ভ্রমণ কাহিনী পড়ে আমি তেমন মজা পাই না| খুব কম ভ্রমণ কাহিনীই আমার মন কেড়েছে| তাই লেখার কথাও চিন্তা করিনি কখনো| ভ্রমণ কাহিনী হবে এমন, যেন পাঠক পড়তে পড়তে মনে মনে সেখানে পৌঁছে যান | যেমনটি বর্ণনা দিতেন বিভূতিভূষণ| আর ভ্রমণ কাহিনী কেমন হবে না? যদ্দুর মনে পড়ছে, ফেলুদা বলেছিল "ভ্রমণ কাহিনী যেন ট্রাভেল গাইড না হয়ে যায়|" আমারও সেই ভয়| তাই আমি লিখি নি বিশেষ| আমার এক পরিচিতজন একটি সাইট চালায় - ghumakkar.com| আমি একবার কোন এক অপরূপ দেশে গিয়েছিলাম যেখানকার কাহিনী নিয়ে হয়তো তখন অবধি কেউ লেখে নি তার সাইটে| আমাকে খুব জোর করেছিল লেখার জন্যে - সে লেখাও হয়ে ওঠে নি| যদিও খুব চমত্কার ঘুরেছিলাম
সেবার বনঘাট ঘুরে আসার পর কাউকে দু লাইন বর্ণনা দিয়েছিলাম - সেও ইংরাজিতে - সে বলল, লেখাটা পড়ে তার নাকি মনে হয়েছে যে সে রামগঙ্গা নদীর সামনের পাহাড়টায় দাঁড়িয়ে আছে| তাই শুনে ভাবলাম, একবার চেষ্টা করেই দেখি না! আর মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য আমার ভাষা হল বাংলা - তাই এই প্রচেষ্টাও মাতৃভাষাতেই| যদিও আজকাল আমার বাংলায় আকছার ইংরাজী আর হিন্দি ঢুকে পড়ছে| প্রবাসে থাকার ফল হয়তো|
যাই হোক, আসুন বনঘাট যাওয়া যাক| নাম শোনেন নি তো? ভালোই হল - কল্পনার রঙ মেশাতে সুবিধে হবে| যেমন ধরুন কেদারনাথ অতি সুন্দর জায়গা - কিন্তু সেখানে তো গাদাগাদা লোক গেছে| কত লেখা লেখি| আমি আর নতুন কি দেব? তারচেয়ে যাই একদম আনকোরা একটা জায়গায় - যেখানে প্রতি পদক্ষেপেই নতুন কিছুর আকাঙ্খা .....
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
গজরোলা থেকে রওনা হতে হতে প্রায় সোয়া-নটা বাজলো| বিশেষ দেরি হয় নি| প্ল্যান অনুযায়ী নটার সময় বেরোনোর কথা| কিন্তু করোনার কারণে (নাকি করোনার করুণায়?) বিকানীরওয়ালার দোকানে একদম ভীড় ছিল না| তাই বেশ তাড়াতাড়িই ব্রেকফাস্ট হয়ে গেল - গাবদা গোবদা স্যান্ডউইচ একটা করে|| আড়াই মাস আগেও এ রাস্তায় একবার এসেছি - রানিক্ষেতের দিকে যাচ্ছিলাম| কিন্তু সেদিন -ও বোধহয় এর চেয়ে বেশী ভীড় ছিল| আজ শুক্রবার বলেই কি এত ফাঁকা? রাস্তাও তো বেশ খালি ই ছিল| নয়ডা ছাড়ার পর, দেড় ঘণ্টায় প্রায় একশো কিলোমিটার চলে এসেছি| ভেবেছিলাম ছটা নাগাদ বাড়ি থেকে রওনা হব - কিন্তু সেই পৌনে সাতটা হয়ে গেল| এখনো সূর্যোদয় দেরিতে হচ্ছে - ছটার সময় অন্ধকার|
এবার ভাস্বতীর ড্রাইভ করার পালা| মোরাদাবাদ বাইপাসের কাছে রাস্তা বন্ধ দেখাচ্ছে গুগল| আমরোহা থেকে কি তাহলে শর্টকাট নেব? কিন্তু সে রাস্তা কেমন কে জানে? একবার এদিকেই কালাধুঙ্গী যাবার সময় একটা শর্টকাট নিতে গিয়ে এক ভয়ঙ্কর খারাপ রাস্তায় পড়েছিলাম| রাস্তার ধারে দাঁড়াই| এক দাড়িওয়ালা মুসলিম চাচা দোকানে বসেছিলেন| পাশের অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তাটা দিয়ে কাশীপুর যাওয়া যাবে কিনা জিজ্ঞেস করতে সোজাসুজি বারণ করে দিলেন - "হাই ওয়ে সে যাও বেটা, রাস্তা খোল দিয়া হ্যায়" |
দেখতে দেখতে মোরাদাবাদ বাইপাস পেরিয়ে গেল - এই রাস্তাটা বরাবরই আমার ভাল লাগে| ভালো রাস্তা, ফাঁকা রাস্তা এবং দুপাশে যতদূর দেখা যায়, সবুজ ক্ষেত| তবে এই রাস্তাটা ছাড়ার পর প্রায় দশ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ| বড় বড় গর্ত বাঁচিয়ে চলতে হয়| কিন্তু তারপরেই কাশীপুর যাবার নতুন স্টেট হাইওয়ে| সরু হলেও - এবড়ো খেবড়ো নয় , সুন্দর রাস্তা| আবার দুপাশে সবুজের সমারোহ| মাঝে একটা চিনির ফ্যাক্টরী| ট্রাক্টর ভরে ভরে আখ চলেছে সেই ফ্যাক্টরীর দিকে| ট্রাক্টরের পেছনে ট্রেলারে ঠেসে ঠুসে প্রচুর আখ লাদাই করেছে| একজন ট্রাক্টরওয়ালা সেই আখ দিয়ে আমাদের গাড়ির গা-টা একটু চুলকে দিয়ে গেল| দেখতে দেখতে কাশীপুর| জানতাম যে ওখানে ফ্লাইওভার এর কাজ চলছে, রাস্তা খারাপ| ভাস্বতীর ছোট গাড়ি চালানোর অভ্যেস| বললাম আমায় গাড়ি দিতে| কিন্তু ও নারাজ| গাড়ি চালাতে কারো কারো সম্ভবত একটু বেশিই ভালো লাগে| আমার কিন্তু ড্রাইভারের পাশের সীটটাই পছন্দ - বেশ দুদিক দেখতে দেখতে যাওয়া যায়| যা ভয় পেয়েছিলাম, তাই - এক জায়গায় রাস্তা বন্ধ| সমস্ত গাড়িকে পাশের একটা অতি সরু গলি দিয়ে যেতে হচ্ছে| ভাস্বতীর রোখ চেপে গেছে - শেষমেষ সেই রাস্তাও পেরিয়ে গেল| আর কিছুক্ষণ পরেই রামনগর - যা ছাড়ালেই পৌঁছে যাবো গাছ গাছালির স্বর্গরাজ্যে| এতবার এসেছি, তবু আমার আশ মেটে না এদিকে আসার|
এবার একটু চা খাওয়া যাক| এক সর্দারজীর দোকানে দাঁড়ালাম| এটা বোধ হয় উধম সিং নগর জেলা| সর্দারজীকে জিজ্ঞেস করলাম "এদিকে এত সর্দারের বাস কেন ?" উনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন "ভারতের কোনদিকে সর্দার থাকে না?" একটা বছর দশেকের মেয়ে এক প্যাকেট চিপস কিনে নিয়ে গেল| দেখি রাস্তার ধারে ওর পোষা ছাগলটা বাঁধা রয়েছে - মেয়েটা তার সঙ্গে চিপস ভাগ করে খাচ্ছে| কিছুদিন আগে একটা ভিডিও দেখেছিলাম, গরুতে ফুচকা খাচ্ছিলো| তাই ছাগলের চিপস খাওয়া তেমন আশ্চর্য করতে পারলো না| তাছাড়া , বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অবাক হবার ক্ষমতটাও যেন অনেকটা কমে যায়|
