আমাদের দেখতে পেয়ে নিচের দিকে নেমে গেল| কোথা থেকে কিচমিচ করতে করতে উজ্জ্বল কমলা রঙের গাদাখানেক পাখি সামনের গাছটায় এসে বসল| এদের নাম নাকি মিনিভেট| চমৎকার দেখতে| মাঝে একদল প্লাম হেডেড প্যারাকীট উড়ে গেল| পেছনের জঙ্গল থেকে অনেক্ষণ একটা ঠক ঠক করে শব্দ হচ্ছিল - এবার কাঠঠোকরাটাকে দেখতে পেলাম| গাছপালার একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে| তার সঙ্গে কেমন যেন একটা কাঠ জ্বলার গন্ধ - হয়তো কোথাও গাছে আগুন লেগেছে আর হাওয়ায় সেই গন্ধ ভেসে আসছে| এসব গন্ধ একাকার হয়ে কেমন যেন মনকে বোঝাতে লাগলো এবার ক্ষিধে পেয়েছে| লুচি আলুর তরকারি বেরিয়ে এল| বেরল বেশ কিছু ডিমসেদ্ধ| তারপর ফল| সবশেষে ফ্লাস্ক থেকে চায় গরম|
মাঝে মধ্যেই আশপাশটা আর পেছনের জঙ্গলটা খেয়াল রেখে চলেছি| কোন অনাহুত অতিথী না এসে পড়ে| বাঁদরের দল এলে আর দেখতে হবে না! আশীস তার গল্পের ঝুলি খুলে বসেছে ------
"বছর পাঁচেক আগের কথা| রিসর্টএ তখনও ভালোমত বেড়া দেওয়া ছিল না| একটা বাঘ ঢুকে এসেছিল| আমরা দু-তিন জন কাছাকাছি ছিলাম| চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি - একদম নড়ছি না| বাঘটা একটা চাপা ঘড় ঘড় আওয়াজ করছে| তারপর আচমকা সামনের দিকে দু চার পা দৌড়ে এল| তারপর আবার পেছিয়ে গেল| এরকম চলল দু তিন বার| তারপর পেছন ফিরে হাঁটা দিল| হয়তো মিনিট পাঁচেক ছিল, আমাদের মনে হচ্ছিল কয়েক ঘণ্টা|----"
"মাঝরাত্রে হাতি এসে যেত তখন| আমরা যে যা পেতাম - মায় হাতা খুন্তি পর্যন্ত - তাই দিয়ে আওয়াজ করতাম, চেঁচাতম, দরজা পেটাতাম| কোনদিন কাউকে অ্যাটাক করে নি---"
"গত বছর এক সাহেব কে নিয়ে ঠিক এইখানটায় এসেছিলাম| সাহেবের খুব ফটো তোলার শখ| দেখি দূরে ওই দিকে একটা হাতি কখন এসে দাঁড়িয়েছে| সাহেব তো খুব খুশী| ফটো তুলছে| হঠাৎ এদিক ফিরে দেখি, এদিকেও হাতি - একদল| প্রথমটা আমাদের দেখতে পায় নি - দৃষ্টি শক্তি জোরালো নয় যে| তারপর জানি না কি হল, শুঁড় তুলে তুলে খুব গন্ধ নিল| হঠাৎ একটা হাতি প্রচন্ড চিৎকার করে উঠল| তারপরই প্রায় পুরো দলটা আমাদের তেড়ে এল| এই সামনের খাড়া ঢাল বেয়ে আমরা নামার চেষ্টা করলাম| সাহেবকে বললাম কোনো শব্দ না করে স্রেফ আমার সঙ্গে লেগে থাকতে| ধারালো পাথরে ঘষা লেগে সাহেবের জিন্স ছিঁড়ে গেল| গাছের ডাল ধরে নামতে গিয়ে হাত পা ছড়ে গেল| বহু কষ্টে দুজন বেঁচে গেছিলাম সেদিন| কিন্তু ধন্য বটে সাহেব| কোনো বিকার নেই| ওই খাড়াই বেয়ে নামতে নামতেও ছবি তুলে চলেছিল|"
ভাস্বতী জিজ্ঞেস করল "ঠিক এইখানটায়?"
-"একদম এইখানে"
-"তাহলে আমরা এখন এখান থেকে একটু অন্য কোথাও গিয়ে বসি না কেন ?"