আবার চলা| রামনগরের পর একটু পাহাড়ী রাস্তাও পড়বে - আর পাহাড়ে গাড়ি আমার হাতে| ওই যে দূরে ঝাপসা শ্লেট রঙের পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে| গাড়ির জানলার কাঁচ নামিয়ে দিই - ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়ায় আমেজ আসে| রামনগরে গাড়িতে তেল ভরে ঢুকে পড়লাম করবেটের পাড়ায়| বাঁদিকে রিজার্ভ ফরেস্ট আর ডানদিকে একের পর এক রিসর্ট| রিসর্ট গুলোর পেছন দিয়ে বয়ে যাচ্ছে কোশী নদী| এখন শুকনো| পাথরের মধ্যে দিয়ে সামান্য জল| অথচ একবার বর্ষাকালে এই নদীরই কি সাংঘাতিক রূপ দেখেছিলাম! কমাস আগেই কৌসানি থেকে ফেরার পথে কোশী নদীর ওপরের অংশটা দেখেছি| সে ছিল আরো পাথুরে| সামান্য তিরতিরে জল|
আমডান্ডা গেট, গর্জিয়া মন্দির ছাড়িয়ে ধনগড়ি গেট পেরনোর পর আশে পাশে টুরিস্টদের গাড়ির সংখ্যা কমে এল| মোহন-এ রাস্তা দু ভাগ হয়ে যাবে| ডানদিকের রাস্তা যাবে ভাতরোঞ্জখান হয়ে রানিক্ষেত| আর আমাদের রাস্তা বাঁদিকে মরছুলা গ্রামের দিকে| এই সেই বিখ্যাত মোহন - যেখানকার মানুষখেকো বাঘের গল্প আমাদের অনেককেই শিহরিত করেছে - বিশেষ করে যারা জিম করবেটের ভক্ত, তাদের | মোহনেও এখন দু একটা দোকানপাট আর রিসর্ট গজিয়ে উঠেছে - বছর দশেক আগেও প্রায় কিছুই ছিল না| একটা দোকানে গিয়ে বসি| লাঞ্চ আজ এখানেই হবে| দুই ভাই দোকান চালাচ্ছে| কোন কারণে দুজনের -ই কথা অত্যন্ত জড়ানো| জন্মগত কোনো রোগ| সোজা হয়ে দাঁড়াতেও অসুবিধা হচ্ছে| আকারে ইঙ্গিতে কথা হল| এদের দেখলে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়| তবুও কত মানুষ অসুখী| তারা তাকিয়ে আছে তাদের চেয়ে বেশী পেয়েছে যারা - তাদের দিকে| পরোটা খেলাম| তেমন ভালো হয় নি কিন্তু গরম গরম - কাজ চলে গেল|
ইতিমধ্যে বনঘাট থেকে ফোন এসে গেছে - "আমরা সলুনার কাছে ব্রিজের সামনে অপেক্ষা করছি| কখন পৌঁছবেন? লাঞ্চ করবেন তো?" ছেলেটি ওখানকার ম্যানেজার - নাম ভূপি| বলি "আর মিনিট চল্লিশ| লাঞ্চ করে নিয়েছি|" মোহনের পর রাস্তা খুব আঁকাবাঁকা, পাহাড়ী| একটু সাবধানে চালাই| এদিকের জঙ্গল আরো ঘন| গর্জিয়া পর্যন্ত প্রচুর আম কাঁঠালের গাছ ছিল, ওদিকটায় পাখিও অনেক| এদিকে চারপেয়ে বেশী| বার দুয়েক রাত্রিবেলা এসেছি - বেশ রোমাঞ্চকর| একবার এক ড্রাইভার এখানে লেপর্ড এর চোখ দেখিয়েছিল| ভগবান জানে সত্যি লেপর্ড ছিল, না হরিণ! তবে এ রাস্তায় অনেককেই হাতির সামনে পড়তে শুনেছি|
ওই এসে গেল সলুনা| কতদিন বাদে এলাম| বাবা মা কে নিয়ে প্রথম এসেছিলাম পনের বছর আগে| তখন ছিল একটাই রিসর্ট| না, ভুল বললাম - দুটো রিসর্ট| তার পরেও বার দুয়েক এসেছি| শেষ বোধ হয় দশ বছর আগে| সেবার রাস্তার ধারের জঙ্গলে বিশাল আগুন লেগেছিল| এখন দেখি আরো কিছু রিসর্ট হয়েছে| ইঁট, কাঠ, সিমেন্টের ছড়াছড়ি| একটা রিসর্ট তো বেশ দৃষ্টিকটু লাগলো - নদীর সেই নিরালা ভাবটাকেই নষ্ট করে দিয়েছে||
এবার রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে মাঠের ওপর| তরতরিয়ে ঢাল বেয়ে নিচে নামা| তারপর শুকনো নদীখাত - পাথুরে জমিতে লাফাতে লাফাতে গাড়ি পৌঁছে গেল বালুলি সাস্পেন্শন ব্রিজের পাশে, যেখানে অপেক্ষা করছে ভূপি, আশীস আর আরো দু একজন|
ভূপি আমাদের আশীসের সঙ্গে রওয়ানা করিয়ে দিল| দু কিলোমিটার মতন হাঁটতে হবে| বাকিরা অপেক্ষা করতে লাগলো আরো কোনো অতিথির জন্য| আমাদের সঙ্গে লাগেজ খুবই কম| আশীসের সঙ্গে গল্প করতে করতে সরু পাহাড়ী রাস্তা ধরে চলেছি| ব্রীজ পেরিয়ে বাঁ দিকের রাস্তা| রামগঙ্গা নদী চলেছে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে| ক্রমশ নদী বাঁ দিকে অনেকটা নিচে চলে গেল - অর্থাৎ আমরা অনেকটা ওপরে উঠে গেলাম| দু একটা রিসর্ট গজিয়ে উঠছে এদিকেও| একটা গ্রাম পেরিয়ে আবার রাস্তাটা নিচের দিকে নামতে লাগলো| অনেকক্ষণ থেকে একটা কুকুরবাচ্ছা আমাদের সঙ্গ নিয়েছে| দেখে মনে হল বেশ ক্ষুধার্ত| কুকুরদের প্রতি ভাস্বতীর একটু দুর্বলতা আছে আর সেটা ওরা ঠিক বুঝতে পারে| এই কিছুদিন আগেই কর্ণাটকের এক পাহাড়ে একই দৃশ্য দেখেছি - একটা পাহাড়ের ওপর থেকে পিছু নিয়ে নিচে রাস্তায় দোকানগুলো অবধি একটা কুকুর আমাদের সঙ্গে সেঁটে ছিল| যেন রিটার্ন ফ্রম মহাপ্রস্থান| নিচের দোকান থেকে কিনে ভাস্বতী সেটাকে বিস্কুট খাইয়েছিল| এখানেও যথারীতি ভাস্বতী ব্যাকপ্যাক খুলে কিছু বিস্কুট বার করে কুকুরটাকে খাওয়াল| ভাবলাম এবার ব্যাটা আমাদের সঙ্গ ছাড়বে| কিন্তু সে আমাদের সঙ্গে আটকে রইল| ধুলিময় রাস্তায় চলেছি| ধুলোর ওপর নানান আঁকিবুঁকি বুঝিয়ে দিচ্ছে এই রাস্তায় অনেক জন্তু জানোয়ারের আনাগোনা| একটা টায়ারের দাগও দেখলাম| আশীস বলল খানিকটা রাস্তা জীপেও যাওয়া যায়| আর একটু বেশী খরচ করলে নদীর ধার দিয়ে দিয়েও জীপে করে যাবার ব্যবস্থা আছে| অবশ্য সে অভিজ্ঞতা আমাদের আগে ছিল| ওই পথেই সন্ধের অন্ধকারে জীপে চড়ে নদীর অল্প জলের ওপর দিয়ে পাথরের ওপর ঝাঁকুনি খেতে খেতে এসেছিলাম অনেক দিন আগে|