তাই হল| আমরা আবার খানিকটা নিচে নেমে এসে বসলাম| এবার নদীটা আবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে - বহুদূর পর্যন্ত| সেই যেখানে পাহাড়ের ফাঁকে বাঁক নিয়ে সে করবেট পার্কের একদম ভেতরে ঢুকে গেছে|
আবার শুনি হর্ণবিলের ডাক| এরপর যা দেখলাম ভাষায় বোঝাতে পারব না| দুটো গ্রেট হর্ণবিল যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে আমাদের সামনে দিয়ে নদী পেরিয়ে চলে গেল| এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তাদের সৌন্দর্য দেখে, যে আমরা কেউ ক্যামেরা পর্যন্ত তুলি নি| বিশাল ডানা মেলে হলদে কালো দুটো কনকর্ড এরোপ্লেন যেন সামনের পর্দার ওপর দিয়ে স্লো মোশনএ চলে গেল - শুধু শব্দটা ছিল না - যেন সাইলেন্ট মুভি| হর্ণবিল অনেক দেখেছি, কিন্তু গ্রেট হর্ণবিল সম্ভবত জীবনে এই দ্বিতীয়বার দেখলাম|
এই দৃশ্য দেখার পর এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু দেখার আশা করি না| তাই ফেরার পথ ধরলাম| বারবেট এর ডাক সমানে শোনা যাচ্ছে| ভূপি চিনিয়ে দিল অন্য একটা বারবেটএর ডাক - যার নাম কপারস্মিথ বারবেট - যেন স্যকরার ঠুক-ঠাক আওয়াজ | ভারী চমৎকার দেখতে - লাল, সবুজ আর হলুদের মাখামাখি||
পেছন থেকে করা যেন গল্প করতে করতে আসছে| দেখি কালকের সেই ছেলেগুলো|
-"কি হে? এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ঘোরা হয়ে গেল? বাড়ির খবর সব ভালো তো?"
-"আর বলবেন না স্যার| কাল সারা রাত ঘুমোতে পারি নি কেউ|"
-"কেন?"
-"সমস্ত রাত গ্রামের আশেপাশে একটা বাঘ ঘুরে বেড়িয়েছে | কোনো একটা গরু তোলার তালে ছিল| কিন্তু আমরা সতর্ক থাকায় সুবিধে করতে পারে নি | তাই মাঝে মধ্যেই গরগরিয়ে রাগ দেখিয়ে গেছে| খুব ভয়ে ভয়ে রাতটা কাটিয়েছি|"
গল্প করতে করতে পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে থাকি| পাথর সাজিয়ে একটু সিঁড়ির মত করার চেষ্টা হয়েছিল কখনো| হাতির দল এসে পথরগুলোকে নিজেদের খুশিমত সাজিয়ে দিয়ে গেছে| ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে এই রাস্তাটা একটু ঠিক করতে হবে, নইলে কোনো শহুরে ট্যুরিস্ট কোনদিন পা মচকে পড়ে থাকবে|
আমরা আবার নদীর পাশে| আমি, ভাস্বতী আর ভূপি ভেলায় উঠে পড়ি| মাঝ নদীতে দেখি একটা পিয়েড কিংফিশার| এই মাছরাঙ্গার সেই উজ্জ্বল নীল রঙ নেই - নেহাতই সাদা-কালো| কিন্তু একটা অদ্ভুত ক্ষমতা হল ফড়িং এর মত শূণ্যে এক -ই জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারে - ডানা ঝাপটানোর এক অসাধারণ কৌশল| সান বার্ড এর মধ্যেও এই ক্ষমতা দেখেছি| আর ভিডিও তে দেখেছি হামিং বার্ড কে এরকম ভাবে উড়তে | জলের প্রায় দশ পনেরো ফিট ওপরে ভাসছিল পাখিটা| হঠাৎ ডানা মুড়ে জলের ওপর টুপ করে খসে পড়ল| তারপর সেই ফেনিল জলরাশির থেকে একটা খাবি খাওয়া রোদ ঝলমলে মাছ মুখে করে নিয়ে বোধহয় বাড়ির দিকে উড়ে পালাল| ওই মাছটার আত্মীয় স্বজনের হাহাকার আমরা শুনতে পেলাম না - এমনিতেই জলের যা শব্দ !
রিসর্ট এ ফিরে এসেছি| এক কাপ করে চা খাওয়া যাক এবার| ভূপি গল্প করে চলেছে|
"এতদিন আছি, কিন্তু বাঘ দেখি নি কখনো| তবে একবার একটা লেপর্ড দেখেছিলাম| নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ওপারের পাহাড়ের ওপর একটা ঘুরাল কে নজর রাখছিলাম| হঠাৎ দেখি ঘুরালটার থেকে প্রায় শ-খানেক মিটার দূরে চুপিসাড়ে এগোচ্ছে লেপর্ডটা| যতটা সম্ভব মাটির সঙ্গে মিশে আছে| আগাছা আর ঝোপ এর আড়াল তো আছেই| ঘুরালটা ঘাস পাতা চিবোতে ব্যস্ত| আমি দৌড়েছি আমার ঘরের দিকে, ক্যামেরা টা নিতে| মিনিট দেড়েক বাদে ফিরে দেখি ঘুরাল বা লেপর্ড কেউ নেই| আশিস -ও ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল| ও বলল শেষ মূহুর্তে বুঝতে পেরে ঘুরালটা একটা কঠিন চড়াই ধরে উঠে পালিয়েছে|"
খেয়াল করি নি কখন আমরা চা শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে এসে গেছি| ঠিক সেইখানটায় - যেখানে "জলের থেকে মাছ বেশী"| সত্যি বটে| একদম থিক থিক করছে| ওরা যে কিভাবে নড়া চড়ার জায়গা পাচ্ছে কে জানে!