এসব কথা বলছি - হঠাৎ চোখে পড়ল বেশ বড়সড় একটা পায়ের ছাপ| পাঁচটা আঙ্গুলের টাটকা দাগ বুঝিয়ে দিচ্ছে এই পথে যে বাঘটা গেছে, সে খুব বেশিক্ষণ আগে যায় নি| আশীস বলল যাবার সময় এরকম কোনো দাগ সে দেখে নি| ভাস্বতী বেশ ভয় পেয়ে যায় এসব সময় - কিন্তু আশীস অভয় দিল "আমরা তো আর বাঘের নর্মাল খাদ্য নই"| নর্মালই হই বা এবনর্মাল, আমাদের চলার গতি বেড়ে গেছে| আবার আমরা একদম নদীর ধারে| দেখি একটা ভেলা বাঁধা রয়েছে| অবশ্য এখন যা জল, হেঁটেও পেরিয়ে যাওয়া যায় - খুব বেশী হলে কোমর অবধি হবে | তবে জলের স্রোত ভালোই| ভেলাটা বাঁশের তৈরি| নিচে গাড়ির চাকার দুটো টিউব আটকে রেখেছে| এপার থেকে ওপারে দড়ি বাঁধা| সেই দড়ি টেনেটেনে আশিস আমাদের পার করে দিল| কুকুর বাচ্ছাটা এখান থেকেই ফিরে গেল| যাবার আগে নদীর জল খেল পেট ভরে| বিস্কুট খেয়ে বোধ হয় গলা শুকিয়ে গেছে ওর|
নদী পেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে আবার হাঁটা| এক জায়গায় এসে আশীস বলল এরপর নাকি আর মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না| চটপট মেয়েকে একটা ফোন সেরে এগিয়ে চলি| পরে ভূপি বলেছিল বিএসএনএল এর নেটওয়ার্ক বনঘাটেও পাওয়া যায় কখনো সখনো| আমরা এবার প্রায় গন্তব্যে এসে গেছি| চারিদিকে গাদাগাদা হাতির নাদা| একসপ্তাহ আগেই নাকি একদল হাতি ঘুরে গেছে| ইলেকট্রিক্যাল ফেনসিং দেওয়া একটা অঞ্চলে ঢুকে পড়লাম| পেছন ফিরে দেখি অন্য অতিথিদের নিয়ে ভূপিও জীপ থেকে নামছে| একটা খোলামেলা ডাইনিং এরিয়া| একটু বসি| দেয়ালে জিম করবেটের কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবি|একজন এসে লেবুর শরবত এগিয়ে দিল| ঢকঢক করে দু গ্লাস খেয়ে নিলাম| খাতায় নাম এন্ট্রী করতে হল| তারপর গেলাম আমাদের ঘরে| মাটি আর পাথরের ঘর| মোটা দেয়াল| তিনজনের থাকার মত ব্যবস্থা| মেয়ে হোস্টেলে না থাকলে আসতে পারতো| সেই রকম ই প্ল্যান ছিল গতবছর| কিন্তু করোনা এসে সব প্ল্যান বিগড়ে দিল|
ঘরটা বেশ ঠান্ডা| তার ওপর ফ্যানও আছে| বাথরুমের জলও খুব ঠান্ডা| পরে জেনেছি এদের জলের সাপ্লাই হল নদীর ওপারের একটা ঝর্ণা| খাবার জলও তাই - কোনো ফিল্টার এর ব্যবস্থা নেই | হাত মুখ ধুয়ে বাইরের মোড়াতে গিয়ে বসি| সামনেই একটা পলাশ গাছ ফুলে ফুলে লাল| তার ওপর হৈ চৈ করতে করতে এক ঝাঁক টিয়া এসে বসল| তাদের কারো কারো পুরো মাথাটাই লাল| কারো বা শ্লেট রঙের| পরে জেনেছিলাম এরা হল প্লাম হেডেড প্যারাকীট আর গ্রে হেডেড প্যারাকীট| ফুলের মধ্যে থেকে কিছু একটা ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে | ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ছে মাটিতে| বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে আজ | অনেক ভোরে উঠেছি, তাই আমেজে চোখ জুড়ে আসছে|| ঘরে গিয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ি|
সন্ধের আগেই ঘুম ভাঙল| একটা খোলা জায়গায় চা পাকোড়ার আয়োজন হয়েছে| অন্য অতিথিদের সঙ্গে আলাপ হল| বাবা মা ছেলে আর মেয়ে| তারা দুপুরে ঘুমোয় নি| বিকেলে একটু জঙ্গলে ঘুরতে গেছিল| খুব ময়ূরের ডাক শোনা যাচ্ছে পেছনের পাহাড়টা থেকে| পাখিদের কিচিমিচি বেড়ে গেছে দশগুণ| ওদিকে দেখি একটা মাচান| তারপর বেড়ার বাইরে একটা ওয়াটার হোলের ওপর চোখ পড়ল| এক কাকার এর সঙ্গে চারি চক্ষুর মিলন| কাকার হল বারকিং ডিয়ার| অনেকটা কুকুরের ডাকের মতই ডাক| প্রথম যেবার কাকারের ডাক শুনি, আমি কুকুরের ডাক ভেবে ভুল করেছিলাম| বাঘ বা লেপার্ড দেখলে এরা পুরো জঙ্গল কে সাবধান করতে ওস্তাদ| "আরো এক কাপ চা খাবেন নাকি?" - তাকিয়ে দেখি সুমন্ত ঘোষ হাজির| উনিই এই জঙ্গল রিসর্ট এর মালিক| একদম আধুনিক জিম করবেট| "ওই দেখুন - হোয়াইট ক্রেস্টেড লাফিং থ্রাস - কি অদ্ভুত দেখতে পাখিগুলো না, যেন এই পৃথিবীর নয়? একটু অপেক্ষা করুন, এক্ষুনি সজারুগুলো আসবে|" ঘোষবাবু অনর্গল বলে যেতে থাকেন| "আসুন, কর্নেল চূড়ামনির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই |" দেখি সেই বাবা-মা-ছেলে-মেয়ের দলের দলপতি|
চূড়ামনি মজার লোক| বললেন "বসন্ত বাবু কা সাথ" পরিচয় না ঘটলে এখানে ওনার আসাই হতো না| তারপর সেই 'বসন্ত বাবু'র উদ্দেশ্যে অনেক প্রশংসা বাক্য| কিছু কথার পর উনি আবার বললেন যে ভাগ্যিস "হেমন্ত বাবু কা সাথ" পরিচয় হয়েছিল| নইলে এত সুন্দর জায়গায় ওনাদের আসা অসম্ভব ছিল| এতক্ষণে বুঝি যে উনি 'সুমন্ত' নামটা গুলিয়ে ফেলেছেন| জিজ্ঞেস করলাম "মশাই-এর কোথা থেকে আসা হচ্ছে?"