কিছুক্ষণ মাছ দেখে, আবার চলি নদীর সেই অংশটায় - যেখানে কাল স্নান করেছি| আজ শীতটা একটু কম লাগছে| ফলে বেশ খানিক্ষণ জলে ডুবে বসে থাকা গেল| বসে বসে আশেপাশের পাহাড়গুলোর ওপর নজর রাখা আর জলের শব্দ শোনা| নাম না জানা আরও কিছু পাখির ডাক শোনা| এই করতে করতে দুপুর গড়িয়ে গেল| অনিচ্ছা সত্বেও আমরাও রিসর্ট এ ফিরলাম| তারপর পেট পুরে ভাত ডাল তরকারি মাংস আর মিষ্টি খাওয়া গেল|
ঘোষবাবুর এবার বিদায় নেবার পালা| উনি দেখি মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত| কাছে যেতে, আমাদেরও দেখালেন - একটা প্রকাণ্ড সাইজের বাঘ একটা গরুকে আক্রমণ করেছে| ছবিটা রামনগর শহরের কাছাকাছি কোথাও তোলা - কারণ দূরে শহরের বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে|
-"আমার এক পরিচিত এটা এইমাত্র পাঠিয়েছে| বাঘটার সাইজ টা খেয়াল করেছেন? গরুটাকে প্রায় ঢেকে দিয়েছে| আর সেটাও শহরের এত কাছে| ভাবলেই ভয় করবে|"
ছবিটা আমরা সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকি| আশ মিটলে ঘোষবাবুকে ছাড়ি| ওনাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি সবাই মিলে | গেটের পাশেই ওদের ছোট্ট গিফট শপ| একবার ঢুঁ মেরে নিই চট করে| আর পাঁচটা গিফট সপের মতই| গ্রামের লোকেদের হাতে তৈরি কিছু কিছু জিনিসও আছে বটে| একটা গরুর গলার ঘণ্টা কিনি - বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখলে, হাওয়ায় দুলে দুলে বেশ একটা গ্রাম্য আওয়াজ করবে|
খুব ক্লান্ত লাগছে আজ| যাই, ঘণ্টা খানেক ঘুমিয়ে নিই|
দুপুরে ঘুম হল না| অবশ্য খানিকটা বিশ্রাম অবশ্যই হল| পাঁচটা নগদ আশিস কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম| আজ একটু সাহস বেশী - তাই পশ্চিম দিকের গেটটা দিয়েই বেরোলম| ওদিক দিয়েও নদীর ধারে আসা যায় - খানিকটা বেশী হাঁটতে হল, এই যা| জায়গাটা খুব ঘন ঝোপ ঝাড়ে ভর্তি| তার মাঝে আশিস না জানি কিসের শব্দ শুনেছে - অনেক্ষণ একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল| শেষমেষ ঝোপ থেকে একটা বারকিং ডিয়ার বেরিয়ে এসে, আমাদের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করে দৌড় মারল| এদিকটায় ময়ূর অনেক| আধ ঘন্টার মধ্যেই আমরা নদীর ধারে এসে গেছি| নদীর ওপারে একটা বিশাল নাম না জানা গাছের ডালে একটা ঈগল বসে আছে| হঠাৎই সেটা জলে ঝাঁপ মারল| তারপর মুখে করে একটা মাছ নিয়ে গিয়ে আবার গাছের ডাল এ বসল| বেশ খানিক্ষণ তার মাছ খাওয়া দেখতেই কেটে গেল| সূর্য কখন চলে গেছে পাহাড়ের পেছনে| শিরশিরে হাওয়া জানান দিচ্ছে যে এবারে রিসর্টএর বাইরে আর নয়|
আজ সন্ধের দিকে খুব হাওয়া দিচ্ছিল| যত অন্ধকার হচ্ছে, হাওয়া কমে আসছে কিন্তু আকাশটা ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে| চাওলা সাহেবের আজ মন্দা - টেলিস্কোপ এ মেঘ ছাড়া কিছুই ধরা পড়বে না| চা খেতে খেতে আলোচনা করছি যে আজ রাতটা কি করা যায়| ভূপি র বক্তব্য "মাচানে বসে কাটিয়ে দিন"|