-"জী, উও জগাহ কা নাম হ্যায় হেমপুর - জাস্ট এবাউট ফিফটি সিক্স কিলোমিটারস ফ্রম হিয়ার|" তারপর উনি হেমপুর এর গুনকীর্তন করতে বসলেন| সে এক অদ্ভুত স্বর্গরাজ্য| বাড়ির পেছন থেকেই শুরু হয়ে গেছে ঘন জঙ্গল| কত রকমের গাছ গাছালি আর পাখি সেই জঙ্গলে| মাঝে কোথাও কোথাও শুকনো নদীখাত| হয়তো বা বালির ওপর দিয়ে তিরতিরে একটু জল| ওখানে ঘোড়া নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বাঘের দর্শনও পেয়েছেন| হাতিও এসেছে কখনো| ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় একটা মিষ্টি গন্ধ লেগে থাকে সেই জঙ্গলে| হালকা রোদ্দুর গায়ে মেখে ঘুরতে ঘুরতে কেমন যেন নেশা ধরে যায়| এতদূর বলে ভদ্রলোক একটা গ্লাসে চুমুক দিলেন| বুঝলাম আপাতত ওনার অন্য একটা নেশা সবে ধরতে শুরু করেছে - অন্ধকারের মধ্যে এতক্ষণ খেয়াল করি নি| কিন্তু উনি জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া নিয়ে করেনটা কি? উত্তরটা ওনার বসন্ত হেমন্ত সুমন্ত বাবুই দিলেন| চূড়ামনি একজন পশু চিকিৎসক - হেমপুরে মিলিটারিদের ঘোড়ার ট্রেনিং হয়, উনি সেখানকার ডাক্তারবাবু| এরপর মোবাইল বেরিয়ে এল আর সেখানে দেখলাম জঙ্গলের মধ্যে গাদা গাদা ঘোড়ার ছবি| নাঃ, চূড়ামনি গুল মারেন নি দেখছি| ভাবলাম বলি, এই মহান্ত বাবুর সঙ্গে পরিচয় না ঘটলে আজ কর্নেল ঘোড়ামনির এই সমস্ত গল্প শুনতে পেতাম না|
হঠাৎ ঘোষবাবু বলে উঠলেন, ওই যে, সজারুগুলো এসে গেছে| সামনের নিচু জমির দিকে ওনার পেছন পেছন আমরা দৌড়ই| কোথায় সজারু? "ওই যে ওই যে" - ঘোষবাবুর চাপা গলা| তারপর উনি আরো উত্তেজিত "আরে এ তো একটা সিভেট - ওটাকে দেখেই সজারুগুলো পালিয়েছে|" সিভেট বাবাজিও ততক্ষণে আমাদের দেখে পালিয়েছেন - শুধু দেখলাম অন্ধকারের মধ্যে কিছু একটা ছুটে গেল আর তার পেছন পেছন ঘোষবাবুর জোরালো টর্চের আলোটা তাড়া করল |
আবার ফিরে এলাম আমাদের চা খাবার জায়গায়|চূড়ামনির নেশা তখন চুড়ার কাছাকাছি| সমানে কথা বলে যাচ্ছেন "আই অ্যাম চূড়ামনি সুব্রমনি অরিজিনালি ফ্রম মথুরা"|
-"বলেন কি মশাই? আপনার কথা শুনে তো দক্ষিণ ভারতীয় বলে বোঝাই যায় না|"
চূড়ামনি হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে আরো একটা চুমুক দিলেন| এবার ওনার ছেলে অমিত মুখ খুলল "ওটা বাবার একটা জোক - বাবার নামে কোথাও সুব্রমনি নেই|" চূড়ামনি হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়েন - "হেঃ হেঃ হেঃ, আই অ্যাম ফ্রম মথুরা, নট ম্যাড্রাস |"
হঠাৎ একটা বারকিং ডিয়ারের ডাক শুনে সবাই চুপ করে যাই| পেছনের পাহাড়টা থেকে ডাকটা এসেছে| একটু পরেই আবার| ঘোষবাবু বোঝান "ওটা কোনো বাঘ বা লেপার্ড দেখে থাকবে|" এইবার চূড়ামনির মেয়ে মুখ খোলে - "যখন আমি স্কুল এ পড়তে হেমপুর এ থাকতাম, বাড়ির পেছনের রাস্তায় ভাই এর সঙ্গে খুব সাইকেল চালাতাম - একদিন একটা লেপার্ডকে ওখান দিয়ে যেতে দেখার পর থেকে আমাদের ওদিকটায় সাইকেল চালানোই বন্ধ হয়ে গেল|"
-"বল কি? বাড়ির পেছনে লেপার্ড?"
এবার অমিত জবাব দেয় "ওদিকে একটা স্লটার হাউস ছিল - পরে জেনেছিলাম, সেখানে কখনো সখনো লেপার্ড চলে আসে|"
"ডিনার ইস রেডি" - ভূপি এসে খবর দেয়|
"এতো তাড়াতাড়ি? না ভাই ভূপি| তুমিও এসে বসো, একটু আরো গল্প-গুজব হোক|" ভূপিও দেখি গল্প করতে ওস্তাদ আর ঘোষবাবুর মতই জঙ্গল ভালোবাসে| বলল ওর বাড়ি কুলুতে| এক ছোট ভাই আছে| দিদির বিয়ে হয়ে গেছে| ট্যুরিসম নিয়ে পড়াশোনা করে দিল্লিতে চাকরি করত| কিন্তু দিল্লিতে ও হাঁপিয়ে উঠেছিল| বনঘাটে এসে দারুন খুশি|
ওদিকে শুনি চূড়ামনি ঘোষবাবুকে বোঝাচ্ছেন "কাছের কোনো বাজারে আপনার লোক পাঠিয়ে দেবেন| ওদের পচা শাক সবজি যেগুলো ফেলে দেয়, নিয়ে চলে আসবে| তারপর আপনার ওই কাঁটা তারের বেড়ার ঠিক বাইরে পুঁতে দেবেন| দেখবেন কত রকমের জন্তু জানোয়ার ভীড় করবে|"
আইডিয়াটা আমার মোটেই ভালো লাগলো না| কিন্তু চূড়ামনি এখন রঙিন, তাই আর ঘাঁটালাম না| ভূপির সঙ্গেই লেগে রইলাম| লক্ষ করলাম, ভূপি যদিও আমাদের সঙ্গে কথা বলছে, ওর কানগুলো যেন জঙ্গলের দিকে খাড়া| কোথাও কোনো একটু আওয়াজ হলেই চুপ করে শুনছে|
"চলুন, খেয়ে নি| কাল ভোরবেলা আবার জঙ্গলে ঘুরতে যাবো|" ঘোষবাবুর কথা যুক্তিসঙ্গত|
ডাইনিং এরিয়া তে গিয়ে দেখি বেশ কিছু মোমবাতি জ্বলছে| বাইরে রাস্তার ধারে দু একটা লন্ঠন| ঘোষবাবু বললেন "ঘরগুলো ছাড়া আর কোথাও ইলেকট্রিক লাইট রাখি নি - বেশ একটা রোমাঞ্চকর ভাব থাকে|"
ঠিক কথা| রাস্তার ওপর কোথাও থেকে একটা সাপ যদি চলে আসে এই ভেবে খুব রোমাঞ্চ হচ্ছিল|
খাবার দাবার বেশ ভালো দেখলাম| ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি, মাংস, মিষ্টি - চমৎকার রান্না| "কে রেঁধেছে ভাই?" - ভাস্বতীর প্রশ্ন|
"আমাদের হেড কুক হল হরীশ" - ভূপি উত্তর দেয়|
"আপনাদের এখানে তো শুনি নদীতে প্রচুর মাছ - আপনারা ধরেন না?"
ঘোষবাবু বোঝান "মাছ ধরার পারমিট লাগে এখানে| তবে হ্যাঁ, মাছ প্রচুর| আমি নিজেই ২৫ কিলোর মাশীর ধরেছি| আপনারা কাল সকালে নদীর এদিকটায় গিয়ে দেখবেন - মনে হবে জলের চেয়ে মাছ বেশী|"
"আর জল এতো পরিষ্কার আপনাকে কি বলব" এবার ভূপি খেই ধরে, "একবার আমি একটা ছোট ড্রোন উড়িয়েছিলাম - অনেক উঁচু থেকে জলের ছবি নিয়ে দেখি তাতেও মাছগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে|"
ঘোষবাবু বলেন "আপনি করবেটের Fish of my dreams লেখাটা পড়েছেন? আমাদের লাইব্রেরী থেকে নিয়ে পড়ে দেখবেন - যদিও জায়গার নাম লেখা নেই, কিন্তু ওই ঘটনা এই বনঘাটের| ব্রিটিশরা এখানে নদীর ধারের জঙ্গলগুলোর গাছ কেটে কেটে একদম সাফ করে দিত যদি না রামসে সাহেব ----"
"মুকেশ টর্চ দো জলদি - লগ রাহা হরিশ আয়া" ভূপির উত্তেজিত গলা ঘোষবাবুকে চুপ করিয়ে দেয়| আমি ভাবি কুক হরিশ এসেছে তো এতো উত্তেজনা কিসের?
টর্চের আলো পড়ল সামনের একটা বেদীর ওপর - কে যেন শুয়ে রয়েছে| না, ওটা তো একটা বুদ্ধমূর্তি - শয়নমান| তারপর ই দেখলাম বিশাল গাছটার নিচে আলো আঁধারীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রমাণ সাইজের একটা সজারু| তাহলে হরিশ কই? ভূপি বুঝিয়ে দেয় "সজারুগুলোর আমি নাম রেখেছি, এটার নাম হরিশ|" বুঝলাম ভূপিকে যতটা নিরীহ ভেবেছিলাম, ও ততটা নয়|
আরো খানিকটা ভাত আর চিকেন নিয়ে বসি| বেড়ে রান্না করেছে আর খিদেটাও পেয়েছে জোর|
"ওই বুদ্ধমূর্তি কে বনালো?"
-"ওঃ, ওটা আমি ভুবনেশ্বর থেকে অনিয়েছি" - ঘোষবাবুর দেখি আর্ট এর দিকেও একটু ঝোঁক আছে| কিন্তু ঘোষবাবু আবার জঙ্গলের গল্পে ফিরে আসেন| "কোভিডের সময় আমাদের অবস্থা এতো খারাপ ছিল - ভাবি নি যে আবার চালু করতে পারব| এখানে বিদেশীদের ভীড়ই বেশী ফলে গতবছর তো একদম শুন শান ছিল| কিন্তু আমি এই জায়গাটা বড্ড ভালবাসি| আবার দাঁড় করিয়েছি| সেবার এক ভদ্রলোক এটা কেনার জন্য প্রচুর টাকা অফার করেছিলেন| লোভ হয়েছিল|কিন্তু ভেবে দেখলাম, এরকম আরো একটা জায়গা আমি আর কিনতে পারব না জীবনে| সস্তা গন্ডার সময় কিনে ফেলেছিলাম| প্রথমে তো স্রেফ ফিশিং ক্যাম্প ছিল| তারপর আস্তে আস্তে গড়ে তুলেছি| বেশির ভাগ -ই লোকাল রিসোর্স দিয়ে বানানো| আগে তো বেড়া দেওয়াও ছিল না - এইখান অবধি হাতি, হরিণ বাঘ সব আসত| কি যে ভালো লাগতো এই ভেবে যে এটা আমার নিজের জঙ্গল| ট্যুরিস্টদের শান্তির জন্য যদিও ইলেকট্রিকাল ফেনসিং লাগিয়েছি এখন, কিন্তু সেটাও স্রেফ সামনের দিকটায়| সারাদিন অবশ্য ওই তারে কারেন্ট থাকে না - শুধু রাত্রে অন করা হয়| "
"হাতি বা বাঘ অ্যাটাক করে না?" - ভাস্বতীর প্রশ্ন|
"আজ অবধি তো করে নি| যেখানে জঙ্গল ভালো আছে, সেখানে ওদের খাবারও আছে| মানুষের সঙ্গে কনফ্লিক্ট নেই| আমরা তো আর ওদের ন্যাচারাল খাদ্য নই|"
"আপনার নিজের আদি বাড়িটা কোথায়?"
-"আমার বাবা আর্মির লোক, তাই ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি সারা জীবন| গুরখা রেজিমেন্টে ছিলেন বাবা| বলতেন কাজের জায়গার ভাষাটা ভালো জানা দরকার| তাই বাড়িতে বাংলার চেয়ে বেশী নেপালি বলতাম আমরা| আমার ভাই আছে কুমায়ুন রেজিমেন্টে - সেই একই ব্যাপার, চমৎকার কুমায়ুনি বলে| অবশ্য আমিও বলি, কারণ আমার বউ কুমায়ুনি| আমার মা আসাম এর মেয়ে| আমি নানা রকম কাজ করেছি এদিক ওদিক | এখন থাকি রামনগর আর কলাধুঙ্গীর মাঝামাঝি একটা জায়গায়| ভালোই আছি| শহর আমার ভালো লাগে না| বড় মেকী মানুষজন| শহর থেকে কেউ কখনো ডাকলেও যেতে ইচ্ছে করে না| অথচ গ্রামে যখন কোনো একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানেও নিমন্ত্রন আসে, আমি চলে যাই| কোথায় যেন একটা আত্মিক টান অনুভব করি|"
আমাদের খাওয়া দাওয়া শেষ| শুভরাত্রি বলে বিদায় নিই| চূড়ামনির দল আগেই চলে গেছে চটপট খেয়ে| আমাদের ঘর অবধি এগিয়ে দিতে আসে ভূপি|
অনেক দূরে পাহাড়ের ওপর দেখি আগুন জ্বলছে | ভূপি বলল দাবানল - এখন কদিন এরকম চলবে - তারপর বৃষ্টি হবে আর আগুনও নিভে যাবে| "কেন, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে কিছু করে না আগুন নেভানোর জন্য?"
"কোথায় কোথায় কত আগুন আর নেভাবে? লোকজন অসাবধান| বিড়ি খেয়ে ঝোপের মধ্যে ছুড়ে ফেলে চলে আসে|"
"ঘোষ সাহেব জঙ্গলের নামে পাগল" ভূপি বলতে থাকে| "সেবার অস্ট্রেলিয়ার থেকে একটা দল আসবে, একটা ভালো বিজনেস করব আমরা, ইমপর্ট্যান্ট মিটিং চলছে - কণফারেন্স কল| হঠাৎ "লীওথ্রিক্স লীওথ্রিক্স" বলতে বলতে উনি মিটিং ছেড়ে হাওয়া| কি ব্যাপার? না কতকগুলো রেড বিলড লীওথ্রিক্স দেখতে পেয়েছেন| কাল সকালে যাবেন ওনার সঙ্গে জঙ্গলে, দেখবেন ওনার জঙ্গল প্রেম|"
"কাল তুমি যাবে না জঙ্গলে ঘুরতে?"