তাই বসলাম খানিক্ষণ| বেশ কিছু চিতল জল খেতে এসেছিল| দুটো বুনো শুওর ও ঘুরে গেল| তারপর সব চুপচাপ| দু এক ফোঁটা বৃষ্টি হল| জঙ্গল আজ সাংঘাতিক রকম নিশ্চুপ | মেঘের জন্য চাঁদের আলোটুকু ও আজ নেই| তাড়াতাড়ি ডিনার করলাম আজ| ডিনার এর সময় সজারুগুলো একবার দর্শন দিয়ে গেল| তারপর ঘণ্টা দু তিন স্রেফ অন্ধকারে বসে বসে ভূপি আর চাওলাজীর গল্প শোনা| কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না সেই জমাট অন্ধকারে| ভূপি চাপা স্বরে বলে চলেছে বনঘাটের ইতিহাস| মাঝে মধ্যে চাওলাজী যোগ করছেন ওনার কোনো অভিজ্ঞতা|
-"বছর তিনেক আগে এই রকম -ই এক মেঘলা রাতে আমি ভীমতাল থেকে কালাধুঙ্গী আসছি, রাত প্রায় নটা,-------"
আমরা কান খাড়া করে রোমঞ্চের আস্বাদ নিচ্ছি| মনের ক্যামেরায় যেন চাওলাজীর গাড়ির হেডলাইটটা দেখতে পাচ্ছি| হঠাৎ মাচানের দিক থেকে একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ| তড়িঘড়ি উঠে বসি - আরে, এ তো সকাল হয়ে গেছে| রাত্রে কখন যে ঘরে এসে শুয়ে পড়েছি, মনেই নেই|
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
আজ আমাদের ফেরার দিন| সকাল সকাল বেরোলে, সকাল সকাল বাড়ি পৌঁছাব| সঙ্গে বিশেষ জিনিসপত্র নেই, তাই গুছিয়ে নিতে সময় লাগলো না| এক কাপ চা খেয়ে বাকি পয়সাকড়ি মিটিয়ে দিয়ে ঘরে এসে স্নান করে তৈরি হয়ে নিলাম| সকাল আটটা বাজে| আকাশে এখনো মেঘ| ভূপি আমাদের ভেলায় তুলে দিয়ে গেল| বালুলি ব্রিজের কাছে এসে দেখি গাড়ি ঠিক ঠাক আছে - কোনো জন্তু জানোয়ার উপদ্রব করে নি|মেন রোডে গাড়ি ওঠাতে মিনিট দশেক লাগলো| তারপর রাস্তা উঠে গেছে ওপরের দিকে আর রামগঙ্গা নদী আরো নীচে বহুদূরে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে|
বেলা এখন দশটা| আমরা করবেটের ধনগড়ি গেট -এর কাছকাছি একটা গ্রাম-এ| রাস্তার ধারে এক মা-মেয়ে একটা দোকান চালায় | ম্যাগী অর্ডার করে বসে আছি| আজ মেয়েটা একাই দোকান সমলাচ্ছে - মা হয়তো কোথাও গেছে| ওর নাম সুমন রাওয়াত - কলেজ এর ফার্স্ট ইয়ার এ পড়ে| আজ কলেজ ছুটি| ওর নাম মনে রেখেছি দেখে ও খুব খুশি| ওদের বাগানে গরমকালে খুব আম আর কাঁঠাল হয়| আমের বোল আসতে শুরু করেছে অল্প স্বল্প| কোত্থেকে একদল হর্ণবিল হই চৈ করতে করতে এসে আমগাছের ওপর বসল| সুমন এর কোনো বিকার নেই - এসব ওরা রোজই দেখে|
আর কয়েক ঘণ্টা পরে আমাদের গাড়ি তীর বেগে ছুটে চলবে মোরদাবাদ বাইপাসের দিকে | পেরিয়ে যাবো কাশীপুরের জ্যাম, পেরিয়ে যাবো চূড়ামনির হেমপুর| হয়তো সাগর রত্না রেষ্টুরেন্টে খেতে ঢুকবো| সেই রমরমা আর নেই কোভিডের কারণে| কেমন একটা মনমরা ভাব|
কিন্তু এখানে সুমন এক মনে ম্যাগী, অমলেট আর চা বানিয়ে চলবে| ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া আসবে কোশী নদীর দিক থেকে| হর্ণবিল গুলো উড়ে চলে যাবে - যেদিকে ওদের যেতে ইচ্ছে হবে|
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
No comments:
Post a Comment