"না, আমার একটু কাজ আছে এদিকে| তার আগে আপনাদের ব্রেকফাস্টটাও প্যাক করার ব্যবস্থা করতে হবে| যান, ঘুমিয়ে পড়ুন এখন| সকল ছটার সময় ডাইনিং এরিয়া তে এসে চা খেয়ে নেবেন| আর সকালে গরম জল লাগলে বলে দিন, পাঠিয়ে দেব|
সকাল সাড়ে পাঁচটার সময় গরম জল পাঠাতে বলে আমরা ঢুকে যাই ঘরে| যাবার আগে ভূপি আর একটু ভয় দেখিয়ে যায় "জুতো পরার আগে একটু দেখে নেবেন - অনেক সময় বিছে বা সাপ ঢুকে বসে থাকে|"
বিছানায় গিয়ে দেখি সেখানে আবার যত্ন করে হট ওয়াটার ব্যাগ রেখে দিয়ে গেছে কেউ| লেপের তলায় আবার বিছে টিছে নেই তো? আর থাকলেই বা কি? ওই তো ঘোষবাবু বললেন - "নো হিউম্যান অ্যানিম্যাল কনফ্লিক্ট হিয়ার|" বাইরে একটা নাইট-জার ডেকে চলেছে| সেই একটানা আওয়াজ শুনতে শুনতে কোনো এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি|
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
ভোর পাঁচটা নাগাদ ঘুম ভাঙল। বাইরে অন্ধকার| আস্তে-ধীরে নড়েচড়ে বিছানা ছাড়তে আরো আধঘণ্টা লেগে গেল| বেশ ঠান্ডা লাগছে| ইতিমধ্যে বালতি করে গরম জল এসে গেছে| ছটার মধ্যে আমরা দুজনেই তৈরি| বাইরে হালকা আলোর রেখা, দু একটা পাখির কিচিমিচি| ডাইনিং এরিয়া তে গিয়ে দেখি চূড়ামনিরা চা খাচ্ছেন| আমরাও চা আর বিস্কুট নিয়ে বসে পড়লাম| সূর্য উঠেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ চারিদিকেই উঁচু উঁচু পাহাড়| তবে আলো ফুটেছে| ঘোষবাবু কাঁধে বাইনাকুলার নিয়ে হাজির| প্রথমেই উনি কিছু নির্দেশ দিয়ে দিলেন| কেউ তাড়াহুড়ো করবেন না, পাহাড়ে ওঠার সময় সাবধানে উঠবেন, এক লাইনে চলবেন, কথা আস্তে বলবেন - এইসব | তারপর এলেন আসল কথায়| যদি বাঘ বা লেপর্ড সামনে এসে যায়, পেছন ফিরে দৌড় লাগাবেন না - তাতে ওরা মনে করবে আপনি ওদের শিকার| আর যদি হাতি এসে যায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই জায়গা ত্যাগ করবেন| হাতি কত স্পীডে দৌড়তে পারে আর কত ভালো পাহাড়ে চড়তে পারে - আপনাদের হয়তো সেই ধারণা নেই| সঙ্গে নিজের বাইনাকুলার আর জল রাখবেন|
আমরা গেট দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম| এটা অন্য গেট, এখান দিয়ে আমরা ঢুকি নি কাল | সামনেই একটা বন ফায়ার করার জায়গা| একটা সম্বর ঝোপের মধ্যে ছিল - হঠাৎ আমাদের বেরিয়ে আসতে দেখে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করে পালিয়ে গেল|
জয়গাটার একটা বিবরণ দিয়ে দেওয়া যাক এবার| পাহাড়ের গায়ে একফলি লম্বা সমতল জমিতে এই রিসর্ট - ক্যাম্প বলাই ভালো যদিও| পূর্ব পশ্চিম বরাবর লম্বাটে জমিটা| কাল আমরা ওই পূর্ব দিকের গেটটা দিয়ে ঢুকেছি| পশ্চিমেও একটা গেট আছে - তার পেছনে ঘন জঙ্গল| দক্ষিণে ক্যাম্প এর গায়েই জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়| উত্তরেও একটা গেট - যেটা দিয়ে আমরা এক্ষুনি বেরোলম| আমাদের থাকার ঘরটা এই গেট এর সামনেই| বেরিয়ে একটু ঝোপঝাড় পেরলেই রামগঙ্গা নদী বয়ে চলেছে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে, অর্থাৎ পূর্ব থেকে পশ্চিমে| নদীর ঠিক ওপারেই খাড়া পাহাড়| নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বেশ দূর অবধি নদীর গতিপথ টা দেখা যায় - বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে সশব্দে বয়ে চলেছে| আর কোথাও কোনো শব্দ না থাকায় একটা নেশার মত লাগে| নদীর দুপাশেই পাহাড় - ও পাশের পাহাড়টা একদম নদীর ধার ঘেঁষে| দূরে নদীটা বেঁকে পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে - দুই প্রান্তেই|
আকাশে বেশ কিছু ঈগল উড়ছিল| তার মধ্যে একটা মাঝে মধ্যে তীক্ষ্ণ চিৎকার করছিল - ঘোষবাবু না দেখেই বললেন "সারপেন্ট ঈগল"| বেশ আলো ফুটেছে এতক্ষণে| যদিও সূর্য এখনো পাহাড়ের আড়ালে| আমরা নদীর ধার দিয়ে পাথরে হোঁচট খেতে খেতে পশ্চিম দিক বরাবর চললাম| দেখি ওখানেও নদী পেরোনোর জন্যে একটা ভেলা রাখা আছে| দুজন দুজন করে পেরনো হল| সব মিলিয়ে আটজন চলেছি| চুড়মনিরা চারজন, আমরা দুজন, ঘোষবাবু আর মুকেশ বলে একটি ছেলে| মুকেশ ঘোষবাবুর-ই সাগরেদ - জঙ্গল সম্বন্ধে বেশ ওয়াকিবহাল| মুকেশ বয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের ব্রেকফাস্ট| নদী পেরিয়ে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে কিছুদূর যাওয়ার পর পাহাড়ে চড়া শুরু হল| বেশ খাড়া রাস্তা, আলগা পাথরের ওপর দিয়ে| হড়কে যাবার ভয়| তার ওপর আবার চতুর্দিকে হাতির নাদা| অর্থাৎ এই রকম চড়াই এর রাস্তাতেও ওদের বেশ আনাগোনা আছে| মিনিট পনেরো ওঠার পর আবার একটু সমতল জমি| অনেকেই অল্প স্বল্প হাঁফাচ্ছে| এগিয়ে চলি| রাস্তাটা আরো ওপরের দিকে উঠে গেছে| উঁচু থেকে নদীর গতিপথটা অনেকটা দেখা যাচ্ছে এখন| আমরা বোধহয় ৫০০ মিটার ওপরে|
রাস্তাটা ক্রমশ উপরের দিকে উঠেছে মোটামুটি ভাবে নদীর সঙ্গে সমান্তরালে| আমরা রেসর্ট থেকে ক্রমশ আরো দূরে চলে যাচ্ছি |ঘোষবাবু বললেন ওনার ওয়াকি-টকীটা টা খুব জোরালো ওটা দিয়ে অনেক দূর থেকেও রিসোর্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়| হঠাৎ দেখি নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে বিশালকায় একটা কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে|মুকেশ বলল "আরে এটা এখনো যায়নি?" কি ব্যাপার? না একটা ষাঁড় নাকি গত দু একদিন জঙ্গলের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে| মুকেশের বক্তব্য - যে কোনদিন এটাকে বাঘে তুলে নিয়ে যাবে| জিজ্ঞেস করলাম "ষাঁড়টা গ্রামে ফিরে যাবে না?" মুকেশ বলল "ভগবান জানে! হয়তো গ্রামে তেমন খাবার দাবার জুটছিল না| মনে মনে ভাবি - গ্রাম ছেড়ে মানুষ যায় শহরে আর এই নন্দীবাবু চলেছেন জঙ্গলে|
কিছু ছড়ানো-ছিটানো পাথরের উপর আমরা বসলাম খানিকক্ষণ| নিচে নদী বয়ে চলেছে| তার শব্দ এখান অবধি আসছে| মনে হচ্ছে যেন একটা এম্ফিথিয়েটার বসে আছি - এখনই সামনে কোন নাটক শুরু হয়ে যাবে| হয়তো বা একটা হরিণ জল খেতে আসবে আর একটা বাঘ চুপিসাড়ে জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসবে তাকে ধরতে| ঝটপট করে একটা ময়ূর উঠে গিয়ে বসবে একটা গাছের ডালে| তারপর তার তীব্র চিত্কারে ভরিয়ে দেবে জঙ্গল| কিন্তু কল্পনা ছেড়ে এখান থেকে উঠতে হল - আরো পথ বাকি যে!
একটা কোনো পাখির ডাক সত্যিই ভেসে এল| আমি জ্ঞানীর মত বললাম "সারপেন্ট ঈগল|" ঘোষবাবু বললেন "না, এটা গ্রেট বারবেট|"
-"বলেন কি? বারবেট এরকম শব্দ করে?"
-"আরো অনেক রকম করে| নানা ধরনের বারবেট আছে|"
ঘোষবাবু বাইনাকুলার চোখ রেখে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করেন| কথা বলতে থাকেন - "জঙ্গলে যারা আসে তারা কত যে দামি দামি ক্যামেরা আর লেন্স সঙ্গে করে আনে!" আমি কিন্তু তাদের বলি প্রথমেই কিনুন একটা ভালো বাইনোকুলার| ওটা না থাকলে জঙ্গলের অনেক কিছুই অধরা থেকে যাবে|"
এবার আমাদের গতিপথ বদলায়| নদীর থেকে আরো দূরে চলে যাই, কিছুটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ি| সামনে খাড়া পাহাড়| পাথরের ওপর পা টিপে টিপে খুব সাবধানে উঠি| ভাগ্যিস আশেপাশে কিছু গাছপালা ছিল সেগুলো ধরে উঠতে সুবিধে হচ্ছিল|খানিকটা ওঠার পর জলের শব্দ পেলাম| "পৌঁছে গেছি" - ঘোষবাবু ঘোষণা করলেন| দেখি একটা ছোট্ট পাহাড়ি ঝরনা তার নিচে কিছু পাথর ছড়িয়ে রয়েছে সে ঝর্নার জলে চান করছে একটা খুব ছোট বাদামী রং-এর পাখি যার ব্রহ্মতালুটা সাদা রংয়ের|মুকেশ বলল ওটার নাম হোয়াইট ক্যাপড রেডস্টার্ট| আমরা বেশ হাঁফিয়ে গেছি |পাথরের উপরে বসি | মুকেশ তার ঝোলা খুলে আমাদের জন্য খাবার বার করে|পরোটা, সবজি, আচার, ইডলি, ফল, চা - ভালোই ব্যবস্থা|
বেশ খিদে পেয়েছিল| খাওয়া দাওয়া সেরে আরো অনেকক্ষণ বসা গেল| বড়হয় ঘন্টাখানেক হবে| রোদ্দুর এখানটায় কম| একটু স্যাঁতস্যাঁতে ভাব| ঝর্নার থেকে জলের ছিটে গায়ে এসে লাগছে| সেই পাখিটা, যতক্ষণ আমরা রইলাম ততক্ষণ জলের আশেপাশে ঘুরে বেড়ালো| এবার ফেরার পালা| ঘোষ বাবু আগে আগে চলছেন| তারপর আমরা আর একদম পেছনে মুকেশ|
খানিকটা যাবার পরে দেখি আমাদের রিসোর্টের তিন চারটে ছেলে হনহনিয়ে আসছে|
-"কোথায় চললে ভাই তোমরা?"
-"কাল আমাদের ছুটি - তাই বাড়ি যাচ্ছি"
-" বাড়ি কোথায়?"
"ওই যে - ওই দূরে - পাহাড়ের ওপর"
দেখি গতকাল রাত্রে যেখানে আগুন জ্বলতে দেখেছিলাম সেইখানটায়| এখনও একটু একটু ধোঁয়া বেরোচ্ছে সেখান থেকে|
- "ও তো অনেক দূর| হেঁটে যাবে?
- "হ্যাঁ| আমরা তো এভাবেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে যাই| রাস্তা ধরে গেলে তো পাঁচ-ছ ঘণ্টা লেগে যাবে"
- "আর এই পথে কতক্ষণ লাগবে?"
-" ঘন্টা দুয়েকে পৌঁছে যাব|"
গ্রামটা আর একবার দেখি| যেতে মন চায়| কিন্তু আমাদের ওই চড়াই ভেঙে যেতে - কম করে চার ঘণ্টা লেগে যাবে! মায়া বাড়াই না| ওরা এগিয়ে যায় আর আমরা আবার নিচের দিকে নেমে আসি| একদম নদীর ধারে এসে গেছি আবার| আবার সেই ভেলা পেরোনো| আমিত আর ওর দিদি নেহা জলে নেবে যায়| ওরা হেঁটে হেঁটেই নদী পার হলো|
এইবার খেয়াল করলাম নদীর ঠিক উল্টোদিকে একটা ঝরনা নেমে এসেছে| ঘোষ বাবু দেখালেন সেই ঝরনার জল পাইপের মধ্যে দিয়ে আসছে| পাইপটা নদীর জলের তিন চার ফুট ওপর দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এপারে| তারপর সেটা মাটির নিচ দিয়ে রিসর্ট এর ভেতরে চলে গেছে| মুকেশ বলল হাতির দল যখন আসে, ওরা ওই পাইপের মধ্যে দিয়ে জল যাওয়ার শব্দ শুনতে পায়| ওদের চোখের দৃষ্টির তেমন জোর নেই কিন্তু কান আর নাক খুব সজাগ| বলে ফেলি "হবেই তো| ওই খুদে খুদে চোখ আর অতবড় কান! নাক এর তো বাহারই আলাদা|" মুকেশ হেসে ফেলে| তারপর আবার খেই ধরে "তারপর হাতিগুলো মাটি খুঁড়ে পাইপ বার করে দুমড়ে মুচড়ে একদম শেষ করে দিয়ে যায়| আবার সব নতুন করে লাগাতে হয়| বেশ কয়েকবার এরকম ভাবে পাইপ নষ্ট করে দিয়ে গেছে হাতির দল|" আশেপাশে যে পরিমাণে হাতির নাদা দেখলাম মুকেশকে অবিশ্বাস করার কোন কারন ছিল না|
ঘরে এসেই চটপট তৈরি হয়ে নিলাম নদীতে চান করতে যাওয়ার জন্য| জল প্রচন্ড ঠান্ডা| আর জলের নিচে বড় বড় হড়কা পাথর| তারই মধ্যে দিয়ে কোনক্রমে নদীর মাঝামাঝি গিয়ে একটা বড় পাথরের উপর উঠে বসি| জলে বেশিক্ষণ থাকা যাচ্ছে না ঠান্ডার জন্য| খানিকক্ষণ জলে নাবি আবার উঠে পড়ি - এভাবেই চলছিল আমার স্নান করা| ভাস্বতীর এদিকে প্রচন্ড ভয় - কখন কোথা থেকে একটা বাঘ বা লেপর্ড এসে যায়| তাই জলে বেশিক্ষণ না থেকে, পাড়ে বসে জঙ্গলের দিকে নজর রাখছিল| কিন্তু চতুর্দিকে জঙ্গল - কত দিকে আর নজর রাখবে? শেষ পর্যন্ত একটা চারপেয়ে দেখা গেল| একটা কুকুর সম্ভবত ওই দূরের গ্রাম থেকে বেড়াতে এসেছে|
কি যে ভাল লাগছিল - উঠতেই ইচ্ছে করছিল না| তবু উঠতে হল| আর দেরি করলে লাঞ্চ পাব না| লাঞ্চ -ও দেখি মোটামুটি কালকের ডিনারের মতই| আসলে এখানে জিনিসপত্র আনাটাই খুব শ্রমসাধ্য| তাই বিশেষ ভ্যারাইটি নেই - যখন যা আসে, এক রকমই আসে|
চূড়ামনিরা দেখি খুব তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছে|
-"আবার বেরোচ্ছেন নাকি?" - জিজ্ঞেস করি|
নেহা জবাব দিল "আরে না, ভাই এর একটা পরীক্ষা ছিল, এই মাত্র খবর পেল যে আজ বিকেলেই পরীক্ষা| এখানে ইন্টারনেট এর যা হাল, পরীক্ষা দেওয়া যাবে না| তাই দৌড়চ্ছি বাড়ির দিকে| মিনিট পনেরোর মধ্যে চূড়ামনি সপরিবারে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন| মুকেশ সঙ্গে গেল - বালুলি ব্রীজ এর কাছে ছেড়ে দিয়ে আসবে|
এবার পর রিসর্ট এ অতিথী শুধু আমরা| রিসর্টটা একটু ঘুরে ঘুরে দেখি| পশ্চিমের গেটটা দিয়ে বেরোই এবার| ওধারটায় খুব বেশী ঝোপঝাড়| দুটো বেশ বড় বড় গর্ত ঝোপের ধারে| ভাস্বতী বলল "পালিয়ে চল, এ নির্ঘাত পাইথনের গর্ত|" কয়েক বছর আগে একবার আমরা করবেট পার্কের ভেতরে এক বিশাল পাইথন দেখেছিলাম| সে যদি আদর করে জড়িয়ে ধরত, তাহলে সেটাই জীবনের শেষ আদর খাওয়া হয়ে যেত| কিন্তু এখানকার গর্ত দেখে সেটা আমার মোটেই সাপের গর্ত বলে মনে হল না| বরঞ্চ বুনো শুওর বা সজারুর গর্ত গতে পারে| "আরে ধুর, অতো ভয় পেও না তো| একটু এগিয়ে দেখে নি, তারপর ফিরে যাবো|" কিন্তু ফিরে যেতে আমাদের বেশী সময় লাগলো না| দু-পা গিয়েই যা দেখলাম, আর সাহসে কুলোলো না| দেখি রিসর্টের বেড়ার ধার দিয়ে চলে গেছে পুরুষ্ট একটা থাবার ছাপ| ভেতরে এসে তাড়াতাড়ি গেট বন্ধ করি| ততক্ষণে ঘোষবাবু দেখেছেন আমাদের| "আরে ওখানে কি করছেন? ওদিক দিয়ে একদম একা বেরবেন না| মোটেই সেফ নয়|" বললাম যে বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছি | সেই কথা শুনেই ভূপি লাফাতে লাফাতে চলল সেদিকে| তার মুখে একটাই কথা "সকালে বেরিয়েছিলাম, কোনো ছাপ দেখি নি তো! কখন এল? নাকি আমি এত পরিষ্কার একটা ছাপ মিস করে গিয়েছিলাম!"
এবার তাহলে কি করে সময় কাটাই? আমাদের দুজনেরই চোখ গেল মাচানটার দিকে| উঠে পড়লাম| দিব্যি বসার ব্যবস্থা করা আছে| মাচানটা রিসর্টের বেড়ার একদম ধারে| ওপর থেকে ওয়াটার হোলটা আরো ভালো দেখা যাচ্ছে| বাঘের পায়ের ছাপটা এদিকে আসারই ইঙ্গিত করেছিল| চুপচাপ বসে থাকি| আজ হাওয়ার জোর নেই - তাই জঙ্গল আরো নিশ্চুপ| সামনেই দুটো প্রকাণ্ড শিমুল গাছ| জঙ্গলী শিমুল - আমাদের পাড়ার শিমুল গাছের প্রায় ডবল সাইজের হবে| সব পাতা ঝরে গেছে - এবার নতুন পাতা আসার সময় হয়েছে| একটা দুটো ফুল দেখা যাচ্ছে| হঠাৎ বেশ জোরালো একটা ঠোকাঠুকির আওয়াজ| দেখি দুটো কাঠঠোকরা ওই শিমুল গাছের ডাল বেয়ে উঠছে আর মাঝে মধ্যেই ঠোকরাচ্ছে | জঙ্গলের নৈশব্দ খান খান করে দিচ্ছে ওই যুগল|
ইতিমধ্যে কিছু চিতল জল খেয়ে গেল| সূর্য ঢলে আসছে| ময়ূরগুলো খুব শোরগোল শুরু করেছে| সন্ধের আগেই সব এক একটা গাছের ডালে উঠে বসে থাকবে| দূর থেকে ভূপি ইশারা করছে চা খেতে আসার জন্য| নেমে এলাম| চা খেতে খেতে ভূপি বলল, বিকেল বেলা একবার বাইরেটা ঘুরে আসুন| সঙ্গে মুকেশকে নিয়ে যান | বেরিয়ে পড়ি আবার| মুকেশ আমাদের নিয়ে চলল নদীর ধার দিয়ে দিয়ে| বড় বড় পাথর - খুব সাবধানে হাঁটছি| জঙ্গলের দিকে নজর দিতে পারছি না| সেটা করতে হলে খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে নিতে হচ্ছে| ছোট বড় কিছু নতুন রকম পাখি দেখলাম - কি একটা যেন বুলবুল আর স্যান্ডপাইপার | মুকেশ গড়গড়িয়ে নাম বলে যাচ্ছিল - সব নাম এখন আর মনে নেই| আর নাম জেনে আমি করবই বা কি? ভালো লাগছে - এটাই তো অনেক পাওয়া| সেই ষাঁড়টা দেখি তখনো ঘাস খেয়ে চলেছে| ময়ূরের ডাক কমে গেছে| জঙ্গল শান্ত হয়ে আসছে| নদীর ওপারে পাহাড়ের ওপর কিছু একটা দেখে মুকেশ দাঁড়াল| তারপর আমাদের বলল "ওই দেখুন, একটা ঘুরাল|" করবেটের লেখায় পড়েছি ঘুরাল হল পাহাড়ী ছাগল| এরা খাড়া পাহাড়েও অনায়াসে তরতরিয়ে উঠে যেতে পারে| ঘুরাল লেপর্ডএর প্রিয় খাদ্য| অবশ্য আমরা কোনো লেপর্ড দেখলাম না| বরং ঘুরালটাই তার প্রিয় ঘাস পাতা চিবোচ্ছিল| খালি চোখে বোঝাই যায় না| এখন বাইনকুলার দিয়ে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি| এবার চারিদিকে একটা রহস্যময় আবছা অন্ধকার নেমে আসছে| আমরা পা চালাই| রিসর্টএ ঢুকে, প্রথমেই ঘরে গিয়ে সোয়েটার পরে নিই | ফেব্রুয়ারিতেও বেশ ঠান্ডা|
"আসুন, পাকোড়া রেডি|" - ভূপি ডাক দেয়| দেখি আর এক নতুন অতিথি| "ইনি হলেন নীরাজ চাওলা" - ঘোষবাবু পরিচয় করিয়ে দেন| চাওলার সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প চালাই| এখন পুরোপুরি অন্ধকার| স্রেফ চাঁদের আলোয় একে অন্য কে দেখছি| চাওলা কোন সফটওয়ার কোম্পানীতে কাজ করতেন এক সময়| তারপর নিজের কোনো ব্যবসা শুরু করেন - কি সব ইলেকট্রনিক পার্ট এর ব্যবসা| এখন সে ব্যবসা ওনার পার্টনার সামলায় আর উনি পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান| সঙ্গে থাকে বড়সড় একটা টেলিস্কোপ| তাই দিয়ে টুরিস্টদের চাঁদের পাহাড় আর শনির চক্র দেখিয়ে বেড়ান - কিছু উপার্জন হয় - কখনো বা কিছুই হয় না| কিন্তু মহাকাশের অনেক অজানা তথ্যই সেদিন রাতে উনি আমাদের বলেছিলেন| রাত প্রায় দুটো অবধি উনি বলে চললেন "ওই যে ওখানটায় একটু ধোঁয়া মত দেখছেন - এইবার টেলিস্কোপ এ চোখ রাখুন - কি দেখলেন? গোটা পঁচিশেক তারা - তাই তো? একটু জুম করছি - আরো কত দেখেছেন? আসলে ওই ছোট্ট ধোঁয়ার টুকরোটার মধ্যে কয়েক কোটি তারা আছে| ভাবতে পারেন? সময় থাকলে আরো অনেক দেখাতাম - এখন এদিকটায় দেখুন - " চাওলাবাবুর প্রচুর উৎসাহ| এদিকে আমরা হাই তুলছি| জঙ্গলের আওয়াজ-ও আর নেই| একটা অদ্ভুত ভয় ধরানো থমথমে ভাব|
ভূপি বুঝতে পারে| "না, এবার আপনারা শুতে যান| কাল আবার ভোরবেলা বেরতে হবে তো? ব্রেকফাস্ট -এ সঙ্গে কি নেব?"
লুচি আর ডিমসেদ্ধর অর্ডার দিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়াই| ঘরের ওই টিমটিমে আলোতে বিছানা বালিশ যথাসাধ্য পরীক্ষা করে নিই - কোথায় বিছে বাবাজী বসে থাকবেন!
আরামে চোখ জুড়ে আসে|
(ক্রমশ )
No comments:
Post a Comment